ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ২৪ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১

চাঁদপুরের লোককথা

কাদের পলাশ

প্রকাশিত: ০১:৫৫, ১৪ জুন ২০২৪

চাঁদপুরের লোককথা

ভৌগোলিক কারণে চাঁদপুরের ভাষা বা লোককথা

ভৌগোলিক কারণে চাঁদপুরের ভাষা বা লোককথা অনেকাংশেই মিলে যায় কুমিল্লা নোয়াখালী লক্ষ্মীপুর অঞ্চলের মানুষের লোককথার সঙ্গে। প্রবাদ প্রবচনের অনেকখানি মিলও রয়েছে। শুধু তাই নয় ছড়া, ধাঁধা, কেচ্ছা গল্পসহ অনেক কিছুই সামঞ্জস্য রয়েছে। মাটির যেমনি একটা মিহি গন্ধ আছে। ভাষা বা কথারও একটা মিহি গন্ধ আমাদের হৃদয় মনে মগজে মিশে আছে।

এ কথা কোনোভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে আমরা আধুনিকতার নাম করে ভুলতে বসেছি আমাদের প্রকৃত সংস্কৃতি। যা আমাদের গৌরব আর অহঙ্কারের ধন। লোককথা শুধু বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে আছে। প্রতিটি দেশেই এই সংস্কৃতি চর্চার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
লোককথায় এক ধরনের সঞ্জীবনী শক্তি থাকে। প্রাণ থাকে। এতেই পুঞ্জীভূত রয়েছে আমাদের আহ্লাদ, আবেগ বা অস্তিত্ব। চাঁদপুরের লোককথা সারাদেশের চেয়ে কোনো অংশেই কম সমৃদ্ধ নয়। বরং অনেক বেশি সমৃদ্ধ। চাঁদপুরের লোককথায়, শিশু বৃদ্ধ নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী কিংবা তরুণ-তরুণীদের জন্য থাকে বিশেষ উপমা। আদেশ, অনুরোধ, উৎসাহ, উৎসব, ব্যঞ্জনা, দুঃখকথা, রঙ্গকথা, উপদেশমূলক কথা ইঙ্গিতপূর্ণ কথার সম্ভার রয়েছে। যদিও তা অঞ্চল  ভেদে আলাদা আলাদা। 
উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, চাঁদপুর নামটিকে মানুষ চানপুর বলে। কচুয়াকে কচ্চা, হাজীগঞ্জকে আজীগুন, ফরিদগঞ্জকে হরিদগঞ্জ। অর্থাৎ বিভিন্ন গ্রাম বা এলাকার নাম মানুষ আঞ্চলিকভাবে বা কথ্য ভাষা ব্যবহার করে বলে থাকে। যদিও লেখ্য ভাষায় সঠিকটিই লিখে থাকে। অঞ্চল ভেদে চাঁদপুরের মানুষের ভাষা ব্যবহারে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। মূলত কথা বলার ক্ষেত্রে দীর্ঘপ্রাণ বর্ণগুলো উচ্চারণ কম হয়। যেমন- অভিভাবক-অবিবাবক, অন্ধ-অন্দ, ভাত-বাত, ভাই-বাই, ঘর-গর, বাড়ি-বারি।
শুধু তাই নয়, চাঁদপুরের কচুয়া ও শাহরাস্তি এলাকার দিকে শব্দের শেষে নি এবং তি-এর ব্যবহার লক্ষণীয়। যেমন, আন্নে কেরুম আচেন, বালা আচেননি? বাত খাইচততি? বাজারে গেচতনি? আইলে দেকা করবিনি?
