ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

স্বাস্থ্য বাজেট ও মানবিক সেবা

ড. মিহির কুমার রায়

প্রকাশিত: ২০:৩০, ১৯ জুন ২০২৪

স্বাস্থ্য বাজেট ও মানবিক সেবা

গতানুগতিকভাবেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কম

গতানুগতিকভাবেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কম যা গত এক দশক ধরে বাংলাদেশ গড়ে জিডিপির শতকরা মাত্র ২ ভাগ বা তারও কম, আর বাজেটের মাত্র ৫ শতাংশ ব্যয় করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনি¤œ। উন্নত দেশগুলোতে এই হার শতকরা ১০ থেকে প্রায় ২০ ভাগ। মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয়ের ক্ষেত্রেও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ার গড় মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় বাংলাদেশ থেকে ৪ গুণের বেশি।

স্বাস্থ্য বাজেট (২০২৪-২০২৫)
দেশে নতুন অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে যা প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। গত অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৩৮ হাজার ৫১ কোটি টাকা যা প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ ছিল। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যের বরাদ্দ বাড়ছে ৩ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের তুলনায় এবার বরাদ্দ মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেশি। আবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৬৮২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা  যা উন্নয়ন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশ ৪১ শতাংশ। আগের বছর যা ছিল ৫১ শতাংশ।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে স্বাস্থ্য খাতে এবার বরাদ্দ জিডিপির ০.৭৬ শতাংশ। সিপিডি মনে করে স্বাস্থ্য খাতে এই বরাদ্দ একেবারেই যৌক্তিক নয়। কারণ বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ হওয়া উচিত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। দুই বছর আগে করোনাকালে সেটি স্পষ্ট হয়েছে। তারা বলছেন, এবার নামকাওয়াস্তে কয়েকটি ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে কর মওকুফের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও ওষুধের দামের বিষয় উপেক্ষিত হয়েছে। তাদের মতে, সর্বজনীন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর বিকল্প নেই। বরাদ্দের গতানুগতিকতার কারণে আউট অব পকেট স্বাস্থ্য ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না।

মনে রাখতে হবে আমাদের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের মাত্র ২৩ শতাংশ আসে সরকারের বরাদ্দ থেকে, আর ৬৮ শতাংশই বহন করতে হয় ব্যক্তি মালিকানায়। তাই বাজেটে স্বাস্থ্যের অংশ বাড়ানো গেলে নাগরিকদের ওপর চাপ কিছুটা কমত। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাস্তবায়নের অদক্ষতার কারণেই হয়তো স্বাস্থ্যের অংশটি বাড়ানো যাচ্ছে না। সর্বশেষ ২০২১-২২-এর মোট বরাদ্দের উন্নয়ন খাতে ২৪ শতাংশই বাস্তবায়ন করা যায়নি এবং স্বাস্থ্য গবেষণা খাতে ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দেও একটি টাকাও খরচ হয়নি গবেষকের অনাগ্রহের কারণে, যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ রয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অল্প মাত্রায় বরাদ্দ বাড়ানো হলেও চলতি বাজেটেও আসলে গুরুত্ব পায়নি স্বাস্থ্য খাত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলে আসলেও সেটাকে মানা হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ মেনে ১৫ শতাংশ না হলেও অন্তত আট থেকে ১০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া যেত স্বাস্থ্য খাতে। গতানুগতিক ভাবনা থেকে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তাতে আসলে স্বাস্থ্য খাতের কোনো পরিবর্তন আশা করা যায় না। আর তাই প্রস্তাবিত বাজেট স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা সমাধানে কাজে আসবে না। গত পাঁচ বছরের বাজেট বরাদ্দ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময় স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ৫ শতাংশের আশপাশে ছিল। অন্যদিকে, মোট জিডিপি অনুপাতের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ১ শতাংশের মতো।

