ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

বই উৎসব নিয়ে কিছু কথা

মো. সাখাওয়াত হোসেন

প্রকাশিত: ২০:৫২, ৮ ডিসেম্বর ২০২২

বই উৎসব নিয়ে কিছু কথা

বই উৎসব কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রাণের উৎসব

বছরের প্রথম দিনে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার উদ্যোগ সরকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের অংশ। যেহেতু দিবসটি ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এবং শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে বছরের প্রথম দিনে বই হাতে পাওয়ার ক্ষেত্রে, সে ক্ষেত্রে আসন্ন জানুয়ারির এক তারিখে বই উৎসব অনুষ্ঠিত হবে, এমনটাই প্রত্যাশা দেশবাসীর। এখানে বলে রাখা ভালো, সুনির্দিষ্ট দিনে বই পাওয়ার আনন্দ অন্যরকমের। আর যদি কোনো কারণে বই পাওয়া থেকে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয়, অনেকেই আশাহত হয়ে পড়তে পারে।

এখন সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকলের কাজ হবে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য জানুয়ারির ১ তারিখে ভালোমানের পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা। তাহলে শিক্ষার্থীরা পুলকিত হবে এবং সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ কাজের অংশীদার হওয়ার পাল্লা ক্রমশ ভারি হয়ে উঠবে।
দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, বই উৎসব নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে এবার। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের নিকট বই প্রদান নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। আমাদের মনে রাখতে হবে,  দেশের জন্য আমাদের প্রত্যেকের দায়দায়িত্ব রয়েছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা জানুয়ারিতে বই না পেলে তাদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে। বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে নতুন ক্লাসে উত্তীর্ণ হওয়ার আমেজ। এ ক্ষেত্রে প্রেস মালিক ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের যৌথ উদ্যোগ ও ইতিবাচক মানসিকতা ব্যতীত বই উৎসব সফল হওয়ার সুযোগ নেই।

টেন্ডারের সময় যে শর্তাদি দেওয়া থাকে, সেসব মেনেই প্রেস মালিকদের কাজ করা উচিত। এখন যদি বলা হয়, বাজারব্যবস্থার ঊর্ধ্বগতির কারণে টেন্ডারে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে, সেক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তেমন করণীয় নেই। তথাপি গো ধরে রাখার সুযোগ নেই। কেননা, জানুয়ারি অত্যাসন্ন। কাগজের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে প্রেস মালিকরা কর্তৃপক্ষকে নিম্নমানের বই সরবরাহ করে থাকে। এ জাতীয় কুপ্রবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে প্রেস মালিকদের। কেননা, আপনি যখন টেন্ডারে দরপত্র আহ্বান করেছেন, সে দরপত্র মোতাবেক উল্লিখিত শর্তাদি পূরণ করেই বই শিক্ষার্থীদের নিকট পৌঁছানো উচিত। এর কোনোরূপ ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।
নতুন বই মানেই ঝকঝকে চকচকে কাগজে লেখনীর সুঘ্রাণ। নতুন বইয়ের আলাদা বিশেষত্ব রয়েছে। নতুন বইয়ের ঘ্রাণের মধ্যে যে আমেজ পরিলক্ষিত হয়ে থাকে, সেটি অন্য কোথাও উপলব্ধি করা যায় না। বইয়ের এই উজ্জ্বলতার প্রধান উপকরণ ভার্জিন পাল্প। যা বেলজিয়াম বা জাপান থেকে আমদানি করা হয় দেশে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে পাল্পের আমদানি কমেছে। কিন্তু দেশে এটি একেবারে পাওয়া যাচ্ছে না তা মানতে নারাজ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

এ অজুহাত ধরেই প্রেস মালিকরা কাজ শুরু করতে অবহেলা করছে। কিন্তু এটি কতটুকু যৌক্তিক ও মানানসই, সে বিষয়ে আমাদের ভেবে দেখতে হবে। কারণ, বিষয়টি আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য, তাদের কোনো কারণে কোনোরূপ ক্ষতি হয় সেটি কারোর জন্যই কাম্য নয়। সে জন্যই সংশ্লিষ্ট সকলকে আরও দায়িত্বশীল ও উদার হতে হবে।
সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের অভিযোগ হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর ঔদার্য ও সদিচ্ছাকে পুঁজি করে ব্যবসায়ীরা তাদের অনৈতিক আবদারকে মানিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা করে থাকে। এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, আমাদের কাছে বইয়ের যে নমুনা দেওয়া হয়, সেটা ভালো থাকে। আর শিক্ষার্থীদের হাতে যে বই তুলে দেওয়া হয়, তা একেবারেই নিম্নমানের। বইয়ের কোনো মান নেই।

