ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২০ মে ২০২৪, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা

ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ

প্রকাশিত: ২০:৫৩, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩

আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা

ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ

‘কাজের মাঝে জাগাই আশা’- প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ১০ সেপ্টেম্বর পালিত হয়েছে বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি নানা আয়োজনে পালিত হয়। বিশ্বে আত্মহত্যা প্রতিরোধে ২০০৩ সাল থেকে প্রতিবছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংস্থা দিবসটি পালন করে থাকে।
বাংলাদেশে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে মেয়েদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেশি, ছেলেদের কম। চিকিৎসকদের মাঝে পুরুষদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি, মেয়েদের কম। রেসিডেন্টদের মাঝে ১১% ডিপ্রেশনে ভুগছে। আমরা তা দূর করার চেষ্টা করছি। করোনা ডিপ্রেশনও আত্মহত্যার অন্যতম মূল কারণ।

যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তাদের অনেকে মেন্টাল ডিস অর্ডারে ভোগেন, ইনসমনিয়ায় ভোগেন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই যখন মোবাইল হাতে নিয়ে কাউকে কল করতে যান, তখন কাকে ফোন করবেন তা মনে করতে পারেন না। ভুলে যাওয়া বা না পারার বিষয়টি ওই ব্যক্তিকে ক্লান্তি এনে দেয়। রোগীদের মাঝে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের রোগীদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। অবশ্য বর্তমানে এ ধরনের রোগীদের আত্মহত্যার প্রবণতা কমেছে। কারণ, ক্যান্সারেরও চিকিৎসা হয়। আইসিইউ রোগীদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে। মেডিসিন বিভাগের রোগীদের সবচেয়ে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আত্মহত্যা প্রবণতার ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থার এক গবেষণার তথ্য থেকে দেখা গেছে, বাংলাদেশে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ৩৬১ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তাদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ২১৪ জন, যাদের ২৬ শতাংশই অভিমান থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। ৬৭ শতাংশ শিক্ষার্থীর বয়স ১৯ বছরের নিচে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারিভাবে সমন্বিত কার্যক্রম না থাকায় আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় জোর দিয়েছেন তারা। 
বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, চলতি বছর আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে স্কুলগামী শিক্ষার্থী সবচেয়ে বেশিÑ ১৬৯ জন (প্রায় ৪৭ শতাংশ)। এছাড়াও কলেজগামী ২৬ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ১৮ শতাংশ এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থী রয়েছেন ৮ শতাংশ। বিভাগ অনুযায়ী চলতি বছর সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগেÑ ৩১ শতাংশ। সবচেয়ে কম সিলেটেÑ ২ দশমিক ৫ শতাংশ। আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০২১ সালে দেশে ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। ২০২২ সালে তা পাঁচগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩২ জনে। চলতি বছর আত্মহত্যা করেছেন ৩৬১ জন।
পরিবারে বাবা-মায়ের সম্পর্কে অস্থিরতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ না থাকা, চলমান সামাজিক অস্থিরতা, কোভিডের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও স্থানীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় শিশু থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। এদিকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার রোগীদের কী পরিমাণ রোগী চিকিৎসার আওতায় আসছে কিংবা বাইরে থাকছে, সে বিষয় সরকারি কোনো পরিসংখ্যান নেই। বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, দেশের ২১ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তবে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসছেন ১০ শতাংশের কম।
আর্থিক ও সামাজিক বৈষম্য মানুষকে হতাশায় ফেলে দিচ্ছে। সে কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বেই এমন দেখা যাচ্ছে। মানসিক রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। বিষণœতার রোগীদের মধ্যে এক ধরনের তীব্র আশাহীনতা তৈরি হয়। তারা মনে করে, মুক্তির একমাত্র উপায় নিজেকে মেরে ফেলা। এ চিন্তায় তাড়িত হয়ে তারা আত্মহত্যা করেন।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা। আত্মহত্যা মোকাবিলায় জরুরি হলোÑপ্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আবেগ-অনুভূতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল ও ধৈর্যশীলতার পাঠ শেখানো। সর্বশেষ, বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা এবং স্কুল হেলথ ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা।

লেখক : অধ্যাপক, উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

×