ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১

বাঙালি জাতির আগামী চ্যালেঞ্জ

ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল

প্রকাশিত: ২০:৪৫, ৩ অক্টোবর ২০২৩

বাঙালি জাতির আগামী চ্যালেঞ্জ

গত শতাব্দীর শুরুর দিকে অবিভক্ত বাংলাকে ব্রিটিশ রাজের যে বিভাজন

গত শতাব্দীর শুরুর দিকে অবিভক্ত বাংলাকে ব্রিটিশ রাজের যে বিভাজন, তার সপক্ষে ব্রিটিশদের যুক্তি ছিল যে, প্রশাসনকে গতিশীল করার তাগিদ থেকে নাকি তাদের এই উদ্যোগ! আজকের পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ওড়িশা, ঝাড়খ- আর বাংলাদেশের সমন্বয়ে সেদিনের বাংলা প্রেসিডেন্সি ছিল ব্রিটিশ ভারতের বৃহত্তম প্রদেশ। অথচ বৃহৎ সেই প্রদেশের কিয়দংশের বিভাজনে প্রশাসন গতিশীল হবে, এমন হাস্যকর যুক্তিতেই ভাঙা হয়েছিল অবিভক্ত বাংলাকে। বঙ্গভঙ্গের সম্ভাব্য পরিণতি কি হতে পারে তা নিয়ে ব্রিটিশদের এক ধরনের হিসাব-নিকাশ কষা ছিল। বঙ্গের লাট লর্ড কার্জন এক চিঠিতে সে সময় ব্রিটিশ রাজকে লিখেছিলেন, ‘ওনলি দ্য বেঙ্গলিজ উইল ক্রাই’।

অর্থাৎ, বঙ্গভঙ্গে কিছু সংখ্যক বাঙালিই মর্মপীড়ায় ভুগবে, তাতে সিংহভাগ বাঙালি কিংবা অবশিষ্ট ভারতবর্ষের কিছুই এসে যাবে না। লর্ড কার্জন এবং ব্রিটিশ রাজের ধারণা একেবারেই ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। বঙ্গভঙ্গে ফুঁসে উঠেছিল বাংলা আর সঙ্গে গোটা ভারতবর্ষ। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, কিং জর্জ দ্য ফিফথ সশরীরে ভারতবর্ষে হাজির হয়ে বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
আধুনিক ইতিহাসে বাংলার দ্বিতীয়বার বিভক্তি ভারত ভাগের সময়। প্রাথমিক ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্রিটিশরা ততদিনে বাঙালির মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প এমনভাবে সেঁধিয়ে দিয়েছিল যে, এবার আর তাদের ব্যর্থ হতে হয়নি। বাঙালিই বাঙালির হননে মেতেছিল সেদিন। পাকিস্তান সৃষ্টিতে বাঙালির ভূমিকা অদ্ভুতুড়ে এই দেশটির পশ্চিমাংশের বাসিন্দাদের চেয়ে বেশি ছিল বৈ কম না। যে কারণে পাকিস্তান সৃষ্টিতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে মাওলানা আজাদ বলেছিলেন, ওদের কাছে পাকিস্তান আন্দোলন ছিল, ‘হাত মে বিড়ি, মু মে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’। তবে নিজেদের ভুল বুঝতেও বাঙালির খুব একটা সময় লাগেনি।

