ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

বাঙালির ‘ইলেকশন’ এসেছে

বরযাত্রীর মতো বহর বাদ্য বাজনা, বর্ণিল উৎসব

মোরসালিন মিজান

প্রকাশিত: ২৩:৫৯, ২০ নভেম্বর ২০২৩; আপডেট: ১৫:৩১, ২১ নভেম্বর ২০২৩

বরযাত্রীর মতো বহর বাদ্য বাজনা, বর্ণিল উৎসব

নির্বাচনী আমেজ... মনোনয়ন ফরম ক্রয় ও জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে

বাংলাদেশই হয়তো একমাত্র দেশ, যেখানে রেস্তোরাঁর দেওয়ালে স্পষ্ট বাংলায় লিখে রাখা হয় ‘রাজনৈতিক আলাপ নিষিদ্ধ।’ কারণটি খুব পরিষ্কার। রাজনীতির আলোচনা একবার শুরু হলে আর শেষ হতে চায় না। হাতে সিগারেট, সামনে গরম চা, দুটো শিঙ্গাড়া বা সমুচা নিয়ে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়াÑ গ্রামে-গঞ্জে এ যেন খুব স্বাভাবিক ঘটনা। এর ফলে দোকানির ব্যবসা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি থাকে মারামারি বেধে যাওয়ার শঙ্কা। ফলে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়াÑ যেখানেই যাওয়া যাই, রাজনৈতিক আলাপ বন্ধ রাখার নোটিস ঠিক চোখে পড়ে। কিন্তু রাজনীতির মধু ফুরাবার নয়। কোথাও না কোথাও দাঁড়িয়ে বা বসে রাজনীতির আলাপ শুরু করে দেয় বাঙালি।

তবে পাগলামোর সর্বোচ্চটা দেখা যায় নির্বাচনের মৌসুম এলে। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বিচিত্র সব কা- হয়! নাওয়া-খাওয়া, ঘুম-গোসল ভুলে ভোটযুদ্ধে নেমে যান সবাই। বলার অপেক্ষা রাখে না, এখন সেই সময়। আগামী ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতোমধ্যে তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তবে অন্যতম বড় দল বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। দলটি এক দফা দাবিতে আন্দোলনে আছে। আন্দোলন থেকে জ্বালাও-পোড়াও করে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় নির্বাচন কতটা উৎসবমুখর হবে- তা নিয়ে সন্দেহ ছিল অনেকের মনে।
তবে তফসিল ঘোষণার পর বিশেষ করে মনোনয়নপত্র বিক্রি শুরু হলে রাতারাতি বদলে যায় ছবিটা। বর্তমানে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ উপলক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়ের সামনে রীতিমতো উৎসব চলছে। এটি একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়। মনোনয়নপত্র কেনা মানেই নির্বাচনে নামার অনুমতি নয়, বিজয়ী হয়ে আসা তো আরও অনেক দূরের কথা। তথাপি উদ্যাপনে মেতেছেন সম্ভাব্য প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। অনেকেই বিশাল বহর সাজিয়ে বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে দলীয় কার্যালয়ে আসছেন। দেখে মনে হচ্ছে, বরযাত্রী! ফেরার পথে হয়তো কনেকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন তারা। বাস্তবে ফিরছেন মনোনয়নপত্র হাতে নিয়ে। 
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কথাই আগে বলতে হয়। দেশের ঐতিহ্যবাহী এই দল গত শনিবার থেকে মনোনয়পত্র বিক্রি শুরু করেছে। জানা গেছে, ওই দিন প্রথম দুই ঘণ্টায় আওয়ামী লীগের তিন শতাধিক মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়। সংখ্যাটা অবাক হওয়ার মতো বৈকি! এর পর যত দিন গেছে সংখ্যাটা হু হু করে বেড়েছে শুধু। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সোমবার পর্যন্ত তিন হাজার ১৯টি মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছে কার্যালয় থেকে। এই সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার কাজ আজ মঙ্গলবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে। 
বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে ফরম বিক্রি করছে আওয়ামী লীগ। সোমবার সেখানে গিয়ে যা দেখা গেল, তাকে জনসমুদ্র বললেও কম বলা হবে। কার্যালয়সহ আশপাশের গোটা এলাকা ঘিরে বিপুল জনসমাবেশ ঘটেছে। কার্যালয়ের কাছাকাছি যাওয়ার জন্য যে যুদ্ধ করতে হয়, সে শক্তিও অনেকের গায়ে থাকার কথা নয়। তবে রাজনীতির কী এক নেশা! সেই নেশায় বুঁদ হয়ে ছেলে-বুড়ো সবাই এখানে হাজির। কেউ বাঁশ-কাঠ দিয়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা বানিয়ে নিয়ে এসেছেন। কেউ নৌকাকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যে, দেখে আর নৌকা বলে মনে হয় না, যেন উৎসব মঞ্চ। 
কার্যালয়ে ভিড় জমানো অনেকের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা যার আছে, তিনিই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করছেন। যাদের কোনো সম্ভাবনাই নেই, তারাও কিনছেন ভবিষ্যতের কথা ভেবে। একেবারে সবাই বিশাল বহর সাজিয়ে নিয়ে কার্যালয়ে আসছেন। ফলে বোঝার উপায় থাকছে না প্রার্থী হিসেবে আসলেই কে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সমর্থগোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিজ নিজ নেতাকে সঙ্গ দিতে, সাহস জোগাতে বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছেন তারা। কেউ কেউ অনেক দিন ধরে ঢাকায় অবস্থান করছেন। কেউ কেউ আছেন আসা-যাওয়ার মধ্যে। এত কিছুর পর মনোনয়ন না পেলে কী হবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে কক্সবাজারের এক প্রার্থী বলছিলেন, ‘কী হবে তা পরে দেখা যাবে। আগে তো নমিনেশন পেপারটা কিনি।’ 
বর্তমান সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও মনোনয়নপত্র বিক্রি শুরু করেছে। সোমবার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের বনানীর কার্যালয়ে ফরম বিক্রি শুরু হয়। দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ প্রথম দলের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। সকাল ১০টায় বনানীতে দলের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, নেতাকর্মীরা কার্যালয়ের বাইরে জড়ো হয়েছেন। কার্যালয়ের তৃতীয় তলায় মনোনয়নপত্র বিক্রির বুথ করা হয়েছে। সেদিকেই দৃষ্টি ছিল সবার। কে কোথায় মনোনয়ন পাচ্ছেন তা নিয়ে চলছিল বিস্তর আলোচনা। জাতীয় পার্টি যে নির্বাচনে আসছে, এদিন সেটি মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর ফলে ভোটের মাঠে শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশও। জাতীয় পার্টির  মনোনয়নপত্র বিতরণ ও গ্রহণ আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত চলবে। 
একই দিন মনোনয়নপত্র বিক্রি শুরু করেছে বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের প্রতিষ্ঠিত দল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। আগামী ২৬ নভেম্বর রবিবার পর্যন্ত চলবে এই ফরম বিক্রি। ঢাকার মতিঝিলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ফরম কেনাবেচার কার্যক্রম চলবে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনমুখী হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। একই কারণে জমে উঠছে মাঠের রাজনীতি। বাঙালির ইলেকশন এসেছে। এসেছে যে, অনুমান করা যাচ্ছে এখন।

×