ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০

রক্তাক্ত মাতৃভাষা-১০

মোস্তাফা জব্বার

প্রকাশিত: ২০:১৩, ৩ ডিসেম্বর ২০২৩

রক্তাক্ত মাতৃভাষা-১০

.

১৯৫০ সালের শেষের দিকে মামলার শুনানি শেষ হলো। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব যে রায় দিলেন, তাতে মওলানা সাহেব শামসুল হক সাহেবকে মুক্তি দিলেন। আবদুর রউফ, ফজলুল হক বঙ্গবন্ধুকে তিন মাসের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হলো। মওলানা সাহেবও জেলে ফিরে এলেন। কারণ, তিনিও নিরাপত্তা বন্দি। আতাউর রহমান সাহেব, কামরুদ্দিন সাহেব আরও অনেকে মামলায় বঙ্গবন্ধুসহ বন্দিদের পক্ষে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে ডিভিশন দেওয়া হয়েছিল। আপিল দায়ের করলেও খাটতে হলো। কিছুদিন পর গোপালগঞ্জ পাঠিয়ে দিল। কারণ, গোপালগঞ্জে আরও একটা মামলা দায়ের করেছিল বঙ্গবন্ধুর নামে। মওলানা সাহেবের কাছে এতদিন ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁকে ছেড়ে যেতে তিনি খুব কষ্ট পেলেন। ঢাকা জেলে বঙ্গবন্ধুকে সুতা কাটতে দিয়েছিল। নারায়ণগঞ্জ হয়ে খুলনা মেলে পাহারা দিয়ে নিয়ে চলল বঙ্গবন্ধুকে। শেষ রাতে গোপালগঞ্জ পৌঁছলেন। পুলিশ লাইনে নিয়ে যাওয়া হলো বঙ্গবন্ধুকে। সকালবেলা খবর রটে গেছে গোপালগঞ্জ শহরে। ১০টার সময় বঙ্গবন্ধুকে কোর্টে হাজির করা হলো। অনেক লোক জমা হয়ে গেল। ম্যাজিস্ট্রেট হুকুম দিলেন, বঙ্গবন্ধুকে থানা এরিয়ার মধ্যে রাখতে।

পরের দিন মামলার তারিখ। গোপালগঞ্জ সাবজেলে ডিভিশন কয়েদি নিরাপত্তা বন্দি রাখার কোনো ব্যবস্থাই নেই। কোর্ট থেকে থানা প্রায় এক মাইল। কোর্টে পরের দিন হাজিরা দিলেন, তারিখ পড়ে গেল। কারণ, ফরিদপুর থেকে কোর্ট ইন্সপেক্টর এসেছেন। তিনি জানালেন, সরকার পক্ষ থেকে মামলাটা পরিচালনা করবেন সরকারি উকিল রায় বাহাদুর বিনোদ ভদ্র। তিনি আসতে পারেননি। এক মাস পরে তারিখ পড়ল এবং বঙ্গবন্ধুকে ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট জেলে রাখার হুকুম হলো। ফরিদপুর যেতে হবে, সেখান থেকেই মাসে মাসে আসতে হবে তাকে, মামলার তারিখের দিনে। অনেকে তাকে দেখতে আসল। তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফরিদপুর জেলে আসলেন। জেল কর্তৃপক্ষ পূর্বেই ডিআইজি থেকে খবর পেয়েছে। জেলগেটে পৌঁছান সকালবেলা। জেলার ডেপুটি জেলার সাহেব  বঙ্গবন্ধুর কাগজপত্র দেখে বললেন, আপনার তো সাজাও আছে তিন মাস। আবার নিরাপত্তা আইনেও আটক আছেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, বেশিদিন সাজা নেই, এক মাসের বেশি বোধহয় হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুকে কোথায় রাখা হবে তাই নিয়ে আলোচনা করলেন।

এই প্রথম তিনি ফরিদপুর জেলে আসলেন। একমাস পার হয়ে গেল। আবার গোপালগঞ্জ যাওয়ার সময় হয়েছে। এইভাবে মামলার জন্য তিন চার মাস বঙ্গবন্ধুকে যাওয়া আসা করতে হলো ফরিদপুর থেকে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত।

