ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১

বাংলাদেশ ব্যাংকের রোডম্যাপ

​​​​​​​নিরঞ্জন রায়

প্রকাশিত: ০০:০২, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

বাংলাদেশ ব্যাংকের রোডম্যাপ

.

দেরিতে হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতের সমস্যা দূর করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে একটি রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে, যার মধ্যে এমন দুটি কর্মপরিকল্পনা আছে, যা ব্যাংকিং খাতের সর্বোচ্চ মাত্রার সংস্কার পদক্ষেপ। এর একটি হচ্ছে একাধিক ব্যাংকের মার্জার এবং আরেকটি হচ্ছে বিরাজমান খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধানে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা। দুটি বিশেষ পদক্ষেপসহ বাংলাদেশ ব্যাংকে যে রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে তা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে তাহলে আমরা নিশ্চিত যে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। দেশের ব্যাংকিংয়ের মান আন্তর্জাতিকমানের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। সংশয়ের জায়গা হচ্ছে, এই বিশেষ কর্মপরিকল্পনা এবং প্রস্তাবিত রোডম্যাপ আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি না এবং হলেও সেটা সঠিকভাবে হবে কি না! নাকি অতীতের অনেক সংস্কার কর্মসূচির মতো এই রোডম্যাপও বাস্তবায়নের মাঝপথে থেমে থাকবে। অথবা কিছু একটা করেই নামমাত্র বাস্তবায়ন হয়েছে বলে চালিয়ে দেওয়া হবে- সেটাই দেখার বিষয়।

দেশের ব্যাংকিং খাতে একাধিক ব্যাংকের মার্জার এবং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধানের মতো সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজটি মোটেও সহজ নয়। সবচেয়ে বড় কথা, এই বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে যে সকল চ্যালেঞ্জ, সমস্যা এবং প্রতিবন্ধকতা দেখা দেবে তা সফলভাবে মোকাবিলা করার মতো প্রস্তুতি বাংলাদেশ ব্যাংকের আছে কি না। বাংলাদেশ ব্যাংক অতীতে যেখানে সাধারণ মানের সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের নজিরই সেভাবে দেখাতে পারেনি, সেখানে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি দিয়ে খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান এবং একাধিক ব্যাংকের মার্জারের মতো সর্বোচ্চ মাত্রার সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে কিভাবে? এই ধরনের ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করার আগে দেশের সব অংশীজনকে (স্টেকহোল্ডারদের) সঙ্গে আলোচনা করে তাদের পরামর্শ বিবেচনায় নিতে হয়। বিশেষ করে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক, প্রথিতযশা ব্যাংকার এবং ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে তাদের সম্মতি সহযোগিতার আশ্বাস নিশ্চিত করতে পারলেই এই মাপের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংক এরকম আলোচনা করেছে কি না আমাদের জানা নেই। যদিও কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দেশের কয়েকজন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক যেহেতু দেশের ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভ সমস্যা সমাধানে হাত দিয়েছে এবং ইতোমধ্যে রোডম্যাপ প্রণয়ন করে ফেলেছে, তাই এর বাস্তবায়ন যে কোনো মূল্যেই হোক সম্পন্ন করতে হবে। এজন্য যে চ্যালঞ্জ এবং প্রতিবন্ধকতা আসবে সেগুলো চিহ্নিত করে তা মোকাবিলা করার জন্য কিছু আগাম প্রস্ততি নিয়ে রাখতে হবে। প্রথমেই গৃহীত রোডম্যাপ, বিশেষ করে একাধিক ব্যাংকের মার্জার এবং খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধানে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে এর উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, সফলতা, সুবিধা-অসুবিধা, চ্যালেঞ্জ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপায় এবং সর্বোপরি বাস্তবায়নের টাইম-লাইন উল্লেখ করে একটি সংক্ষিপ্ত কাগজপত্র বা ওয়ার্কিং পেপার তৈরি করে অর্থমন্ত্রীসহ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্তভাবে আলোচনা করে এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নে তাদের সম্মতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মতির প্রয়োজন হবে কারণে যে, এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাধারণ মানের নিয়ন্ত্রণমূলক কোনো কার্যক্রম নয়। রোডম্যাপ বাস্তবায়নে যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে তারা অভিযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেও খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না- যদি প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি আগে থেকেই নেওয়া থাকে। অধিকন্তু এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নে যদি বড় ধরনের কোনো চ্যালেঞ্জ বা সমস্যা দেখা দেয় তখন সেটাও সামলাতে হবে প্রধানমন্ত্রীকেই। এমনকি এই বিশেষ কাজে সরকারি অন্যান্য অনেক বিভাগ এবং মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতারও প্রয়োজন হবে, যা খুব সহজে পাওয়া যাবে যদি প্রধানমন্ত্রীর এতে সরাসরি সম্মতি থাকে।

