ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১

টরন্টোর চিঠি

জীবনে সমৃদ্ধ হওয়া চাই

ড. শামীম আহমদে

প্রকাশিত: ২১:০৩, ২ এপ্রিল ২০২৪

জীবনে সমৃদ্ধ হওয়া চাই

জীবনে সমৃদ্ধ হওয়া চাই

দুজন প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী মারা গেলেন চলতি বছরের মার্চে। সাদি মহম্মদ এবং খালিদ। সাদি মহম্মদ প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী, শুদ্ধ সঙ্গীত চর্চায় তার অবদান অনন্য। অন্যদিকে খালিদ আধুনিক গান গাইতেন, ব্যান্ড দল চাইমে গান গেয়ে তার খ্যাতি আসে, এরপর একক সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তিনি বহু গান করেছেন এবং তরুণ প্রজন্মের মন জয় করেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে খালিদের গান খুব ভালোবাসতাম।

খালিদ নিজেও ব্যক্তি হিসেবে পছন্দের ছিলেন। ব্যান্ড সঙ্গীতশিল্পীদের নিয়ে সমাজে নানা রটনা থাকে, খালিদের বিষয়ে সাধারণের মধ্যে তেমন কোনো ধারণা ছিল না। তিনি যে খুব আলোচনায় থাকতেন, তাও নয়। খালিদের ‘সরলতার প্রতিমা’ গানটি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে যে কতবার শুনেছি তার ইয়ত্তা নেই। অন্যদিকে সাদি মহম্মদ কেবল তার রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্য নয়, বরং শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হিসেবে।

একাত্তরে নিজ চোখে বিহারিদের হাতে নিজের বাবাকে খুন হতে দেখেছেন, সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি বয়ে বেড়িয়েছেন আজীবন। দুজন পছন্দের, শ্রদ্ধার মানুষ দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন, যেভাবে বিদায় নিতে হবে সবাইকেই। গতরাতে এক বৌদ্ধভিক্ষুর একটি বক্তব্য ভিডিওতে দেখছিলাম। তিনি বলছিলেন, তোমার মা মারা যাবে, তোমাকে দেখতে হবে। তোমার বাবা মারা যাবে তোমাকে সহ্য করতে হবে। তোমার পোষা প্রাণীটি মৃত্যুবরণ করবে, পছন্দের মানুষেরা একে একে দুনিয়া থেকে চলে যাবে।

কখনো কোনো মানুষ কোনো কারণ ছাড়াই অথবা অজানা কোনো কারণে তোমাকে আঘাত করবে, কষ্ট দেবে, সেটিও তোমার ঠেকানোর কোনো উপায় নেই। তোমাকে এসবই দেখতে হবে, সহ্য করতে হবে, তোমার কিছুই করার নেই। কারণ, পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে এভাবেই, এটি এভাবেই চলবে, এর ব্যত্যয় ঘটানোর কোনো সম্ভাবনা নেই।

একদিন রাস্তায় বেরিয়ে তুমি দেখবে জগৎটা সুখের হয়ে গেছে, চারদিকে কেবল শান্তি আর শান্তিÑ কেউ তোমার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না, এটি ঘটার সম্ভাবনা নেই। তবে তুমি নিজেকে প্রস্তুত করতে পার, যাতে করে এসব ঘটনা ঘটার পরেও তুমি বেঁচে থাকতে পার, জীবনে আগাতে পার। অলৌকিক প্রত্যাশা নিয়ে বেঁচে থাকা অর্থহীন, বরং বাস্তবতা মেনে নিয়ে তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। 
চাইলেই কি আসলে আমরা প্রস্তুত হতে পারি? প্রিয়জনের মৃত্যু আমাদের নিজেদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভোগায়। হয়তো সেই কষ্টের বোঝা হালকা হয়ে আসে, কিন্তু হারিয়ে যায় না। তবে আমরা প্রিয়জন বলতে যে বাবা-মা-স্বামী-স্ত্রী-সন্তান বুঝি, তারাই যে কেবল আমাদের প্রিয়জন এমনটি নয়। কত মানুষকেই তো দেখলাম এসব রক্তের সম্পর্কের মৃত্যুকে দু’মাসও মনে রাখে না, সম্পর্কের বুনন হয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির ভিত্তিতে।