আঁর লগে বাজারে যাইচ ক্যান? অর্থাৎ নি, তি এবং ক্যান শব্দগুলো অতিরিক্ত ব্যবহার করে কথার গুরুত্বারোপ করা হয়। যা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে।
চাঁদপুর অঞ্চলের মানুষ শত শত বছর ধরে দ্বিধা সঙ্কোচহীন চিত্তে স্থানীয় ভাষা ব্যবহার করে কথা বলে। এখানের কোনো কোনো উপজেলায় ‘পানিকে-হানি, তেমনি হ কেন্দ্রিক হেতন-তিনি, হউন/হক্কুন/শুকুন, হাগুন মাস/ফাগুন মাস, হিমড়া/পিঁপড়া, পিচে/পিছনে, হোলা/পোলা-ছেলে, মাইয়া/মেয়ে, হউর-শ্বশুর, হাওড়ি-শাশুড়ি, হইক/পাখি, হুয়র/শুকুর, হাঁ-পা, বইর, হাছা/সত্যি, মিছা/মিথ্যা, হৈর-ফকির, হিয়াল/শেয়াল। শুধুমাত্র ‘হ’ তে নয়, অন্যান্য বর্ণেও কিছু বৈচিত্র্য রয়েছে।
যেমন : কতা-কথা, চিপায়/কোনায়/কোননাই-কোথায়/কোনখানে, কুত্তা/কুকুর, খোবিশ/অপরিষ্কার, গৈয়ম/পেয়ারা, মেজ্জান/মেহমান, আগদরজা/ঘরের সামনের দরজা, বাইন দরজা/পেছনের দরজা, হুঙ্গা/নলবাক্স, ছ্যাপ-থুথু, জ্যাওতা/জিন্দা/জীবিত, টিয়া/টাকা, ঠাইললায়/ডালে, ঠাডা/বজ্রপাত, ডরে/ভয়ে, তুই/তুমি, থোয় না/রাখে না, দুইন্নাই/দুনিয়া, দুগা/দুই, কাগুজি/লেবু, ফাইল্যা/পাতিল, ফানকশাপ/গোখরো সাপ, ফিরা/হিড়ি/পিঁড়ি, বেআইয়ান/বেয়ান, বিয়া/বিয়ে, বাপ/বাবা, ভালা/ভালো, ভৈঁস/মহিষ, ভেড়ি/বাঁধ/জমির আইল, বিছুইন/হাতপাখা, মাইয়া/মেয়ে, মুত/প্র¯্রাব, মাড়ি/মাটি, মজ্জিদ/মসজিদ, মাইনশের/মানুষের, রাইতকা/রাতে, ল্যাহাহড়া/লেখাপড়া, শরমিন্দা-লজ্জাবতী/ লাজুক, মুও বা জুল/তরকারির ঝোল।
এ অঞ্চলে এমন কিছু শব্দ ও কথার প্রচলন আছে যা দেশের অন্য অঞ্চলে প্রচলিত না থাকার সম্ভাবনা বেশি। যেমন : খাইচ্চৎ, খাছিলত (প্রকৃতি/স্বভাব), ঘাউঘা/ঘাউয়া/ঘাউরা (অবাধ্য), বা চেঁতাচেতি (রাগারাগি/চটাচটি), কাইজ্জা (কলহ-বিবাদ), মোচ (গোঁফ), মিডা (মিষ্টি)। আগেই বলা হয়েছে উপরে উল্লিখিত শব্দের প্রয়োগ নোয়াখালী লক্ষ্মীপুর এলাকায়ও প্রচুর ব্যবহার হয়ে থাকে। মূলত এটি ভৌগোলিক অবস্থানের প্রভাব।
চাঁদপুরের প্রবাদ আশপাশের জেলাগুলোর সঙ্গে অনেকাংশে মিলে যায়। যদিও প্রবাদের মধ্যে বিভিন্ন পদ বা শব্দ প্রয়োগে ভিন্নতা রয়েছে। মূলত মানুষের সহজ বোধগম্য হতে আঞ্চলিক ভাষা প্রবাদ ব্যবহার হয়ে থাকে। চাঁদপুরের মানুষের মাঝে যে সকল প্রবাদ প্রচলিত আছে বা যা বিশ্বাস করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :
    ‘চাচি কও জেডি কও মার মতন না
     চিড়া কও মুড়ি কও ভাতের মতন না।’