স্বাস্থ্যে মাথাপিছু খরচে পিছিয়ে বাংলাদেশ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব বলছে, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পেতে একজন বাংলাদেশীর বছরে ৮৮ ডলার খরচ করা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে চিকিৎসা খাতে মাথাপিছু খরচ হয় ৫৮ ডলার, যার বড় অংশই নাগরিকরা নিজেরা সংস্থান করেন। অথচ মালদ্বীপের মতো দেশে এক হাজার ৩৮ ডলার খরচ করা হয়ে থাকে যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। ভুটানে ১৮০ ডলার ও শ্রীলঙ্কায় ১৬৬ ডলার খরচ করা হয়ে থাকে। নেপালে ৬৫ ডলার ও ভারতে ৭৪ ডলার খরচ করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যের কয়েকটি সূচক এখন নিম্নমুখী। 

বাজেট ব্যয়ের সিংহভাগ অবকাঠামো ও বেতন ভাতায়
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে মঞ্জুরি ও বরাদ্দের দাবিসমূহ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরাদ্দের টাকা দিয়ে ১৫টি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থাপন করা হবে। সিলেট, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১০০ শয্যার বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপন করা হবে। আটটি বিভাগীয় শহরের মেডিক্যাল কলেজে ১০০ শয্যার ক্যান্সার ইউনিট স্থাপন এবং জেলা সদর হাসপাতালে ১০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া দক্ষ চিকিৎসক ও নার্স গড়ে তোলার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা জাতীয় স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। বাজেটের বড় অংশই ব্যয় হবে মজুরি ও বেতন, প্রশাসনিক ব্যয় পেশাগত সেবা ও সম্মানী ভাতা বাবদ। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ টাকা খরচ হয় না
বরাদ্দ পাওয়া টাকাও সঠিকভাবে পুরোপুরি খরচ করতে না পারাটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ধারাবাহিক ব্যর্থতার মাঝে অন্যতম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯-২০ এ ফেরত যায় ২৬.৪ শতাংশ টাকা, ২০২০-২১ এ ফেরত যায় ৪২ শতাংশ, ২০২১-২২ এ ফিরে যায় ২৯ শতাংশ টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে খরচ করতে না পারায় স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ থেকে ফেরত গেছে ৩৯ শতাংশ টাকা। আর তাই চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট কতটুকু ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সে বিষয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশিষ্ট চিকিৎসা গবেষকদের মতে, এবার স্বাস্থ্য বাজেটকে পরিমাণের দিক থেকে বৃদ্ধি বলা হচ্ছে। কিন্তু আপেক্ষিকভাবে  দেখলে বোঝা যায় বেশ কয়েক বছর ধরে মোট বাজেটের ৫ শতাংশের আশপাশে বরাদ্দ থাকত।

এবার তা কমে ৪.৫৯ শতাংশে নেমে এসেছে। সেদিক থেকে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমেছে। বাজেটের আপেক্ষিক বৃদ্ধির পরিমাণটাকে ওইভাবে না চিন্তা করে শতাংশে ধরলে এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে, স্বাস্থ্যে যে বাজেট দেওয়া হয় তা খরচ করতে পারে না। প্রতি বছরই কিছু ফেরত যায়। সে কারণে এবার কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে কেন খরচ করতে পারছে না, সেটি আগে খতিয়ে দেখা দরকার। 

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, বাজেট আসলে আগের মতোই গতানুগতিক। শুধু কিছু বিষয় এদিক-ওদিক করা হয়েছে। ঝুঁকি মোকাবিলা ও গবেষণা খাতে কিছু বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু এগুলো তো আগেও ছিল। কিছু তো হতে দেখি নাই সেগুলোতে। আর তাই নতুন কিছু প্রত্যাশা নেই। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পরিকল্পনা শেষে এই বাজেট দেওয়া হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে টাকার যে অঙ্ক বেড়েছে তাও আসলে গতানুগতিক। এর ফলে কোনো পরিবর্তন দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তিনি আরও বলেন, প্রশ্ন উঠতে পারে কেন পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই? কারণ এই বরাদ্দ করা বাজেটের অধিকাংশ টাকাই খরচ হয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য।