ফরিদপুর থেকে গোপালগঞ্জ যাওয়া আসা খুবই কষ্টকর ছিল। তাই সরকারের কাছে বঙ্গবন্ধু লিখলেন আমাকে বরিশাল বা খুলনা জেলে রাখলে গোপালগঞ্জ যাওয়া আসা সুবিধা হবে। সোজা খুলনা বা বরিশাল থেকে জাহাজে উঠলে গোপালগঞ্জ যাওয়া যায়। কোন জায়গায় ওঠা-নামা করতে হয় না। সরকার সেইমতো আদেশ দিলেন, বরিশাল বা খুলনায় বঙ্গবন্ধুকে রাখতে। কর্তৃপক্ষ খুলনা জেলে পাঠিয়ে দিলেন বঙ্গবন্ধুকে। রাজবাড়ী, যশোর হয়ে খুলনা যেতে হলো। খুলনা জেলে গিয়ে তিনি অবাক হয়ে গেলেন। দেখলেন, কোনো জায়গাই নেই। একটা মাত্র দালান। তার মধ্যেই কয়েদি হাজতি সকলকে একসঙ্গে রাখা হয়েছে। জেলার সাহেব বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গেলেন ভেতরে। বললেন, ‘দেখুন অবস্থা, কোথায় রাখব আপনাকে, ছোট জেল।বঙ্গবন্ধু বলেণ্ড আমি আবার রাজনৈতিক বন্দি হয়ে গেছি। সাজা আমার খাটা হয়ে গেছে। মাত্র তিনমাস জেল দিয়েছিল। অন্য কোনো রাজনৈতিক বন্দিও জেলে নেই। একটা সেলে অবশেষে রাখা হলো আর হাসপাতাল থেকে ভাত তরকারি দিলে তাই খেতে হতো, রোগীরা যা খায়। বাড়ি থেকে কিছু চিড়া মুড়ি বিস্কুট দিয়েছিল। তাই খেয়ে বাঁচতে হতো। কয়েকদিনের মধ্যে আবার মামলার তারিখ। প্রায় তিনমাস হয়েছে খুলনা জেলে এসেছেন। নিরাপত্তা আইনের বন্দিরা ছয় মাস পরপর সরকার থেকে একটা করে নতুন হুকুম পেত। বঙ্গবন্ধুর আঠারো মাস হয়ে গেছে। ছয় মাসের ডিটেনশন অর্ডারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। নতুন অর্ডার এসে খুলনা জেলে পৌঁছায়নি। বঙ্গবন্ধু বলেন, জেল কর্তৃপক্ষ আমাকে কোন্্ হুকুমের ওপর ভিত্তি করে জেলে রাখবেন? ‘অর্ডার যখন আসেনি, আমাকে ছেড়ে দেন। যদি আমাকে বন্দি রাখেন, তবে আমি বেআইনিভাবে আটক রাখার জন্য মামলা করে দেব।

জেল কর্তৃপক্ষ খুলনার ম্যাজিস্ট্রেট এসপির সঙ্গে আলাপ করলেন। তারা জানালেন, তাদের কাছেও কোনো অর্ডার নেই যে বঙ্গবন্ধুকে জেলে বন্দি করে রাখতে বলতে পারেন। তবে তার ওপরে একটা প্রডাকশন ওয়ারেন্ট ছিল, গোপালগঞ্জ মামলার। কাস্টডি ওয়ারেন্ট  নেই যে জেলে রাখবে। অনেক পরামর্শ করে তারা ঠিক করলেন গোপালগঞ্জ কোর্টে পাঠিয়ে দেবে এবং রেডিওগ্রাম করবে ঢাকায়। এর মধ্যে ঢাকা থেকে অর্ডার গোপালগঞ্জে পৌঁছাতে পারবে। জাহাজে পুলিশ পাহারায় গোপালগঞ্জে পাঠিয়ে দিল বঙ্গবন্ধুকে। গোপালগঞ্জ কোর্টে জামিন দিয়ে দিল পরের দিন। বিরাট শোভাযাত্রা করল জনগণ। বাড়িতে খবর পাঠিয়ে দেন বঙ্গবন্ধু। রাতে বাড়িতে পৌঁছাব। নৌকা ভাড়া করতে গিয়েছে। যখন নৌকা এসে গেছে, সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বঙ্গবন্ধু যখন রওনা করবেন, এমন সময় পুলিশ ইন্সপেক্টর গোয়েন্দা কর্মচারী বঙ্গবন্ধুর কাছে এসে বলল, ‘একটা কথা আছে।বঙ্গবন্ধু উঠে একটু আলাদা হয়ে ওদের কাছে যান। তারা বঙ্গবন্ধুকে একটা কাগজ দিল। রেডিওগ্রামে অর্ডার এসেছে তাকে আবার গ্রেপ্তার করতে নিরাপত্তা আইনে। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ঠিক আছে চলুন কর্মচারীরা ভদ্রতা করে বলল, ‘আমাদের সঙ্গে আসতে হবে না। আপনি থানায় গেলেই চলবে।কারণ, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রওনা হলে একটা গোলমাল হতে পারে। বঙ্গবন্ধু সকলকে ডেকে বললেন, ‘আপনারা হৈচৈ করবেন না, আমি মুক্তি পেলাম না। আবার হুকুম এসেছে আমাকে গ্রেপ্তার করতে। আমাকে থানায় যেতে হবে। এদের কোনো দোষ নেই। আমি নিজে হুকুম দেখেছি।নৌকা বিদায় করে দিতে বললেন বঙ্গবন্ধু। কয়েকজন কর্মী কেঁদে ফেলল। আর কয়েকজন চিৎকার করে উঠল।, ‘না যেতে দিব না, তারা কেড়ে নিয়ে যাক।বঙ্গবন্ধু ওদের বুঝিয়ে বললেন, তারা  বুঝতে পারল।