ভোগের আর বিলাসের আভিজাত্যে। আবার অন্যদিকে খুব দূরের মানুষ, যার সঙ্গে রক্তের কোনো বাঁধন নেই, মানুষই বা বলছি কেন, একটি রাস্তার কুকুর, ঘরে পোষা বিড়াল বা ময়না পাখিটির সঙ্গে নাড়ির বন্ধনের চাইতেও জোরদার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সম্পর্ক তাই খুব অদ্ভুত বিষয়। এই সম্পর্ক বুঝতে যদি আমরা ব্যক্তিগত থেকে সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যাই, তাহলে এর ঘনত্ব আরও বেশি করে বোঝা যাবে।

রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের হেরফের হয়। কথিত আছে, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে পাকিস্তান আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক শক্তিশালী হয়, সঙ্গে যোগ দেয় ধর্মভিত্তিক দলগুলো, এমনকি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিও, যেমন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হয়, রাশিয়া মিত্র হয়ে ওঠে; অন্যদিকে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। এই যে আদর্শিক ভিন্নতা, তা যে কোনো সম্পর্ককেই প্রভাবিত করতে পারে। 
বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে যদি বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে কিছুক্ষণের জন্য তাকানো যায়, সেক্ষেত্রেও সম্পর্কের  বেলায় স্বার্থের প্রভাবটা বোঝা যায় সহজে। সেই সাত সমুদ্র তেরো নদীর পাড়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্র কেন মধ্যপ্রাচ্যের সকল দেশের বিরোধিতা করে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করে ইসরাইলের মতো একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্রকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে যুগের পর যুগ ধরে? এমনকি ধর্মের ভিত্তিতেও যে তাদের ঘনিষ্ঠতা আছে, এমনটি নয়।

যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে অধিকাংশ মানুষ খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী, সেখানে ইসরাইল হচ্ছে একটি ইহুদি রাষ্ট্র। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মান বাহিনী থেকে পালিয়ে জাহাজে করে যখন ইহুদিরা কানাডা এবং আমেরিকায় আশ্রয়প্রার্থী হয়েছিল, তাদের অনেককেই প্রাথমিকভাবে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এই যে ইসরাইলের সঙ্গে আমেরিকার দহরম-মহরম, তাতে আমেরিকার ইসরাইল প্রীতির চাইতে মধ্যপ্রাচ্যভীতি ও তাদের শায়েস্তা করার খায়েশ বেশি কাজ করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে মূলত ইসরাইলকে কেন্দ্র করে আমেরিকা তাদের শক্তির পরিচয় দিতে চায়, ছড়ি ঘোরাতে চায়। না হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সম্পূর্ণ অগোছালো একটা জাতি কিভাবে অন্য দেশ দখল করে আজ এমনকি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হয়ে গেল? সম্পর্ক তাই জটিল বিষয়। নিঃস্বার্থ সম্পর্ক বলে আদৌ কিছু আছে কিনা আমি সন্দিহান। বাবা-মার সন্তানের প্রতি ভালোবাসা কিছু ক্ষেত্রে নিঃস্বার্থ হতে পারে, কিন্তু আর কোনো সম্পর্কও নিঃস্বার্থ নয়। 
কিছুদিন আগে নেটফ্লিক্সে একটা ইংরেজি সিরিজ দেখলাম। গল্পগুলো তো আসলে জীবনেরই অংশ। কিংবা হয়তো জীবনগুলো গল্পের অংশ। সিরিজটার নাম ট্রান্সপ্লান্ট। মূলত কানাডার একটা হসপিটালের ইমার্জেন্সি বিভাগের ডাক্তারদের জীবন নিয়ে চার সিজনের একটা সিরিজ। একেকটা সিজনের ১৫-২০টা করে পর্ব। আমি মূলত আগ্রহী হয়েছিলাম মূল চরিত্রটিকে দেখে। মূল চরিত্রটির নাম বশির, একজন সিরিয়ান রিফিউজি ও চিকিৎসক, যিনি কিনা কানাডায় এসে তার মূল পেশায় যাওয়ার সংগ্রামে ব্যস্ত।

