ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১

চুরুলিয়ায় নজরুল ভবন

নাজনীন বেগম

প্রকাশিত: ২০:৫১, ২৯ মে ২০২৩

চুরুলিয়ায় নজরুল ভবন

১১ জ্যৈষ্ঠ পালিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ১২৪তম জন্মদিবস

১১ জ্যৈষ্ঠ পালিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ১২৪তম জন্মদিবস। বিভিন্নভাবে কবির বন্দনা, সৃষ্টির মাত্রায় তাঁর বৈপ্লবিক মনস্তত্ত্ব সবই একীভূত হয়ে যায় ভক্ত, অনুরাগীদের প্রশংসা আর জয়গানে। সর্বমানুষের জয়গানই শুধু নয়, বরং সর্বশক্তিমান এক বিশ্ব নিয়ন্তার কাছেও নিজেকে সমর্পণ এবং নিবেদন। কবি নজরুলের আশৈশব যাপিত জীবন সুস্থির এবং নির্বিঘœ ছিল না। অতি অল্প বয়সে পিতাকে হারানো নজরুলের মাতৃসান্নিধ্যও খুব বেশিদিন জীবনকে স্বস্তিদায়ক করেনি। ফলে, বালক বয়স থেকেই ঘুরে বেড়াতে হয়েছে যত্রতত্র। মাথার ওপর ছাদ কিংবা অভিভাবক না থাকায় বালক দুখু মিয়াকে যাযাবর জীবনে অভ্যস্ত হতে হয়েছিল জীবিকার তাড়নায়।

এক জীর্ণ, শীর্ণ, ভগ্নদশা কুটিরে জন্ম বাঙালির এই লড়াকু সৈনিকের। শহর, নগর, কিংবা বন্দরে নয়, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামের এক অজপাড়া গাঁয়ে। জীবনীকারদের লেখা এবং জনশ্রুতিতে জানা যায়, পিতৃহীন নজরুল ঘরছাড়া হয়েছেন পারিবারিক বন্ধনের নির্মম শৈথিল্যে। মা জাহেদা খাতুন, বেঁচে থাকলেও স্নেহ-মমতার চিরায়ত সম্পদ থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্নতায় মায়ের নৈকট্যও সেভাবে পাননি। শৈশব থেকে কৈশোরের স্পর্শকাতর সময়গুলো পার করেছেন নিজের মতো করে এবং অভাবনীয় এক ক্ষমতার স্ফুরণে। জীবন ও জীবিকাকে যেভাবে সামলাতে হয়েছে তাও এক উদীয়মান কিশোরের লড়াকু ইতিবৃত্ত।

মক্তবে নিজের প্রাথমিক পাঠ সমাপ্ত করা ছাড়াও ছাত্রদের পড়াতে হয়েছে জীবিকার তাড়নায়। ইমামতি কিংবা মোল্লাগিরিতেও পারদর্শিতার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে অনেকের লেখায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে কঠোর ধর্মাচ্ছন্ন পরিবেশই শুধু নয়, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিভেদপূর্ণ নীতির দুর্দশায় সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পও মাথাচাড়া দেওয়ার ইতিবৃত্ত সমকালীন অঙ্গনকে উত্তপ্ত করে দিত। তেমন ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে এক অপরিণত কিশোরের ইমামতি বা মোল্লাগিরি কতখানি সঙ্গত, সেসব নিয়েও বর্তমানে প্রশ্ন উঠছে। অনিয়মিত স্কুলে যাওয়া, রুটি বেলা থেকে শুরু করে পাঁচকের দায়ভার নেওয়া, নিত্য কিছু টুকিটাকি কর্মযোগে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া ছন্নছাড়া নজরুলের এক জায়গা থেকে অন্য কোথাও ঘুরে বেড়ানো।

