সম্প্রতি জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কয়েকজন পাইলটের লাইসেন্স ও উড়ান ঘণ্টা নিয়ে যে গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। এটি প্রশাসনিক অবহেলা নাকি প্রভাবশালী কোনো মহলের চাপ-সেই প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, বিমানের সাতজন পাইলটের যোগ্যতা ও লাইসেন্স নিয়ে জালিয়াতির সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে অন্তত চারজন পাইলটের বিরুদ্ধে গুরুতর অসংগতি ধরা পড়েছে। কেউ প্রয়োজনীয় উড়ানঘণ্টা পূরণ না করেই কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স পেয়েছেন। কেউ আবার লগবুকে একই উড়ান সময় দুই কলামে দেখিয়ে ঘণ্টা বাড়িয়েছেন। কারও ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী উড়ান সনদেরও সন্ধান পাওয়া গেছে। বিষয়টি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম নয়, এটি আকাশপথের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং দেশের ভাবমূর্তির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। পাইলটের পেশাগত জীবনের মূল ভিত্তি হলো কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স বা সিপিএল। এই লাইসেন্স পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট উড়ানঘণ্টা, প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষার কঠোর মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। যদি সেই মৌলিক শর্তই লঙ্ঘিত হয়, তাহলে পরবর্তী সব প্রশিক্ষণ, রেটিং এবং ক্যারিয়ারের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। অর্থাৎ, একজন পাইলটের লাইসেন্স জাল বা অনিয়মপূর্ণ হলে তিনি যে প্রতিটি ফ্লাইট পরিচালনা করেছেন, সেটির নিরাপত্তাও হয়ে পড়ে প্রশ্নবিদ্ধ।
এ ঘটনার প্রভাব পড়তে পারে দেশের বাইরেও। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অরগানাইজেশন এবং ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা মানদণ্ড তদারকি করে। যদি তারা মনে করে যে, বাংলাদেশের লাইসেন্সিং ও তদারকি ব্যবস্থায় গুরুতর দুর্বলতা রয়েছে, তাহলে আন্তর্জাতিক রুট অনুমোদন, কোড-শেয়ার, বীমা সুবিধা এমনকি বিদেশি বিমানবন্দরে অপারেশনেও জটিলতা দেখা দিতে পারে। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম গোটা দেশের এভিয়েশন খাতের জন্য সমূহ ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।
বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাত গত কয়েক দশকে ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়েছে। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হয়েছে, আন্তর্জাতিক রুট বেড়েছে, যাত্রীসংখ্যাও বাড়ছে। এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার বিষয়ে কোনো আপস করা যাবে না। বিশেষ করে পাইলট নিয়োগ, লাইসেন্স যাচাই এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর আইনি ব্যবস্থা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম যাতে আর না ঘটে, সে জন্য লাইসেন্সিং ও তদারকি ব্যবস্থায় সংস্কার আনাও জরুরি।
প্যানেল/মো.