দ্বিতীয়ত, ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং পরিচালকদের সঙ্গে যেমন আলোচনা করতে হবে, তেমনি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী এবং সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের সঙ্গেও বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত রোডম্যাপ বাস্তবায়নের বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে হবে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, ব্যাংকিং খাতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আনতে গেলে প্রথমেই এর মালিকপক্ষ ধরে নেয় যে, তাদের কর্তৃত্ব খর্ব করা হবে। একইভাবে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা ভাবতে শুরু করেন যে, তারা ক্ষমতাহীন হয়ে যাবেন। ফলে সেসব পরিবর্তন আনতে তাদের সহযোগিতা তো পাওয়া যায়ই না, উল্টো এক ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অসহযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। এখানেও যে তার ব্যতিক্রম হবে না তা খুব সহজেই অনুমেয়। কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে ব্যাংকের মালিকপক্ষ এবং প্রধান নির্বাহীসহ সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে তাদের বোঝানো যে, ব্যাংকিং খাতে বিরাজমান অব্যবস্থার জন্য তাদেরকেই বেশি দায়ী করা হয়ে থাকে। তারা কেন এই দায় বয়ে বেড়াবেন? এরকম ব্যাংকিং নিয়ে ব্যবসা করতে তাদেরকেই বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। অথচ ভালো ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে তারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন। সবচেয়ে বড় কথা, এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নের কারণে মালিকপক্ষ এবং প্রধান নির্বাহীর ক্ষমতা মোটেও খর্ব হবে না। তারা আগেও যা ছিলেন, পরেও তাই থাকবেন। সবকিছু শুধু প্রযুক্তিনির্ভর একটি সিস্টেমের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এসব বিবেচনায় নিয়ে যদি মালিকপক্ষ এবং প্রধান নির্বাহীরা স্বতঃস্ফর্তভাবে সম্মত এবং সর্বাত্মক সহযোগিতার নিশ্চয়তা দেন তাহলে খুব ভালো কথা। নতুবা আইনের মাধ্যমে তাদের রাজি করাতে হবে। মোটকথা, ব্যাংকের মালিকপক্ষ এবং প্রধান নির্বাহীসহ সিনিয়র ম্যানেজমেন্টকে সঙ্গে নিয়ে এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নের কাজে হাতে দিতে হবে। তাদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিয়ে তেমন একটা সফলতা পাওয়া যাবে না। 

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে দেশের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা। দেশের ব্যাংকিং খাতের কোনোরকম পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে দেশের ব্যবসায়ী ম্প্রদায়ের মাঝেও এক ধরনের অহেতুক ভীতি কাজ করে। তারা ভাবতে শুরু করে যে, তাদের হয়তো ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে। ফলে তারাও সহযোগিতার হাত বাড়ায় না। আলোচনা করে বোঝাতে হবে যে, প্রস্তাবিত রোডম্যাপ বাস্তবায়ন হলে তাদের ঋণ গ্রহণের সুযোগ মোটেই সীমিত হবে না। বরং সবকিছু সিস্টেমনির্ভর হওয়ায় তাদের আর ঋণ গ্রহণের জন্য ব্যাংকারদের সঙ্গে বিশেষ সখ্য গড়ে তোলার প্রয়োজন হবে না। ব্যবসায়ীদের ঋণ গ্রহণের যোগ্যতা এবং সক্ষমতা থাকলে তারা তখন খুব সহজে এবং অপেক্ষাকৃত অল্প সুদ হারেই ঋণ পেয়ে যাবে। অবশ্যই বেনামি ঋণ বা ইচ্ছাকৃত খারাপ ঋণ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে এবং তাতে দেশের প্রকৃত ব্যবসায়ীরা খুশীই হবে।

চতুর্থত, বাংলাদেশ ব্যাংককে দেশের খ্যাতনামা কিছু আইটি ফার্ম এবং আইটি বিশেষজ্ঞের সঙ্গেও তাদের প্রস্তাবিত রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা করতে হবে। কেননা, রোডম্যাপের অন্যতম একটি কার্যক্রম হচ্ছে ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। প্রকৃত সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে গেলে সকল প্রকার ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং অপারেশন সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল করে তুলতে হবে। ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করতে হবে। এই কাজে যদি বিদেশী সহযোগিতা নেওয়া হয় তাহলে একদিকে যেমন পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে, যা এই মুহূর্তে কঠিন, অন্যদিকে তা বাস্তবায়নের কাজ যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ এবং জটিল হয়ে যাবে। অথচ এই কাজটি আমাদের দেশের আইটি ফার্ম এবং বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে করাতে পারলে যেমন সহজ দ্র হবে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রারও সাশ্রয় হবে। কারণেই আইটি ফার্ম এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে নিশ্চিত হতে হবে যে, রোডম্যাপের কতটুকু কিভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব সে অনুযায়ী রোডম্যাপ সাজাতে হবে।

লেখক : সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং স্পেশালিস্ট ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

[email protected]

×