ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

মহাসমাবেশ থেকে দেয়া হবে আলটিমেটাম

১০ ডিসেম্বর ঘিরে বিএনপির ব্যাপক প্রস্তুতি

শরীফুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২৩:৩৬, ২৩ নভেম্বর ২০২২

১০ ডিসেম্বর ঘিরে বিএনপির ব্যাপক প্রস্তুতি

রাজধানী ঢাকায় ১০ ডিসেম্ব^র অনুষ্ঠিতব্য মহাসমাবেশকে ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি

রাজধানী ঢাকায় ১০ ডিসেম্ব^র অনুষ্ঠিতব্য মহাসমাবেশকে ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত সকল থানা ও ওয়ার্ডসহ সারাদেশ থেকে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের এ মহাসমাবেশে জড়ো করে বড় ধরনের শোডাউন করার চেষ্টা করছে। আর এই মহাসমাবেশ থেকেই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে সরকারকে আলটিমেটাম দেবে দলটি। আলটিমেটাম অনুসারে দাবি না মানলে রাজপথে দুর্বার আন্দোলনের ঘোষণাও দেওয়া হবে। এ ছাড়া এই মহাসমাবেশ কর্মসূচি পালনের মাধ্যমেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মাঠ দখলের চেষ্টা করবে বিএনপি।
সূত্র জানায়, মহাসমাবেশের কয়েকদিন আগে ঢাকার বাইরে থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী জড়ো করতে ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্ট দলীয় নেতাদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপি হাইকমান্ড। আর আগে আসা নেতাকর্মীদের মধ্যে যাদের ঢাকায় কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে। এ জন্য রাজধানীর বিভিন্ন হোটেল, কমিউনিটি সেন্টার, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও নির্মাণাধীন বিভিন্ন ভবন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আর রাজধানীতে বসবাসকারী বিএনপি নেতাদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকা থেকে আসা নেতাকর্মীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
এদিকে ১০ ডিসেম্বরের মহাসমাবেশ থেকে কি কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে এবং এই সমাবেশ থেকে দলের নেতাকর্মী, দেশের সাধারণ মানুষ ও সরকারকে বিএনপি কি বার্তা দেবে তা ঠিক করতে বিএনপির সিনিয়র নেতারা বিরামহীন কাজ করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া সমাবেশে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী জড়ো করতে দলের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। লন্ডন থেকে তারেক রহমানও বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
সূত্র জানায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে ১০ ডিসেম্বরের মহাসমাবেশ থেকে মূলত একটি দাবিই উপস্থাপন করবে বিএনপি। আর এটি হচ্ছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি নিশ্চিত করতে সরকারকে আলটিমেটাম দেবে। আর এ আলটিমেটামের পক্ষে জনমত বৃদ্ধি করতে ও রাজপথে শক্তি প্রদর্শন করতে নতুন করে আবারো আন্দোলনের কিছু সিরিজ কর্মসূচি দেওয়ার চিন্তা করছে দলীয় হাইকমান্ড।

তবে কি ধরনের কর্মসূচি দেওয়া হবে তা এখনো ঠিক করা হয়নি। এ ছাড়া এই মহাসমাবেশ থেকেই ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়ারও প্রস্তুতি রয়েছে বিএনপির। তবে সব কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে মহাসমাবেশের দু’একদিন আগে।
মঙ্গলবার দলীয় এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, ১০ ডিসেম্বর থেকে এক দফার আন্দোলন শুরু হবে। এই এক দফার আন্দোলন বলতে তিনি নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বুঝিয়েছেন। যে সরকারের রূপরেখা মহাসমাবেশ থেকে ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, আমরা আন্দোলনে থাকলেও এখনো আসল ঘোষণা দেইনি, আসল ঘোষণা দেব ১০ ডিসেম্বর।

আর সেদিন থেকেই শুরু হবে এক দফার আন্দোলন। ১০ ডিসেম্বর শান্তিপূর্ণ সমাবেশ থেকেই এক দফার আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এর আগে আরেক দলীয় কর্মসূচি পালন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপি মহাসচিব জানিয়েছিলেন সময়মতো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা জানিয়ে দেওয়া হবে। ১৯৯৬ সালের সংবিধানের আলোকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা তৈরি করছে বিএনপি।

তিনি আরও জানান, ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ আসনে বিজয়ী হয়ে ১৯৯৬ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে সংবিধানের সংশোধনী পাস করে। তাই আমাদের রূপরেখায় থাকবে সংবিধানের ওই সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেমন ছিল তারই আলোকে।
বিএনপির মহাসমাবেশ সফল করতে কেন্দ্র থেকে শুরু করে সারাদেশের সকল স্তরের বিএনপি নেতাকর্মীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিভাবে বিপুলসংখ্যক নেতা, কর্মী ও সমর্থক নিয়ে নিজ নিজ এলাকা থেকে মহাসমাবেশে উপস্থিত করা যায় সেই পরিকল্পনা করে দিন দিনই প্রস্তুতি জোরদার করছে তারা। এ জন্য আগেই দলটির সর্বস্তরে প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়েছে। দলের বিভিন্ন স্তরের নেতারা এখন মহাসমাবেশের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
মহাসমাবেশ থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপির পক্ষ থেকে সরকারকে আলটিমেটাম দেওয়ার পর সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোও যুগপৎ আন্দোলন শুরু করবে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করে সরকারকে চাপে ফেলতে এবার আটঘাট বেঁধে মাঠে নামতে চায় বিএনপির নেতৃত্বে ডান, বাম ও মধ্যপন্থী বেশক’টি রাজনৈতিক দল। এ জন্য তাদের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। যুগপৎ এ আন্দোলন দেশের সব রাজনৈতিক দলের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও কৌশলগত কারণে আপাতত ফ্রন্টলাইনে থাকছে না জামায়াত।

