লালন, রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ এই বাংলাদেশ। রবীন্দ্রনাথের মতে নদীমাতৃক বাংলার পলিমাটির কারণে কোন শক্ত গুরুভার এ মাটিতে হয়নি। এ নরম পলিমাটির কারণে বাংলার মানুষের আত্মিক যে পরিশুদ্ধতা সেটাই এদেশের মানুষের মন ও মননের এক চিরস্থায়ী সম্পদ। ঋতু বৈচিত্র্যের অপূর্ব সমাহারে শ্যামল বাংলার যে মোহনীয় রূপ লাবণ্য সেটাই আবহমানকালের এক স্নিগ্ধ, কল্যাণময়ী, মাঙ্গলিক রূপ। এরই আদলে গড়া নদীস্নাত বাংলার রমণীরাও প্রকৃতির মতোই মাঙ্গলিক রূপের আধার। ষড় ঋতুর লীলাসমৃদ্ধ আবহমান বাংলা নানা বর্ণে, নানা রূপে নিজেকে রাঙিয়ে তোলে। পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানানো, আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতির এক মহিমান্বিত পর্ব। তাই ১ বৈশাখ বাঙালীর ঐতিহ্যিক ধারণার এক জনপ্রিয় উৎসব। সমস্ত বাংলাভাষী এক অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়ে বর্ষবরণের এই আয়োজনের মিছিলে মিলিত হয়। উৎসবপ্রিয় এই বাঙালী জাতি নতুন বছরকে শুভেচ্ছা জানাতে অপরূপ সাজে নিজেদের মাতিয়ে তোলে। এই সাজসজ্জায় অগ্রণী ভূমিকায় থাকে দেশের অধিকাংশ নারী সমাজ। বৈশাখীর আমেজে নিজেদের পূর্ণ করার বাসনা নিয়ে তারাও যুক্ত হয় বিভিন্ন আনন্দ মিছিলে। নববর্ষের জমজমাট আয়োজনে নিজেরা শামিল হয়। গত বছর ১ বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের টিএসসিতে যে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে যায় তা আজও আমরা ভুলতে পারিনি। নারী-পুরুষ সমঅধিকারের দাবিতে সব ধরনের উৎসব-আয়োজনে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারবে এটাই যে কোন একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু গত বছর ১ বেশাখে এই আনন্দের শোভাযাত্রায় নারী লাঞ্ছনার যে ন্যক্কারজনক অবস্থার সৃষ্টি হয় সেটা স্মরণে আসলেই একটি সভ্য স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে নিজেকে ভাবতে লজ্জা হয়। উন্মুক্ত জনসমাবেশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে সর্বোপরি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের সবচাইতে নিরাপদ জায়গাটিতে এ ধরনের অশালীন ঘটনা, মানবিক মূল্যবোধের চরম অপমান। প্রতিবাদ, বিক্ষোভে সারাদেশ সোচ্চার হলেও অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে দোষীরা আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়। বাঙালীর জাতীয় জীবনে সবচাইতে আনন্দঘন পরিবেশে মেয়েদের ওপর এ ধরনের অশালীন নির্যাতন নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের হুমকিস্বরূপ। গত বছরের ১ বৈশাখে ঘটে যাওয়া এ ঘটনার আশপাশে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা একেবারেই ছিল না তা নয়। তবুও বৈশাখের উৎসবে আসা লাঞ্ছিত মেয়েদের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব হয়নি কেন সেটা আজও প্রশ্নবিদ্ধ। প্রসঙ্গত বলা হয়ে থাকে মেয়েদের অশালীন পোশাক পরিচ্ছদ এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে প্রলুব্ধ করে। এটা কি আসলেই সত্যি? সম্প্রতি কুমিল্লা সেনানিবাসে ঘটে যাওয়া তনু হত্যা কি এর বিপরীত ইঙ্গিত বহন করে না? তনুর পোশাক পরিচ্ছদ শুধু শালীনই নয়, তার মাথায় হিজাব পরা ছিল। তবু কেন তাকে এ ধরনের নৃশংসতার শিকার হতে হলো? বাংলাদেশ আজ নেতৃস্থানীয় নারী ব্যক্তিত্ব দ্বারা শাসিত। তবুও আজও প্রকাশ্যে, আড়ালে, আবডালে নারী নির্যাতনের, নারী হত্যার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিরাপত্তা বেষ্টনী দ্বারা শৃঙ্খলিত কুমিল্লা সেনানিবাসেও নারীরা নিরাপদ নয়। এ প্রশ্ন আর কতদিন আমাদের তাড়িত করবে জানি না। শুধু কি নিরাপত্তা বেষ্টনী কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপরই এ দায়ভাগ বর্তায়? নারীর ক্ষেত্রে তা ব্যত্যয় হবে কেন? যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকরা নারী সৌন্দর্যের বন্দনা করেছেন, লক্ষ্মী-প্রতিমার আদলে গড়া নারীর রূপশৌর্যের পূজা করেছেন, নারীর মঙ্গল আর মাধুরীর জয়গান গেয়েছেন। নারীর প্রতি আজীবন সহানুভূতিশীল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘মানষী’ কবিতায় যেমন বলেন-
শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী,
পুরুষ গড়িছে তোরে সৌন্দর্যে সঞ্চারী
আপন মহিমা হতে। তব বসি কবিগণ
সোনার উপমা সূত্রে বুনিছে বচন।
মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘নারী’ কবিতায় নারীকে যেভাবে ভাবেন-
জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শষ্য-লক্ষ্মী নারী,
সুষমা-লক্ষ্মী নারীই ফিরে রূপে রূপে সঞ্চারী।
একবিংশ শতাব্দীতে ডিজিটাল বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমরা এই লক্ষ্মী প্রতিমা, কল্যাণময়ী নারীর সার্বিক নিরাপত্তা চাই। মানুষ হিসেবে সবধরনের অধিকার ও স্বাধীনতা চাই।