অনেকেই হয়তো জানবেন যে বাংলাদেশ থেকে যারা ডাক্তারি পাশ করে কানাডায় আসেন, তারা এখানে সরাসরি চিকিৎসা দিতে পারেন না। তাদের নানা পরীক্ষা দিয়ে, তারপর রেসিডেন্ট চিকিৎসক অথবা ছাত্র চিকিৎসক হিসেবে ৪-৫ বছর দায়িত্ব পালন করার পর চিকিৎসার অনুমতি মেলে। বাংলাদেশের ৯৯% চিকিৎসক এই নানা ধাপ উত্তীর্ণ হতে পারেন না বিধায়, তাদের কানাডায় এসে আর চিকিৎসক হওয়া হয় না। আরেকটা বড় কারণ, কানাডায় ডাক্তারি পড়ার আগে একটা চার বছরের অনার্স কোর্স শেষ করতে হয়, কেবল তারপরই ডাক্তারি পড়া যায়।

আমার ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর ন্যাচারাল সায়েন্সের বেশিরভাগ ছাত্র ডাক্তারি পড়ার প্রস্তুতি হিসেবে ন্যাচারাল সায়েন্সে তাদের অনার্স করে থাকে। যাই হোক ট্রান্সপ্লান্ট সিরিজের ডাক্তার বশির যিনি কিনা সিরিয়া থেকে পালিয়ে কানাডায় আসেন, তিনি এখানে ডাক্তারি পেশায় নিয়োজিত থাকার লড়াইয়ে লিপ্ত থাকেন প্রতিনিয়ত। এই চরিত্রের বাস্তব নাম হামজা হক। তার ‘ক্র্যাশিং ঈদ’ নামের একটা সিরিজ দেখে প্রথমে তার অভিনয়ের বিষয়ে আগ্রহী হই। হামজা হক মূলত একজন সৌদি, সেখান থেকে তিনি কানাডায় এসে থিতু হয়েছেন। যাই হোক, কথা হচ্ছিল টিভি দেখা নিয়ে। প্রচুর টিভি দেখি, প্রচুর বই পড়ি।

টিভি দেখার ক্ষেত্রে মূলত ইংরেজি সিরিজ দেখে থাকি। বাংলাদেশের খবর, নাটক কোনো কিছুই প্রত্যাশা অনুযায়ী মানসম্মত মনে হয় না বিধায় দেখা হয় না। ভারতীয় সিরিজ, চলচ্চিত্র আমার কাছে খুবই নেগেটিভ মনে হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে- তাই সেগুলোও দেখা হয় না। অন্যদিকে নেটফ্লিক্স কিংবা এমাজন প্রাইমে হাজার হাজার মুভি আর সিরিজের মধ্যে মানসম্মত ভালো কিছু বাছাই করা যায়। এগুলো দেখে যে কেবল চিত্তের সুখ হয়, তাই নয়, নিজেকে উন্নতও করা যায়!

এছাড়াও আমি দুটো নিউজ চ্যানেল নিয়মিত দেখি প্রতিদিন সকালেÑ ১) ফ্রান্স ২৪, ২) আল-জাজিরা। এই মুহূর্তে যে তিনটি বই পড়ছি, সেগুলোর কথাও সংক্ষেপে বলি। প্রথমত পড়ছি ফাতিমা ফারজান মির্জার বই ‘অ চষধপব ঋড়ৎ টং’. বইটির কাহিনী আবর্তিত হয় একটি আমেরিকান-ইন্ডিয়ান মুসলিম পরিবারকে নিয়ে। তাদের পরিবারের বড় মেয়ে হাদিয়ার বিয়ে হচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়ায়Ñ সেটিকে কেন্দ্র করে বইটির কাহিনী ঘোরে। সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে যাওয়ার ফলে কী পরিবর্তন আসে পরিবারগুলোর জীবনে, সেগুলো খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠছে। এছাড়াও পড়ছি ‘নেতানিয়াহু’।