আরও এক বিস্ময় ১৩ বছরের এক অশান্ত বালক লেটোদলের সঙ্গেও যুক্ত হন অসাধারণ সুরঝঙ্কারে। উদীয়মান কিশোর থেকে তরুণ নজরুল যৌবনের সন্ধিক্ষণে পা রাখার দুর্লভ সময়ে ১৯২১ সালে লিখে ফেললেন এক অজেয়, অমর কবিতা। তাও নাকি মাত্র এক রাতে ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের কোনো এক অন্তিম সময়ে। সেটাই শুরু। পরবর্তীতে যাপিত জীবনের নানামাত্রিক অভিগমনে অশান্ত, বিদ্রোহী নজরুল সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে উঠলেও নির্মল, শান্ত জীবন সেভাবে কাটাতে পারেননিÑ নীরব, নিস্তব্ধ হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। 
নজরুল সম্পর্কে এমন ধারণা সকলেরই কম বেশি জানা। সূচনা করতে চাই ভিন্ন মাত্রার এক বিষয় নিয়ে। কবির এবারের জন্মদিবসের আগের দিন সাতক্ষীরার কবি ও প্রাবন্ধিক ‘দৈনিক যুগান্তরে’র উপসম্পাদকীয় কলাম-‘দৃষ্টিপাতে’ একটি অনবদ্য প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। তাকে শুধু সাধুবাদ নয়, সর্বান্তকরণে শতভাগ সমর্থন করে নতুন এই প্রস্তাব বিবেচনার অনুরোধ জানাই। কবি আবু আফজাল সালেহের ‘চুরুলিয়ায় হউক বাংলাদেশ ভবন’ আলেখ্যটি শুধু সময়োপযোগী নয়, বরং প্রাসঙ্গিক এবং বিদ্রোহী কবিকে আরও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানার সুযোগও তৈরি করে দেবে অসংখ্য গুণগ্রাহী ভক্ত ও অনুরাগীকে। জীবনের কঠিনতম দুঃসময়কে অতিক্রম করা নজরুলের সার্বিক জীবন কাহিনী সেভাবে অবারিত না হওয়াও দুঃখজনক।

অজপাড়া গাঁ চুরুলিয়া গ্রামটি এখনো ভগ্নদশায়। উন্নয়নের ছোঁয়ার অভাবে নতুন সময়ের আবেদনও তৈরি হতে পারেনি। নজরুল ভক্ত এই লেখক তাঁর লেখার শুরুতেই বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চুরুলিয়ায় নজরুল ভবন করতে পারেন। শেখ হাসিনা যেমন নজির রেখেছেন কবিগুরুর শান্তিনিকেতনে ‘বাংলাদেশ ভবন’ স্থাপন করে। নৈসর্গিক সম্ভার আর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে তৈরি হওয়া বাংলাদেশ ভবনটি চমকপ্রদ এবং আকর্ষণীয়। দৃষ্টিনন্দন তো বটেই। ঢুকলেই সারাবাংলা একসঙ্গে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধের সময় পর্যন্ত সব লড়াই-সংগ্রামের চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। বাংলার সামগ্রিক ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির ধারাকে যে মাত্রায় তুলে ধরা হয়েছে, সেটাও খুব সহজভাবে সাধারণের কাছে প্রতিভাত হচ্ছে।