বই ব্যবসায়ীরা টাকা নেবেন ভালো বই দেওয়ার কথা বলে, অন্যদিকে নিম্নমানের বই দেবেন, তা তো হতে পারে না। মান যাচাই করা অধিদপ্তরেরও দায়িত্ব। কিন্তু বইয়ের মান নিয়ে যা করা হচ্ছে তাতে বাচ্চাদের সঙ্গে করা হচ্ছে প্রতারণা। শিশু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করার অর্থ হচ্ছে, আগামী তরুণ প্রজন্মকে প্রতারণার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার একটি অশুভ শক্তি সমাজে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ হতে অভিযোগ, সংকটে নিম্নমানের কাগজের দামও চড়া। যখন টেন্ডার দেওয়া হয়েছে, তখন কাগজের টন ছিল ৯০ হাজার। এখন এই দাম দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৫-২০ হাজার টাকা। এরপরও কাগজ পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে, প্রেসগুলো কোনো কোনো বইয়ের ৫ ফর্মা ছেপে বসে আছে। ১০ ফর্মা না ছাপলে ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কাজেই যথা শীঘ্রই সম্ভব, আহূত সমস্যাগুলোকে সমাধানের মাধ্যমে দ্রুতগতিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করে শিক্ষার্থীদের হাতে যথাসময়ে বই পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে সংশ্লিষ্টদের।  
এছাড়াও গত বছর প্রাথমিকের বই ছাপানোর প্রায় ২০ কোটি টাকা এখনো বকেয়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বই দেওয়ার ৬ মাস পর্যন্ত জরিমানা বা বই বদলে দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু গত বছর ৬ মাস পরও পুস্তক ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হয়েছে। প্রতিবার বিল নিয়েও ঝামেলা তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কাজ শুরু করা হলো, বই ছাপানোর পরে অধিদপ্তরের পছন্দ হয় না। ফলে, কাগজ-কালি-শ্রম পুরোটাই বৃথা যায়।

এসব কাজের টাকাও পাওয়া যায় না। যে কারণে এ বছর এখনো প্রাথমিকের বই ছাপানোর কাজ শুরু হয়নি। তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতার একটি চেষ্টা চলছে। প্রাথমিকে এখনো অচলাবস্থা আছে জানিয়ে এনসিটিবির এক কর্মকর্তা বলেন, মাধ্যমিকে এখন পর্যন্ত ১২ কোটি বই ছাপা হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় তা ৫৫ ভাগের বেশি।
বই উৎসব কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রাণের উৎসব। শুধু কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নয়, একই সঙ্গে তাদের অভিভাবকদের মধ্যেও এক ধরনের আনন্দের স্ফুরণ পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। গ্রামে-গঞ্জে উৎসবের আমেজে বই প্রদান করা হয়ে থাকে শিক্ষার্থীদের। বই উৎসবকে সামনে রেখে উৎসবের দিনে বাঙালি সংস্কৃতির নানা আয়োজনে ঋদ্ধ হয় শিক্ষার পরিবেশ। দীর্ঘদিন ধরে এক শ্রেণির ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী উৎসবের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। ঐ দিনে তারা গ্রামীণ লোকজ ঐতিহ্যের নানা সংস্করণ নিয়ে বসে উৎসবস্থলে।

অর্থাৎ বই উৎসবের একাডেমিক ও সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। সে গুরুত্বের ধারাবাহিকতায় যারা বই ছাপানোর কাজে নিয়োজিত, তাদেরকে আরও দায়িত্বশীল ও কর্মমুখী হতে হবে। কারণ, তাদের হাতে বিরাট এক গুরু দায়িত্ব। তাদেরকে এ বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে।
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগকে এ যাবতীয় বিষয়াদি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে নিজস্ব প্রেস নির্মাণ ব্যবস্থাপনায় আরও আধুনিক হতে হবে। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে যে বইগুলো সরকার সরবরাহ করে থাকে, সেসব বইসমূহ নিজস্ব উদ্যোগে ছাপানোর যাবতীয় প্রস্তুতি থাকতে হবে সংশ্লিষ্টদের। যদি যাবতীয় প্রস্তুতি থাকে, তাহলে বেসরকারি সংস্থার ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসবে।

বই ছাপানোর যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সেটি আর কখনোই হবে না। আবার অনেকেই এ বিষয়ে উদাসীনতা দেখাবে। কেননা, সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানই লোকসানের মধ্যে পড়ে রয়েছে। সে কারণে বই ছাপানোর জন্য নতুন করে ছাপাখানা নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ কতটুকু যুতসই হবে, সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট মতামত গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানের লোকসানের মূলোৎপাটন করে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণার্থে মাধ্যমিক ও প্রাথমিকের বই ছাপানোর উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করতে হবে ছাপাখানা।
বইয়ের নিম্নমান, প্রিন্টের নিম্নমান ইত্যাদি কারণে সরকারি বই নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। সরকার যদি নিজস্ব উদ্যোগে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বই ছাপানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে জানুয়ারির ১ তারিখ যেমন বই সরবরাহ করা যাবে, ঠিক তেমনিভাবে বইয়ের মান ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও কোনো প্রশ্ন থাকবে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, যে কোনো মূল্যে জানুয়ারির প্রথমদিনে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে কাজের মাধ্যমে। সময়ানুবর্তিতার সঠিক অনুশীলনে আমাদের শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে উঠুক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
 
লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও সভাপতি, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

×