বইয়ের পটভূমি ১৯৬০ সালের। বইটি মাত্র পড়া শুরু করেছি। উপন্যাসটি পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছে। একই সময়ে সাধারণত ৩-৪টা বই পড়ি। আরেকটা বই পড়ছি এই মুহূর্তে নাম- হারমান ডিয়াজের ‘ঞৎঁংঃ’. এই উপন্যাসটি ২০২৩ সালে পুলিৎজার পেয়েছে। হারমান ডিয়াজের আরেকটি বই ২০১৮ সালে পুলিৎজারের জন্য মনোনীত হলেও শেষমেশ পুরস্কার জিততে পারেনি, সেই উপন্যাসটির নাম ছিল ‘In the Distance’. ট্রাস্ট বইটির মূল দুটো চরিত্র বেনজামিন ও হেলেন রাস্ক।

১৯২০ সালের পরিবর্তিত অর্থনৈতিক দিগন্তে ওয়াল স্ট্রিটে বেনজামিন একজন ধনকুবের হিসেবে আবর্তিত হন, আর হেলেন রাস্ক একটি খানদানি পরিবারের আদুরে কন্যা। তারা দুজন দুনিয়ার এমন একটি জায়গায় পৌঁছে, যার ওপরে হয়তো আর কিছুই নেই। বইটিতে লেখকের মুন্সিয়ানার মূল বিষয় হচ্ছে উপন্যাসের ভেতরে উপন্যাসের বুনন, যা সচরাচর দেখা যায় না। মূলত আমার দিনের অবসরের একটা বড় সময় বই পড়ে এবং মুভি দেখে কাটাই। মনে হয়, এতে করে মানুষ হিসেবে নিজেকে উন্নত করতে পারি, উন্নীত হতে পারি, চিন্তার ব্যাপ্তি ঘটে, উন্মেষ হয়। 
আমার একজন প্রিয় মানুষ, লন্ডন প্রবাসী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ইলিয়াস মাহমুদ ভাই একদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি এত মুভি দেখার সময় কোথায় পান? ইলিয়াস ভাইর এই প্রশ্নের উত্তর কয়েক সপ্তাহ আগে দিলাম বিলেতবাসী বন্ধু খায়রুলকে। জীবিকার জন্য বর্তমানে ৩টা বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তাহে ৩টা কোর্সে ৫টা লেকচার দিই। সপ্তাহে তিন দিন আমাকে এই ৫টা লেকচার দিতে হয়। সোম, বৃহস্পতি আর শুক্রবার এই তিন দিন আমি গড়ে ৫০০ কিলোমিটার ড্রাইভ করি শিক্ষকতার খাতিরে।

বাসায় ফিরি সন্ধ্যা ৭টায়। বাকি ৪ দিন কাজ যা করার বাসা থেকে করি। লেকচার তৈরি করা, স্টুডেন্ট/ফ্যাকাল্টি মিটিং, প্রশ্ন, এসাইনমেন্ট তৈরি, পরীক্ষার টুকটাক খাতা দেখা, টিচিং এ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজ করা, এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ঝামেলা মেটানো ইত্যাদি। ঘরে বসে কাজ করার এই ৪ দিনে কাজের ফাঁকে ফাঁকে রান্না করা, ঘর পরিষ্কার করা, ১০ হাজার স্টেপ হাঁটা এসবও করি। এর বাইরে সাধারণ জীবনযাপনের যা যা করণীয় কোনো কিছুই বাদ যায় না। গত সপ্তাহে বউ-বাচ্চাসহ বাংলাটাউনে গেলাম দুই দিন। সঙ্গে এডোনিস, সানি সুপার মার্কেটেও। এসব জায়গায় বাজারঘাট, খাওয়া-দাওয়া হলো।

একদিন ফাইয়াজের বাসায়ও ৫ ঘণ্টা কাটিয়ে আসলাম পরিবারসহ। দুয়েকদিন আগে ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোতে ক্লাস নিয়ে ফেরার পথে রনি আর সাকিবের সঙ্গে গল্প করলাম ২ ঘণ্টা। এছাড়া প্রতিদিন রাতে ময়লা ফেলা, একদিন মেয়ের স্কুলের টিচারের সঙ্গে দেখা করা কোনো কিছুই বাদ নেই। তারপরও প্রতিদিন অন্তত দেড় ঘণ্টার একটা মুভি অথবা দুই পর্বের একটা সিরিজ দেখা এবং অন্তত ১০ পৃষ্ঠা কোনো সৃজনশীল বই পড়ার সময় আরামসে পাই। ইলিয়াস ভাইয়ের প্রশ্ন, কিভাবে? ইলিয়াস ভাই কাছের মানুষ।