এর পাশাপাশি যন্ত্রপাতি, গাড়ি ও তার তেল কেনার পেছনেও একটা বিশাল অংশ খরচ হয়ে থাকে। তা ছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার পেছনে একটা বিশাল অঙ্ক খরচ হয়ে থাকে। সুতরাং প্রস্তাবিত বাজেটে যা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা এসব কিছুর পেছনেই যাবে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতের মূল সমস্যাগুলো সমাধান কী হবে? তিনি আরও বলেন, দেশে সংক্রামক ও অসংক্রামক দুই ধরনের নানা রোগ কিন্তু বাড়ছে। তবে বাজেটে রোগ প্রতিরোধ নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। এমনকি স্বাস্থ্য খাতে যেসব সমস্যা আছে সেগুলো সমাধানেরও কোনো দিকনির্দেশনামূলক কিছু উঠে আসেনি এই বাজেটে। আর তাই বরাদ্দও নেই যার কারণে এই বাজেট আগের মতোই গতানুগতিক। তিনি বলেন, রোগ প্রতিরোধের জন্য কোনো বরাদ্দ না থাকা খুবই হতাশাজনক।

বাজেটটা হওয়া উচিত ছিল আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে। এক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধের জন্য নানা ধরনের নির্দেশনামূলক বিষয় নিয়ে বরাদ্দ দরকার ছিল। বাজেটে যদি বলা হতো যে ৬০ শতাংশ রোগ প্রতিরোধের জন্য বরাদ্দ যেখানে নানা রকম অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে মানুষকে সচেতন করতে হবে। লবণ-চিনি খাওয়া বন্ধ করার পাশাপাশি ট্রান্সফ্যাটের ঝুঁকি কমাতে সচেতন করতে হবে মানুষকে। সবার জন্য মাস্ক পরা নিশ্চিত করা ও তার প্রচার চালানোর প্রয়োজনীয়তা বুঝে টাকা বরাদ্দ দেওয়া জরুরি ছিল। 
সরকার আগামীর বাংলাদেশকে স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে প্রতিটি জনশক্তি স্মার্ট হবে, সবাই প্রতিটি কাজ অনলাইনে করতে শিখবে, ইকোনমি হবে ই-ইকোনমি, যাতে সম্পূর্ণ অর্থ ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল ডিভাইসে করতে হবে, আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মযোগ্যতা সবকিছুই ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে হবে, ই-এডুকেশন, ই-হেলথসহ সব কিছুতেই ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা হবে এবং ২০৪১ সাল নাগাদ এগুলো করা সম্ভব হবে এবং সেটা মাথায় রেখেই কাজ চলছে, কিন্তু বাজেটে তেমন কোনো প্রতিফলন সেভাবে নেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম।

কিন্তু সরকারের বক্তব্য হলো, বাজেটের টাকা উন্নয়ন খাতে খরচ করার মতো সক্ষমতা স্বাস্থ্য দপ্তরের নেই। তাই সরকারি চিকিৎসকদের ব্যবসা বন্ধ করে সেবায় মনোনিবেশ করতে হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অধিক সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তা হলেই দেশের রোগীদের আর  অর্থ খরচ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে গমন করতে হবে না এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। মনে রাখতে হবে সুস্থ জাতি মানেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। স্মার্ট বাংলাদেশে শতভাগ ডিজিটাল অর্থনীতি আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক স্বাক্ষরতা অর্জিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যাবে সবার দোরগোড়ায়, স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগ ব্যবস্থা, টেকসই নগরায়ণসহ নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সব সেবা হাতের নাগালে থাকবে  এই হলো আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : অধ্যাপক (অর্থনীতি), সাবেক ডিন (ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ) ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

×