বঙ্গবন্ধুকে হয়রানি করতে সরকার সবসময়ই ব্যস্ত থাকত। তিনি এমনই এক রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, যাকে এভাবে নিরস্ত্র করার পদক্ষেপই সরকার নেয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই তাঁর ওপর প্রচ- এক মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে এসব হয়রানিমূলক গ্রেপ্তার, জেলগেটে গ্রেপ্তার, নতুন নতুন মামলায় গ্রেপ্তার- এসবই এক ধরনের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। একই সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাঁর মুক্তি পুনরায় গ্রেপ্তার করার আদেশও লক্ষ্য করা যায়। মার্চ ১৯৫১ বঙ্গবন্ধুকে মুক্তির সরকারি আদেশ বিলি করা হলেও ১৮ ধারায় পুনরায় গ্রেপ্তার করা হোক বলে নতুন আদেশ দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকা- সরকারের মনে সবসময়ই ভয়ের উদ্রেক করত। তাকে বন্দি না করা পর্যন্ত পুলিশ বিভাগের ঘুম হারাম হয়ে যেত। কারণে যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা নিশ্চিত হতো যে, বঙ্গবন্ধুকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা স্বস্তি পেত না। পুলিশ বিভাগ, কারা কর্তৃপক্ষ অন্যান্য এজেন্সি বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তার, পুনরায় গ্রেপ্তার ইত্যাদি কাজ নিয়ে যে সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকত তা উক্ত আদেশ থেকে বুঝা যায়। অল্প সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন তারিখে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার, জেল থেকে অন্য জেলে স্থানান্তর ইত্যাদি কাজ এত ঘন ঘন করার মূল লক্ষ্যই ছিল তার মনোবল ভেঙে দেওয়া।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু কখনোই ভেঙে পড়েননি। তাকে নিয়ে জেলের অভ্যন্তরে ধরনের আদেশ-নির্দেশ জারি, চালাচালি দীর্ঘদিন অব্যাহত ছিল। সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে তাকে জড়ানোর চক্রান্ত পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই করা হয়েছে। যে কোনো উপায়ে তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংহার করতে বদ্ধপরিকর ছিল পাকিস্তানি শাসকচক্র। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা নিয়মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাজনৈতিক কার্যকলাপ সম্পর্কিত তথ্য বিবরণী তৈরি করে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে প্রেরণ করত। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকা- এতটাই ঐকান্তিক পেশাদারি ছিল যে, সোহরাওয়ার্দী তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, যদি শেখ মুজিবের মতো তাঁর পাঁচজন মানুষ থাকত, তাহলে গোটা দেশই তাঁর সঙ্গে থাকত।

ডিসেম্বর ২০২৩

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড সফটওয়্যার-এর জনক

[email protected]
www.bijoyekushe.net
www.bijoydigital.com

আনন্দপত্র.বাংলা

 

 

×