ফলে, ইলিয়াস ভাইয়ের প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে হয়। আমার সিনেমা দেখার সময় আসে কয়েকটি ক্ষেত্র থেকে। একটি সম্ভবত কানাডায় আমার সামাজিক জীবন খুবই সীমিত। বছরে আমরা ৫টা বাসায় যাই, সর্বোচ্চ ৫টা ফ্যামিলি আমাদের বাসায় আসে। ফলে, বাকি ৩৬০ দিন সন্ধ্যায় আমাদের নিজেদের কাছে ছাড়া অন্য কারও কাছে কোনো কমিটেন্ট থাকে না। কানাডার বেশিরভাগ মানুষ উইকেন্ডে দাওয়াত দেওয়া ও দাওয়াত খাওয়ায় ব্যস্ত থাকেন এবং এই দাওয়াত দেওয়া ও খাওয়ায় আগের-পরের দিনও ব্যস্ত থাকতে হয়।

এই ব্যস্ততা আমার নেই। আমার কানাডিয়ান বেশিরভাগ বন্ধু সিগারেট-গাঁজা ও মদ সেবন করেন। কেউ অল্প কেউ বেশি। এ কারণে তাদের নিয়মিত বাসার বাইরে যেতে হয়, দিনে অন্তত ঘণ্টা ২ এসবের পেছনে ব্যয় করতে হয়। এই সময়টাও আমার বেঁচে যায়। আরেকটা সময় বেঁচে যাচ্ছে ইদানীং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ফেসবুকে দিনে একঘণ্টার বেশি সময় দিই না এখন আর। একটা ১০০০ শব্দের পোস্ট লিখতে আমার সময় লাগে ১০ মিনিট। ৫০০ বা তার কম শব্দের পোস্ট ৫ মিনিটে লিখতে পারি।

বাংলা বা ইংরেজিতে আমার টাইপিং স্পিড মিনিটে ৮০ শব্দের মতো। দিনে ১০টা প্রোফাইলে ২০টা কমেন্ট করতে আমার সময় ব্যয় হয় মিনিট পাঁচেক। ১০০ লাইক-লাভ দিতে আরও ২-৩ মিনিট। ফলে, সোশ্যাল মিডিয়ার সময় ঘণ্টাখানেকের মতো। তাছাড়া বই কিংবা পত্রিকা ছাড়া যেসব লেখা লিখি, সেগুলো দ্বিতীয়বার পড়ি না, সাধু-চলিত মিশিয়ে লিখি, কোনো প্যারা  নেই। অন্যদিকে অনেকে খেলাধুলা করে, নানা ক্লাব, কমিটিতে জড়িত থাকে; আমার এসব কিছুই নেই।

সপ্তাহে ৪ দিন ১০ হাজার স্টেপ হাঁটা ছাড়া আমার অন্য কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বললেই চলে। আরেকটা বড় সময় আমার বেঁচে যায় ফোন ব্যবহার না করায়। দিনে গড়ে ৫ মিনিটেরও কম সময় ফোনে কথা বলি। সম্ভবত এর চাইতেও কম। আমার পরিচিত সবাই প্রায় দিনে দুই ঘণ্টা ফোনে কথা বলেন। এই জায়গায়ও আমার কিছু সময় অক্ষত থাকে। এছাড়াও যেসব মুভির রেটিং দিই, তার অর্ধেক আমার আগে দেখা, গত দুই দশক ধরে। ফলে, এত মুভি দেখার সময় পাই। এই কথাগুলোই খায়রুলকে বলছিলাম ফোনে। 

আসলে দিনের শেষে আমাদের জীবনকে আমরা কিভাবে গুছিয়ে নেব, তা আমাদের ওপরই নির্ভর করে। বাংলাদেশী হিসেবে আমরা জ্ঞানার্জনে আরও সময় ব্যয় করি, মানুষ হিসেবে নিজেদের এতটাই ঋদ্ধ করি, যাতে বিশ্ব দরবারে আমাদের আলাদা একটি অবস্থান তৈরি হয়- এই প্রত্যাশা। 
৩১ মার্চ ২০২৪

[email protected]

×