চাচি জেঠি যা-ই বলি মায়ের সে ¯েœহ মমতার সমতুল্য নয় তেমনি চিড়া মুড়ি যা-ই খাই ভাতের মতো তৃপ্তি দেয় না। আবার
‘কাউয়া চিনে গাউয়া আম হেজায় চিনে কচু’ অর্থাৎ মন্দ মানুষ ভালো কিছু চিনতে পারে না। যে যেমন সে তেমন জিনিসই পছন্দ বা বাছাই করে।
‘চোরেরে কয় চুরি কর, গেরস্তরে কয় হজাগ থাক’ মানে কপট লোকেরা সবসময় উভয় পক্ষকে খুশি রাখার চেষ্টা করে। মানে উভয় পক্ষ নেয়। যা মানুষ বুঝতে পারলেই এমন প্রবাদ ব্যবহার করে থাকে। এমন অসংখ্য প্রবাদ আছে যা আমরা বিশ্বাস করি। এমন প্রবাদ মধ্যে রয়েছে সাধারণ অভিজ্ঞতা সূচক, নীতিকথামূলক, ইতিবাচকমূলক, মানবচরিত্রমূলক, সামাজিক রীতিনীতি বা প্রসিদ্ধ ঘটনা সম্পর্কীয়।
‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর’ এমন কথা প্রচলিত আছে মানুষের মাঝে। বিশ্বাস শব্দটি মূলত আস্থা ও ভরসা অর্থ বহন করে। অর্থাৎ কোন সন্দেহ না করার নামই বিশ্বাস। মূলত বিশ্বাসের দৃঢ়তা (বিশ্বাস যত বেশি সন্দেহ তত কম) খুব বেশি হলে তাকে বলা যায় ভক্তি বা অন্ধবিশ্বাস। আবার বিশ্বাস মানে হতে পারে আশা বা আশ্বাস। যেহেতু মানুষ সমাজবদ্ধ। তাই সমাজের কিছু রীতি নিয়ম কথা কোনো সন্দেহ ছাড়াই বিশ্বাস করে করতে হয়। আমরা প্রকৃতির সকল সৃষ্টিকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করি। অলৌকিক কিছু আমাদের বিশ্বাস করতে হয়। কিছু বিষয়ে দেখে কিছু বিষয় না দেখে বিশ্বাস করতে হয়। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা অনেক বিষয় অন্ধের মতো বিশ্বাস করতেন। আর সেসব লোক বিশ্বাস এখনো প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে। তবে প্রয়োগ কিছুটা কমেছে। এসব লোক বিশ্বাস সারাদেশেই প্রচলিত আছে। অঞ্চল ভেদে কিছু ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। লোক বিশ্বাস অতি প্রাচীন প্রথা। তবে কবে থেকে এর উদ্ভব তা নির্দিষ্ট করে বলা অসম্ভব। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব লোক বিশ্বাস ভাঙার সাহস সঞ্চার হয়েছে বলতেই পারি। কিছু লোক বিশ্বাস এখনো আমরা বহন করে চলছি। এটি এ অঞ্চলের মানুষের লোকসংস্কৃতির অংশ। মানুষ কি বিশ্বাস করবে কি করবে না এটা একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। কখনো কখনো সামাজিক ও পারিবারিক বিশ্বাসও মানতে হয়। আমরা কেউই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অবগত নই। লোক বিশ্বাস মূলত ভবিষ্যৎকে বর্তমানে উপস্থাপন বা ইঙ্গিত করে। ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক এসব লোকও বিশ্বাস আমাদের মানতে হয়। আমাদের সমাজের শিক্ষিত অশিক্ষিত সবাই কম-বেশি লোক বিশ্বাস মেনে থাকে। কারণ এসব লোক বিশ্বাস ভবিষ্যৎ কে অনুমান করে দেয় কোনো বিষয় বা বস্তুর বর্তমান প্রেক্ষিত জানা দেয়। প্রচলিত আছে লোক বিশ্বাস ভঙ্গ করায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জনৈক পূর্বপুরুষেরা এটাকে উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কখনো কখনো এসব লোকবিশ্বাস সত্য সুন্দর কিংবা সফলতারও ইঙ্গিত বহন করে তারও প্রমাণ ছিল। যে কারণে শত বছর কিংবা হাজার বছরের লোক বিশ্বাস আমরা ধারণ ও লালন করে চলেছি। এর সাহিত্যমূল্য কোনো অংশে কম নয়। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় লোককথা বা লোক বিশ্বাসকে কুসংস্কার বলছেন কেউ কেউ কিন্তু মানুষ গোপনে এসব বিশ্বাস করে। যেহেতু লোক বিশ্বাস মানুষের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ইতিবাচক বা নেতিবাচক বিষয়কে আংশিক বা পুরোপুরি উপস্থাপন করে মনের অগোচরেই এসব লোক বিশ্বাস আমরা মেনে চলি। এটি একান্তই ব্যক্তি তার নিজ ধ্যান ধারণা গ্রহণ বা বর্জন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ভোগ করে।
শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকল মানুষ গ্রামীণ জীবনে এর সুবিধাভোগী। লোক বিশ্বাসগুলোকে যারা সমীহ করে একই সঙ্গে আত্মাও করে। এখানে উদ্ধৃত লোক বিশ্বাসগুলো বিভিন্ন প্রহরকেন্দ্রিক আদৃত এবং সমাদৃতও বটে। বস্ত্র, ক্ষণ, কালের গ-িতে আবদ্ধ লোক বিশ্বাস লোকাচারগুলো সমাজ বাস্তবতায় জনমুখে প্রচলিত। লোক বিশ্বাস ও সংস্কার আপত দৃষ্টিতে এক মনে হলেও উভয়ের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। বিশ্বাস মূলত পূর্ণাঙ্গ রূপ নেওয়ার আগেই মন থেকে মুছে যেতে পারে, কিন্তু কোনো বিশ্বাস যখন পূর্ণ রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে তখন তা হয় সংস্কার। আবার বিশ্বাসের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটি বিপরীতধর্মী দিক আছে একটি পালনীয় অপরটি বর্জনীয়।
প্রবাদ-প্রবচনের সমজাতীয় অর্থ বোঝালেও অঞ্চল বা এলাকা ভেদে ভাষা বা ভাবেরও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। চাঁদপুরের ভাষা পার্শ্ববর্তী জেলার ভাষার সঙ্গে অনেকাংশে মিলে যায়। মূলত চাঁদপুরের মানুষের কথা শব্দগত কিছুটা মিল থাকলেও কথা বলার ঢঙে কিছুটা বৈচিত্র্য রয়েছে। এ এলাকার সঙ্গে কয়েকটি জেলার সীমানা থাকায় মানুষের যাতায়াত যেমনি রয়েছে। ভাষারও যাতায়াত আপনা-আপনি হয়ে যায়। কথ্যভাষার প্রচার অবশ্য মানুষে মানুষে হয়ে থাকে। তাই তো চাঁদপুরের শাহরাস্তির কিছু কথা নোয়াখালীর সঙ্গে মিলে যায়। আবার লক্ষ্মীপরের কথার সঙ্গে ফরিদগঞ্জ ও হাইমচরের আংশিক কথার মিল রয়েছে।
কচুয়ার মানুষের কথ্যভাষায় প্রভাব রয়েছে কুমিল্লা জেলার মানুষের। অপরদিকে মতলবের ভাষায় প্রভাব ফেলেছে মুন্সীগঞ্জের আঞ্চলিকতা। এদিকে সদর ও হাইমচরের আংশিক কথার সামঞ্জস্য রয়েছে শরীয়তপুরের ভাষার সঙ্গে। এই যে মিলে যাওয়ার এর প্রধানতম কারণ প্রবাদ প্রবচন কিছুটা সহজ ও সরল। স্থানীয় মানুষেরা ভাষা ব্যবহারের সময় কখনো কখনো নানা উপমা, প্রবাদ প্রবচন, শ্লোক ও নানা কিস্সা ব্যবহার করে থাকেন। যাতে গভীর ভাব এবং দর্শন লুকায়িত থাকে। সামগ্রিক ভাবনায় এসব উপাদান এ অঞ্চলের মানুষের নিত্য দিনের অনুষঙ্গ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এক সময়ের মানুষের মুখের উপমাগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। তথাপিও এ অঞ্চলের মানুষের কথা বলায় যে ধরনের প্রবাদ-প্রবচন ছড়া বা উপমা ব্যবহার হতো এসব লোককথা প্রতিষ্ঠিত আছে মানুষের জীবনাচারণের ভেতরেই। মানুষ যা বিশ্বাস করে তা মুখে মুখে প্রচার ও প্রসার হবেই। 