নিজের দেখার সৌভাগ্যও হয়েছে ভবন নির্মাণের পর শান্তিনিকেতনকে ঘিরে। অনুরূপ হবে নজরুল ভবন চুরুলিয়ায়। তবে নজরুলের চুরুলিয়া অজপাড়া গ্রাম রাঢ় অঞ্চল। প্রাকৃতিক সম্ভার সেভাবে হয়তো নেই, এমনকি নজরুলের ঘর বাড়িরও তেমন কোনো সান শওকত নেই। এখানে বাংলাদেশ ভবন করতে গেলে অনেক কিছুর ভিত তৈরি করতে হবে। যা শুধু সময় নয়, ব্যয়সাপেক্ষ। রবীন্দ্রনাথের বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় সাজানো গোছানো, পরিপাটি জ্ঞানচর্চার এক অভূতপূর্ব প্রাণকেন্দ্র এবং মিলন কুঞ্জ। তবে আমরা কবি আবু আফজাল সালেহের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলতে চাই, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল ভক্ত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও তাই। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পরপরই নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে এসে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়া ছাড়াও নাগরিকত্ব প্রদান করে স্বমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। নজরুলকে জাতীয় কবির মর্যাদায় মহিমান্বিত করা হয়েছে। বিদ্রোহী কবির চল্ চল্ চল্ গানটিকে দেশের সমর সংগীতের আসনে অভিষিক্ত করে অনন্য স্থান দেওয়াও কবির প্রতি অফুরান শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার নিবেদন।
বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপালকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে সর্ব মানুষের দ্বারে পৌঁছে দেওয়াও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব। আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়ন কর্মধারায় বিশ্বে এখন রোল মডেল। চুরুলিয়ায় নজরুলের জন্মস্থানটি অনাদর আর অবহেলায় পড়ে থাকলেও নতুন কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়নি অদ্যাবধি। বিদ্রোহী কবিকে আমরা আমাদের জাতীয় জীবনে নানাভাবে মর্যাদা ও সম্মানের আসনে বসাতে কালক্ষেপণ করিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও লড়াকু অভিগমনে নিজের যাত্রাপথকে তাড়িত করতে হয়েছে সেই স্বাধীনতা যুদ্ধের আগ থেকেই। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বমর্যাদায় মহীয়ান। আন্তঃসম্পর্কীয় অবস্থার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের ঐকমত্যের ভিত্তিতেই চুরুলিয়ায় ‘নজরুল ভবন’ স্থাপন সম্ভব হতে পারে। 
১৯৭৬ সালের ২৭ আগস্ট কবি নজরুলের বিদায়ের ঘণ্টা বেজে ওঠে। নির্বাক নজরুল সেভাবে কোনো কিছুই প্রকাশ করতে পারেননি। ফলে, ভেতরের মর্মমূলে আঘাতটা কোথায় গিয়ে আছড়ে পড়ে তা সব সময় জানা বোঝার বাইরেই থেকে গেছে। বাংলাদেশেই কবিকে সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ প্রাঙ্গণে। একটা আধ্যাত্মিক গানে তিনি জানিয়ে দেন তাকে যেন মসজিদের পাশেই কবর দেওয়া হয়। সেভাবেই শেষ ইচ্ছে পূরণ হয়েছে।

নজরুলকে আরও ব্যাপকভাবে বাংলা ও বাঙালির ঐতিহ্যের ধারায় সন্নিবেশিত করতে পারলে নজরুলকে যথাযথ সম্মান দেওয়া ছাড়াও দুই বাংলার অবিমিশ্র কৃষ্টি সংস্কৃতিকেও নতুনভাবে উপলব্ধি করা যাবে সহজে। বাংলাদেশেও নজরুলের ওপর বিভিন্নভাবে গবেষণা করা হয়েছে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনে। স্বাধীনতার পর সাড়ে তিন বছরেও বিদ্রোহী কবির স্মৃতিবিজড়িত অনেক বিষয় সম্ভার আছে যা নজরুলের সৃষ্টি সংরক্ষণে নিয়ামক ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া ’৪৭-এর দেশ বিভাগের আগেও অবিভক্ত বাংলায় কবি ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গাসহ অনেক স্থানে।

তেমন স্মৃতিগুলোও বাস্তবের দোরগোড়ায় অম্লান করে রাখা যাবে যদি চুরুলিয়ায় ‘নজরুল ভবন’ নির্মাণের মাধ্যমে। বাংলাদেশেও নজরুলের জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। নজরুল সংগীতের দর্শক, শ্রোতার অভাব নেই। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে পাকিস্তান-ভারত দুই দেশ সৃষ্টির যে পাঁয়তারা তা বিদ্রোহী সত্তা নজরুল কোনোভাবেই মানেননি। পাকিস্তানকে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন-ফাঁকিস্তান। পরবর্তী বছর ১৯৪২-এ নজরুল হারান তাঁর সর্ববিধ চৈতন্য আর অভাবনীয় সক্ষমতা। বাঙালি জাতির জন্য অভাবনীয় দুর্যোগ তো বটেই। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মাতোয়ারা, বেপরোয়া নজরুলের নির্জীব আর স্তব্ধতার করুণ মর্মবেদনা মানা যে কত কঠিন ছিল বর্ণনার অতীত। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো নজরুল সংগীত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে লড়াকু যাত্রাপথের অনুষঙ্গ হয়েছে। তেমন বীর একজন কবি সৈনিককে নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মনোরম একটি নজরুল ভবন স্থাপন করা যায় না তাঁর জন্মস্থানে?

লেখক : সাংবাদিক

×