ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

টাইগারদের আশা-নিরাশার বিশ্বকাপ

শাকিল আহমেদ মিরাজ

প্রকাশিত: ০০:৪৮, ২৬ জুন ২০২৪

টাইগারদের আশা-নিরাশার বিশ্বকাপ

বিশ্বকাপে টানা ব্যর্থতার পরও গ্যালারিতে টাইগারদের সমর্থন জুগিয়েছেন ভক্তরা

আশা-নিরাশার মধ্য দিয়ে শেষ হলো বাংলাদেশের টি২০ বিশ্বকাপ মিশন। বড় প্রত্যাশায় বারণÑ মার্কিন মুলুকে উড়াল দেওয়ার আগে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর এই মনোভাব যদি ভক্তদের আশাহত করে, তবে গ্রুপ পর্বে চার ম্যাচের তিনটিতে জিতে সুপার এইটে জায়গা করে নেওয়া নিশ্চয়ই আশার পালে দিয়েছে নতুন হাওয়া। এমনকি সেরা আটে প্রথম দুটি ম্যাচে বড় হারের পরও বড় তারকা সাকিব আল হাসান বলেছিলেন, ছয় ম্যাচের তিনটিতে জয় নিশ্চয়ই খারাপ নয়! গ্রুপ-ফয়সালার নিরিখে আফাগানিস্তানের সঙ্গে শেষ ম্যাচ ঘিরে তৈরি হয় অন্যরকম এক আগ্রহ।

আশা জাগিয়েও পারেনি শান্তর দল। সর্বোপরি কেমন গেল টাইগারদের বিশ্বকাপ? সুপার এইটে সব ম্যাচে হার, অন্যদিকে সেমিতে উঠে গেল আফগানরা- নিরাশাবাদীদের উত্তর, মোটেও ভালো নয়। ভিন্নভাবে দেখলে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার মতো দল যেখানে গ্রুপ-পর্বের বাধাই পেরোতে পারেনি, সেখানে বড় প্রত্যাশা ছাড়াই সুপার এইটে খেলা, শেষ ম্যাচ পর্যন্ত সমীকরণে থাকা, মন্দ নয়! ব্যাটিং ব্যর্থতা যদি হয় যন্ত্রণার কারণ, তবে বোলিংয়ে তরুণ তুর্কি তানজিম হাসান সাকিব, লেগস্পিনার রিশাদ হোসেনদের পারফর্ম্যান্স হতে পারে ভবিষ্যতের জ্বালানি।
অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের কাছে বড় হারের পর আসলে সেমির কোনো আশাই ছিল না। কিন্তু আগ্রহ ছিল আাফগান্তিানের সঙ্গে শেষ ম্যাচ নিয়ে। ঠিক আগের ম্যাচেই ভারতের কাছে হেরে যাওয়ায় এই ম্যাচের ওপর ঝুলে ছিল অস্ট্রেলিয়ার ভাগ্য। যথারীতি দারুণ বোলিংয়ে আফগানদের সীমার মধ্যে আটকে রাখেন তাসকিন-রিশাদরা। জয়ের জন্য ১৯ ওভারে লক্ষ্য ১১৪, সেমিতে উঠতে ওই রান করতে হতো ১২.১ ওভারে। সেমির আশা গুঁড়িয়ে এমন ম্যাচে নিদেন জয় পর্যন্ত পায়নি শান্তর দল। সুপার এইট পর্যন্ত ৭ ম্যাচে তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৪ উইকেট রিশাদের, তানজিম সাকিবের ১১।  

ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ জিতলেও, দুটি ম্যাচে হারতে হারতে বেঁচে গিয়েছিল বাংলাদেশ, এরপর বিশ্বকাপের ময়দানে গিয়ে আসর শুরু ঠিক আগে পুঁচকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সিরিজ হারÑ প্রত্যাশার মাত্রা ছিল তলানিতে। তার ওপর গ্রুপ অব ডেথ ‘ডি’Ñএ দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়াও ছিল সাবেক চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কার মতো দল, যারা কোন অংশেই পিছিয়ে নয়। লঙ্কানদের বিপক্ষে ২ উইকেটের নাটকীয় জয়টাই লাকি-চার্ম হয়ে দাঁড়ায়! আরও চার্ম হয়ে দাঁড়ায় নিউইয়র্কের ‘জঘন্য’ উইকেট। অনুকূল স্লো-কন্ডিশনে টাইগার বোলাররা হয়ে ওঠে ভয়ংকর। ২২ রানে ৩ উইকেট নিয়ে সেদিন বিশ্বকাপে নিজের অভিষেক ম্যাচেই ম্যাচসেরা হন লেগস্পিনার রিশাদ হোসেন।