বিএনপির সঙ্গে গোপন সমঝোতার ভিত্তিতে জামায়াত এ কৌশল নিয়েছে বলে সূত্র জানায়। ২০০১ সালের আগে চারদলীয় জোট গঠন করে যেভাবে রাজপথ দখলে রেখে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয় লাভ করে সেভাবে সমমনা দলগুলোকে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন করতে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো।
আন্দোলন জোরদারের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিএনপি আগে থেকেই সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু করলেও ১০ ডিসেম্বরের পর সমমনা দলগুলোকে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন করবে।

এরই প্রস্তুতি হিসেবে ২ অক্টোবর থেকে শুরু হয় সমমনা দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির দ্বিতীয় দফা সংলাপ। এ পর্যন্ত প্রায় ২০টি দলের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা সংলাপ করেছে বিএনপি। এর আগে গত ২৪ মে থেকে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রথম দফা সংলাপ শুরু করে বিএনপি। প্রথম দফায় ২৩টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলের সিনিয়র নেতারা।

এই ২৩টি দলের মধ্যে রয়েছে জেএসডি (আসম রব), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), ন্যাপ-ভাসানী, ইসলামী ঐক্যজোট, কল্যাণ পার্টি, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), গণফোরামের একাংশ, নাগরিক ঐক্য, লেবার পার্টি, ইসলামিক পার্টি, পিপলস লীগ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, সাম্যবাদী দল, ডেমোক্রেটিক দল (ডিএল), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি), ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), জাতীয় দল ও বাংলাদেশ ন্যাপ। এবার দ্বিতীয় দফা সংলাপে এই ২৩টি দলের বাইরে থাকা আরও ক’টি দলের সঙ্গেও সংলাপ করবে বলে বিএনপি সূত্র জানিয়েছে।
প্রায় ১৫ বছর হয়ে গেল বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে। তাই রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় থাকা দলটির হাইকমান্ড চাচ্ছেন দ্বাদশ নির্বাচনের আগেই অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে নির্বাচনে অংশ নিতে। টার্গেট ক্ষমতায় যাওয়া হলেও অন্তত বেশকিছু আসনে বিজয়ী হয়ে যাতে দলের জন্য সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করা যায়।

আর তা হলে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজপথের আন্দোলন ও সর্বস্তরে দলকে চাঙ্গা করে যেন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক শক্তি সঞ্চয় করা যায়। এ জন্যই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রায় দেড় দশক বাকি থাকতেই জনদৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের মহড়া দেওয়ার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া রোডম্যাপ অনুসারে ২০২৩ সালের ডিসেম্ব^রে তফসিল ও ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তাই এ নির্বাচনের বিষয়টি মাথায় রেখেই বিএনপি নিজেদের দলীয় শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি সমমনা দলগুলোকে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০১৫ সালের মতো আবারো কঠোর কোন কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়তে চায় না বিএনপি। তাই সেভাবেই আন্দোলনের রূপরেখা ঠিক করা হচ্ছে।

রাজপথের আন্দোলনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জুলাই মাস থেকেই ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন শুরু করে বিএনপি। আর ১২ অক্টোবর থেকে নতুন উদ্যমে ১০ বিভাগে গণ-সমাবেশ কর্মসূচি পালন করছে। প্রথম গণ-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ডে। দীর্ঘদিন পর এই গণ-সমাবেশে বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি ঘটায় দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়। এরপর ১৫ অক্টোবর ময়মনসিংহের গণ-সমাবেশ কর্মসূচিতেও বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থকের উপস্থিতি ঘটে।

এরপর ২২ অক্টোবর খুলনা, ২৯ অক্টোবর রংপুর, ৫ নভেম্বর বরিশাল, ১২ নভেম্বর ফরিদপুর, ১৯ নভেম্বর সিলেটে গণসমাবেশ করে বিএনপি। তারপর ২৬ নভেম্বর কুমিল্লা ও ৩ ডিসেম্বর রাজশাহীতে গণসমাবেশের পর ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় করা হবে মহাসমাবেশ। যদিও এই মহাসমাবেশের স্থান এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে বিএনপি নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে করতে চায়।
বিএনপি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, তারা এবার এমনভাবে আন্দোলন এগিয়ে নিতে চায় যাতে সরকার চাপে পড়ে তাদের দাবি মেনে নেয়। তাই যেভাবে ২০১৩ সালের কঠোর আন্দোলনের আগে তৃণমূল পর্যায়ে কর্মসূচি পালন জোরদার করেছিল এবারো সেভাবেই তৃণমূল থেকে আন্দোলন জোরদারের কৌশল নেয় দলটি।

ওই বছর ২৯ ডিসেম্বর যেভাবে সারাদেশ থেকে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের ঢাকায় জড়ো করতে ‘রোড ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল একইভাবে এবারো ১০ ডিসেম্বর ঢাকার মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সারাদেশ থেকে নেতাকর্মীদের জড়ো করতে চাচ্ছে। আর এ কর্মসূচিকে সামনে রেখে প্রতিদিনই বিএনপির সিনিয়র নেতারা আন্দোলনে সরকার পতনের হুমকি দিচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারাও বিএনপিকে পাল্টা হুমকি দিয়ে কথা বলছেন। এতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে যাতে দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণ করা যায় সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোও প্রস্তুতি জোরদার করছে বলে জানা যায়।

monarchmart
monarchmart