ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১

রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম

প্রকাশিত: ২০:৪১, ৩ মার্চ ২০২৪

রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম

আসন্ন রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ

আসন্ন রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইতোমধ্যে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশক্রমে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অপরদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক সংস্থা টিসিবি সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রি শুরু করেছে। এক কার্ডধারীদের মধ্যে ডাল, তেল, চিনি, খেজুরসহ নানা পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।  নিত্যপণ্যের দাম যাতে আর না বাড়ে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে সরকার। প্রশাসনের কঠোর নজরদারির মধ্যে রয়েছে নিত্যপণ্যের বাজার।

রমজানকে ঘিরে অতিরিক্ত মুনাফাখোর অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীর দৌরাত্ম্য বন্ধে বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে। অন্যদিকে, রমজানের শুরুতেই ভোক্তাকে অতিরিক্ত পণ্য না কেনার বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করে জোরেশোরে প্রচার চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রমজানের সময় স্থানীয় পর্যায়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং পণ্যের ন্যায্য দামের বিষয়টি সর্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করবেন জেলা প্রশাসকগণ। পাশাপাশি সরকারের আরও দুই সংস্থা- নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর এবং জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং করা হবে। 
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়, দপ্তর এবং অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় ঘটাতে কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্য মতে, এ বছর নিত্যপণ্যের আমদানি কিছুটা কম হলেও রমজানে সংকট হওয়ার মতো পরিস্থিতি  তৈরি হয়নি।

বরং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশে আটা, চিনি, ডাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ এবং আদা-রসুনের মতো পণ্যে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে চিনি ও ডাল বেশি দামে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। বিষয়গুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কয়েকটি ভোগ্যপণ্যের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বাজারে নিত্যপণ্যের কেনাকাটা করতে ভিড় করছেন সাধারণ মানুষ। কিনে আনছেন প্রয়োজনীয় চাল, ডাল, আটা, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, খেজুর, মুড়ি, ছোলা, বেসনসহ নানা ধরনের ভোগ্যপণ্য।

রোজার ভিড় এড়াতে কয়েকদিন আগেই বাজার থেকে মাছ-মাংস কিনে আনছেন ভোক্তারা। এ কারণে দেশের প্রতিটি ভোগ্যপণ্যের বাজার এখন সরগরম ও সাধ্যমতো ভোক্তার কেনাকাটার মধ্যে রয়েছে। 
রমজানের শুরু থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে থাকবে সরকার। এজন্য বিভাগীয় কমিশনারদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। আট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে দেশের ৬৪টি জেলা, সকল উপজেলা ও পৌরসভার বাজারদরের বিষয়টি মনিটরিং করা হবে। জেলা পর্যায় থেকে জেলা প্রশাসকগণ এ বিষয়ে প্রতিদিন বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে রিপোর্টিং করবেন।

উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে বাজার মনিটরিংয়ে জেলা প্রশাসকগণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা প্রদান করবেন। কোনো ব্যবসায়ী পণ্যের অতিরিক্ত মজুত কিংবা কৃত্রিম সংকট  তৈরি করে দাম বাড়ানোর কারসাজি করছে কি না, সে বিষয়টির দিকে নজর রাখবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা, ডিজিএফআই ও এনএসআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে। রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। আমদানি ও পণ্যের উৎপাদনের চিত্র বলছে, রমজানে এমন সংকট হওয়ার কথা নয়। তবে ব্যবসায়ীরা যাতে বিভিন্ন অজুহাতে কারসাজি করে পণ্যমূল্য বাড়াতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর মনিটরিং করা হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন সর্বক্ষণিক মাঠে থাকবে। এ ছাড়াও খাদ্যে ভেজাল রোধে কাজ করবে নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর। বাজার মনিটরিং করবে জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তর।

ঢাকায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি টিম নিয়মিত বাজার তদারকি করছে। পাশাপাশি টিসিবি সারাদেশে কোটি পরিবারের হাতে ভর্তুকি মূল্যে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে। এ থেকে  উপকৃত হচ্ছে প্রায় ৫ কোটি মানুষ। রমজান মাসজুড়ে টিসিবির এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হবে।
আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি দামে দেশে চিনি ও মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে বলে মনে করে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। সম্প্রতি সংস্থাটি থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়েছে, প্রতিকেজি পরিশোধিত চিনির আন্তর্জাতিক বাজার দর প্রায় ৫৯ টাকা। কিন্তু দেশে প্রতিকেজি চিনি মানভেদে ১৪০-১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে খুচরা পর্যায়ে।

বর্তমানে লাল চিনির প্যাকেট ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চিনির আমদানি ও এলসি খোলা নিষ্পত্তি সংক্রান্ত তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চিনি আমদানিতে এলসি খোলার পরিমাণ ১২ লাখ ৭০ হাজার টন। বিপরীতে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৯ লাখ ২৭ হাজার ৩৮৪ টনের। যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ে দেশে ১৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৫৪ টন চিনি আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছিল।
ট্যারিফ অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের আরেক তথ্যে দেখা যায়, প্রতিকেজি মসুর ডালের আন্তর্জাতিক বাজার দর প্রায় ৫৩ টাকা। বর্তমান স্থানীয় বাজারে মসুর ডাল বড় দানা প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ১০০-১১০ টাকায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫৮ টন মসুর ডালের এলসি খোলা হয়েছে।

এর মধ্যে ২ লাখ ২৫ হাজার ৭১০ টন ডাল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে ১ লাখ ৭৩ হাজার ১৮২ টন এলসি খোলা হয়েছিল এবং নিষ্পত্তি হয়েছিল ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩১৩ টন ডালের। সব মিলিয়ে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে এবার রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ ভোক্তা সাধারণের ক্রয়ক্ষমতায় থাকবে বলে আশা করা যায়।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক-বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কো. লি.

×