প্রবাদের আভিধানিক অর্থ প্রচলিত কথা, যেখানে জীবনবোধের প্রকাশ রয়েছে। এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বর্ণিত বক্তব্যকে শ্রোতার কাছে আকর্ষণীয় চমকপ্রদ, ইঙ্গিতময় ও হৃদয়গ্রাহী করে তোলা। প্রবাদ অতীতের বিষয় হয়েও সমকালকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করে। এটি লোকসমাজ বা কালের সৃষ্টি। যা জনশ্রুতি হিসেবে চলে আসছে। প্রবাদের কোনো লিখিত ভিত্তি নেই। উপরন্তু প্রবাদের স্বত্ব কেউ এককভাবে দাবিও করতে পারে না। প্রবাদের মাধ্যমে জীবন, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। এ অঞ্চলের প্রবাদের আকর্ষণ ও তাৎপর্যের মূলে রয়েছে সমৃদ্ধ জীবন ও অভিজ্ঞতার সরল ও সংহত প্রকাশ। যা অভিজ্ঞতার বহির্প্রকাশ বলাই যায়। এ সরল প্রকাশভঙ্গি শ্রোতার মনে খুব সহজে বিধে যায়। স্মৃতি ধরে রেখে লোক পরম্পরায় মুখে মুখে প্রচার হওয়ার ক্ষেত্রে অনন্য বৈশিষ্ট্যরূপে ‘ছন্দ’ বাহন আকারে ‘অন্তমিল’ সাধিত এবং অলঙ্কার হিসেবে ‘অনুপ্রাস’ যুক্ত হয়। অনুপ্রাস ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছের একাধিকবার ব্যবহারের ফলে যে সুন্দর ধ্বনিসাম্যের সৃষ্টি হয় তার নাম অনুপ্রাস।
অপরদিকে প্রবচন বলতে বোদ্ধা, বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ, সমাজে সম্মানিত ব্যক্তির উক্তির লিখিত রূপকে বোঝায়। লেখক তাঁর প্রতিভার দালিলিক সত্য হিসেবে যে কোনো সময় তার দাবি করতে পারেন। প্রবচন কটাক্ষ বা সরাসরি অর্থে প্রকাশ হয়। এর আভিধানিক অর্থ প্রকৃষ্ট বচন বা বাকপটুতা। এটি বিশেষ্য পদ। এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ব্যক্তির সৃষ্টিশীলতাকে সুভাষণ বা সুভাষিত রূপে লোক সমাজে তুলে ধরা। প্রবাদ-প্রবচন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সরস রম্য রচনায় ব্যবহৃত হয় এবং সত্যকে উদ্ভাসিত করে। যদিও এ দুটি পদ সমার্থক তথাপি পদদ্বয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রবাদ-প্রবচন কখনো আলাদা করে দেখা হয় না। বরং দুটোকে অভিন্ন ব্যজ্ঞনায় প্রকাশ করা হয়। তবে এ দুয়ের ক্ষেত্রে আরবি, ইংরেজি, মারাঠি, হিন্দি, সংস্কৃত, অন্যভাষার প্রভাবও দেখা যায়।
যেমন, ‘চিনন নারী বুদ্ধিতে, পুরুষ চিনন সম্পদে’ অর্থাৎ দায়িত্ববান নারীদের চেনা যায় তার তীক্ষè বুদ্ধিতে। আর প্রকৃত পুরুষ চেনা যায় তার অর্জিত সম্পদ দেখে। ‘যার লাগি নাই, মেজ্জানির বাইতও নাই।’ মানে সাধারণত মৃতের জন্য দোয়ার দিন ওই বাড়িতে খাবারের অভাব থাকে না। কিন্তু দুর্ভাগারা ওখানেও খাবার পায় না। ‘মেয়ে বিয়ে দেও ভাতে, ছেলে বিয়ে করাও জাতে। যে সংসারে অভাব নাই সেখানে মেয়ে বিয়ে দাও। আর ছেলে বিয়ে করালে জাত বা বংশ পরিচয় দেখে বিয়ে করানো উচিত।
এভাবেই আমাদের মুখের কথা প্রবাদ-প্রবচনগুলো আদেশ, উপদেশ, পরামর্শ, সাধারণ অভিজ্ঞতা, নীতিকথা, ইতিবাচকতা, সমাজ নীতি বা প্রসিদ্ধ ঘটনা উপমা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম অংশ। যা আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে।

×