মুস্তাফিজুর রহমান ৩ ও তাসকিন আহমেদ নেন ২ উইকেট। যদিও ১২৫ রান করতে হারাতে হয় ৮ উইকেট, খেলতে হয় ১৯ ওভার পর্যন্ত!  প্রোটিয়াদের কাছে ক্লোজ ম্যাচে ৪ রানে হারের পর নেদারল্যান্ডস এবং নেপালের বিপক্ষে জয় ২৫ ও ২১ রানে। দুটি ম্যাচেই জয়ের কারিগর সেই বোলাররা। ৫ উইকেটে ১৫৯ রান তোলার পর ডাচদের ৮ উইকেটে ১৩৪ রানে থামিয়ে দেয় শান্তর দল। দারুণ বোলিংয়ে রিশাদ নেন ৩ উইকেট, পেসার তাসকিন আহমেদ ২। যদিও অনেকদিন পর ব্যাটে রান পাওয়া সাকিব (৪৬ বলে অপরাজিত ৬৪) হন ম্যাচসেরা। সেরা আটের টিকিট পেতে জিততেই হবে, নেপালের বিপক্ষে কঠিন সেই সমীকরণের ম্যাচেও জয় এনে দেন বোলারর।

মাত্র ১০৬ রানে অলআউট হওয়ার পর প্রতিক্ষকে গুটিয়ে দেয় ৮৫ রানে। ইতিহাসগড়া বোলিংয়ে নায়ক বনে যান তানজিম সাকিব। মাত্র ৭ রানের বিনিময়ে ৪ উইকেট নেন তরুণ এ ডানহাতি পেসার। মুস্তাফিজের শিকার ৩টি। সুপার এইটের টিকিট পাওয়া অদ্ভুতুড়ে ও অবিশ্বাস্য সেই ম্যাচ এবং তানজিমের কথা আলাদা করে না বললেই নয়। নতুন বলে চার ওভারের টানা স্পেলে স্রেফ ৭ রানে ৪ উইকেট নিয়ে রেকর্ড বইয়ে নাম লেখান তানজিম। ৪ ওভারে ঠিক ৭ রান দিয়েই মুস্তাফিজের উইকেট ৩টি।  
বাংলাদেশের হয়ে টি২০তে মিতব্যয়ী বোলিংয়ের রেকর্ড স্পর্শ করেন দুজন। ছোট পুঁজি নিয়ে বাংলাদেশকে তৃতীয় ওভারেই জোড়া উইকেট এনে দেন তানজিম। বোলিং আর শরীরী ভাষা দিয়ে তিনি কাঁপিয়ে দেন নেপালকে। সেই ধাক্কা আর তারা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। নেপাল অধিনায়ক রোহিত পাউড়েলের সঙ্গে কথার লড়াইয়ের পর তাকেও বিদায় করেন তানজিম। অধিনায়ক তাকে চতুর্থ ওভারেও আনেন বোলিংয়ে। সেই ওভারেও দলকে তিনি এনে দেন আরেকটি উইকেট।

তার ৪ ওভারে আসা ৭ রানের মধ্যে ৪ রান আসে ইনিংসের প্রথম বলেই আসিফ শেখের ব্যাটের কানায় লেগে। ৪ ওভারে ২ মেডেন, ৭ রান দিয়ে ৪ উইকেট নিয়ে হন ম্যাচসেরা।  ২৪ ডেলিভারির ২১টি থেকেই রান করতে পরেনি নেপাল। পরে অবশ্য পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে ৪ ওভারেই মেডেন, সঙ্গে ৩ উইকেট নিয়ে ইতিহাস গড়েন নিউজিল্যান্ডের লোকি ফার্গুসন। মুস্তাফিজও এদিন ৪ ওভারে দেন ৭ রান, ১ মেডেন, নেন ৩ উইকেট। 
বোলারদের নৈপুণ্যে সুপার এইটে উঠে আসার পর সেখানেও ফুটে  ওটে সেই ব্যাটিং-দৈন্যতা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পোর্টিং উইকেটেও ব্যর্থ বাংলাদেশের ব্যাটাররা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৪০ রান করে  হার ২৮ রানে, ভারতের ১৯৬ রানের জবাবে ১৪৬ রান তুলে হার ৫০ রানে। ‘যদি ফলাফলের কথা বলেন, অবশ্যই আমি বলব যে, ফলাফলের দিক থেকে আমরা মোটামুটি একটা অবস্থানে আছি। ছয়টা ম্যাচ খেলেছি, তিনটা জিতেছি, তিনটা হেরেছি। ৫০ শতাংশ যদি ইয়ে ধরেন সেদিক থেকে খুব একটা খারাপ না।’ 
বলছিলেন সাকিব। ব্যাটিং ব্যর্থতার চিত্র ফুটে ওঠে দলের বড় তারকার কণ্ঠে, ‘তবে আমি যেটা অনুভব করি, আমরা যখনই কোনো বড় দলের সঙ্গে যেভাবে লড়াই করেছি, গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে যেভাবে লড়াই করেছি, এই দুটি ম্যাচে যদি ওভাবে লড়াই করতে পারতাম, আমাদের জন্য ভালো ও সফল একটা বিশ্বকাপ হতো বলে আমার মনে হয়। সুপার এইটের দুটি ম্যাচেই আমরা যেভাবে প্রথম থেকে পিছিয়ে ছিলাম এবং ওই জায়গা থেকে আমাদের জন্য এটি বিব্রতকর।’

×