’৪৭-এ দেশ ভাগের অল্প কদিনের মাথায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তার প্রথম এবং একমাত্র সফরে এসে জিন্নাহ ঘোষণা করেছিলেন, ‘উর্দু, অ্যান্ড উর্দু শ্যাল বি দ্য স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অব পাকিস্তান’। সেদিন কার্জন হলে উপস্থিত ছাত্রদের একাংশ তরুণ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, ‘নো, নো’ বলে। এর পরের ইতিহাস আমাদের সবার জানা। বাঙালি তার ভুল শুধরে ২৪ বছরের মধ্যে পাকিস্তানকে অকার্যকর, ব্যর্থ প্রমাণ করে প্রতিষ্ঠা করেছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে বাঙালির প্রথম স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র বাংলাদেশ।
১৫ তারিখে ভারতের স্বাধীনতার ঠিক আগের দিনটিকে কলঙ্কিত করা হয়েছিল ভারতকে ভেঙে পৃথিবীর মানচিত্রে পাকিস্তান নামক একটি নতুন রাষ্ট্র সংযোজনের মাধ্যমে। ভারতের স্বাধীনতা তাই কখনই পূর্ণাঙ্গ হবে না। এটি হচ্ছে ‘পার্টিশন্ড ফ্রিডম’ বা খ-িত স্বাধীনতা। ভারতের এই খ-িত স্বাধীনতা অর্জনে সবচেয়ে বেশি মূল্য চুকিয়েছিল বাংলা আর পাঞ্জাব। ১৪ আগস্ট তাই অবিভক্ত ভারতের ইতিহাসে একটি কৃষ্ণ দিবস। বাংলাদেশ এবং ভারতে আমাদের আগস্টের ১৪-কে তাই স্মরণ করা উচিত সেই জায়গাটি থেকেই, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো দিন আর কোনো ১৪ আগস্টের প্রত্যক্ষদর্শী আমাদের না হতে হয়। ’৪৭-এ বাঙালি জাতির যে বিভক্তি সেই অনস্বীকার্য বাস্তবতাকে শিরোধার্য মেনেই বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের বাঙালিদের সঙ্গে একাত্তর পরবর্তী সময় ভারতীয় বাঙালিদের যোগসূত্রটি স্থাপিত হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে কলকাতার গড়ের মাঠে কলকাতার ইতিহাসে বৃহত্তম জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু এই বিষয়টিই পরিষ্কার করেছিলেন।
এই যে পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং তা মেনে নিয়ে দুই বাঙালির এরপর যে একসঙ্গে পথচলা, সেই ছুটে চলায় তৃতীয়বারের মতো যতি চিহ্ন এঁকে দিয়েছিল পাকিস্তানের এদেশীয় দোসররা। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ’৭৫ পরবর্তী দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এদেশে শাসন ক্ষমতায় ছিল পাকিস্তানের এদেশীয় জারজরা। বাংলাদেশ আর বাঙালিকে আরও একবার পাকিস্তানে রূপান্তরের সবটুকুই এই সময়টায় এদেশে করা হয়েছে এবং তার পেছনে সক্রিয় ছিল সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মদদ।

দেশের সংবিধান থেকে শুরু করে জাতীয় স্লোগান আর কোমলমতি শিশুদের পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে ইতিহাসের পাতাকে যেভাবে এই সময়টাতে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করা হয়েছে, তাতে ২০০৯ থেকে আবারও বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরিদের টানা শাসনে এই অশুদ্ধগুলোকে শুদ্ধ করার প্রয়াস যতই অব্যাহত থাকুক না কেন, কার্যত তা অর্জন করা বারেবারে, দফায়-দফায় দুরূহ বলেই প্রমাণিত হয়েছে। কারণ, পদ্মা-গঙ্গায় ততদিনে বয়ে গেছে বহু জল। যে জল পদ্মার পলি মেশানো জলের চেয়েও ঘোলাটে।
পাশাপাশি জটিলতা তৈরি হয়েছে অন্যখানেও। ক্রমাগত  গোয়েবলসীয় প্রচারণায় পিষ্ট ইতিহাস কপচানো এপারের বাঙালি যখন বিভ্রান্তির বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে জর্জরিত, তখন ওপারের বাঙালিও ভারতীয় হতে গিয়ে অনেক সময়ই বিভ্রান্ত হয়েছে। একই সময় ভারত আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রের সীমানা পেরিয়ে বাঙালি পরিণত হয়েছে বিশ^ নাগরিকে। বাংলা আর বাঙালির বিস্তার এখন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড। এই নতুন বাঙালি যেমন একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ওয়াহাবী ভাবধারায় উজ্জীবিত, তেমনি একই সময় সে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতিতেও দীক্ষিত। একদিকে বাঙালি যখন জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়ার অধীনে পাকিস্তানি হতে শিখেছে, তেমনি বাঙালি অন্যদিকে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত যে সাংস্কৃতিক বৈসদৃশ্য, তাকেও আপন করতে চেয়েছে।

এতটার পরও সিংহভাগ বাঙালি এখনো মনে প্রাণে বাঙালিয়ানাকেই ধারণ করতে চায়। কাঁটাতারের বিভক্তির বাস্তবতা বাঙালি যেমন জানে ও বোঝে, তেমনি বাঙালি চায় বাঙালিয়ানার প্রবাহ অব্যাহত থাকুক পদ্মা-গঙ্গা আর গোমতীর জলধারায়। প্রাণের এই আকুতি থেকে বাঙালি লিভার বিশেষজ্ঞরা যখন আয়োজন করে পদ্মা-গঙ্গা-গোমতী লিভার সম্মেলন, তখন বাংলা ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক বাঙালি সম্মেলন। আর ঠিক সেই একই কারণে সাকিব আর সৌরভের সৌরভ মাতায়-কাঁদায় কাঁটাতারের দুই পাশের বাঙালিকেই। এটাই বাঙালিয়ানার শক্তি, আবার এটাই বাঙালির চ্যালেঞ্জও।
বাঙালিকে বিভাজিত করার প্রথম যে উদ্যোগ তার বিরুদ্ধ স্রোতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পাকিস্তান সৃষ্টির মাধ্যমে বাঙালিকে বিভক্ত করার দ্বিতীয় উদ্যোগটি রদ করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্বিজাতিতত্ত্বকে ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ করে দিয়ে। আর পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর থেকে বিভক্ত বাঙালি জাতির আবারও যে পেছনে ছুটে চলা, সেখানে শেষ যতি চিহ্নটা এঁকে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। পঁচাত্তর এবং তার পরবর্তী সময়ের গভীর ক্ষত পরিচর্যা শেষে তিনি এখন বাঙালি আর বাঙালিয়ানার চর্চাটা জোরেশোরেই শুরু করেছেন। ঠিক সেই কারণেই আবারও সক্রিয় হয়েছে অশুভ চক্রটি।

একাত্তরে এরা পরাজিত হলেও পঁচাত্তরের এরা প্রায় জিতেই গিয়েছিল। তাদের বাড়াভাতে ছাইটা ঢেলেছেন শেখ হাসিনা। এরা তাই এখন আরও একটা বড় আঘাত হানতে উদ্যত। চারপাশের বাতাসে এখন ভাসছে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের গন্ধ। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে আঁধারের ষড়যন্ত্রীদের চাপা উল্লাস। বাংলা যখন ভাঙে আর বাঙালি যখন বিভক্ত হয়, তখন বাঙালির রক্তের ধারায় লাল হয়েছে ধরণি, তা সে ’৪৭-এ হোক আর ৭৫-এ হোক। 
এই বাস্তবতায় বাংলা আর বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়ানোর সময়টা এখন সবারই। অতীতে ওরা আঘাত করেছে, আমরা হেরেছি। তারপর আবার এক হয়ে ওদের হারিয়েছি। আমরা হয়তো জিতেছি প্রতিবারই, কিন্তু সেই বিজয়গুলো এসেছে বহু রক্ত, ত্যাগ, শ্রম আর ঘামের বিনিময়ে। এবারে আমরা অনেক বেশি সচেতন। এবার ওদের ভালো ভালো কথা আর প্রলোভন আমাদের বিভ্রান্ত করতে পারবে না। আমরা আঘাত করব না ঠিকই, কিন্তু আঘাতটা প্রতিহত করব একসঙ্গে এক হয়ে। সামনে আরেকটি নির্বাচন যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন এই নির্বাচনটি যে শুধু আরেকটি নির্বাচন নয়, বরং তার চেয়েও অনেক এবং বড় কিছু- সে বিষয়টা সবার আত্মস্থ করাটা এখন বড় বেশি প্রয়োজন।

লেখক : অধ্যাপক, ডিভিশন প্রধান,ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

×