ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয়

মমতাজ লতিফ

প্রকাশিত: ২৩:০৬, ১৮ আগস্ট ২০২২

পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয়

.

মাঝে মাঝে বিস্মিত হয়ে ভাবি- এ জাতিই কি না খেয়ে, না ঘুমিয়ে দিনের পর দিন কাদা-পানি-সর্বশরীরে জোঁক নিয়ে হানাদার বাহিনীকে মাতৃভূমি থেকে হটিয়ে দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছিল? তারা আর এখনকার বাঙালী কি এক? কিভাবে এক হতে পারে এই চাল, তেল, আটা গুদামজাত করে, মূল্য বৃদ্ধি করে নিজ দেশের দরিদ্র, নিম্নবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তের মুখের গ্রাস ছিনিয়ে নেয়া নিত্যপণ্য সিন্ডিকেটকারী, অর্থলোভী বিবেকহীন বাঙালী? ব্যাংক মালিক ও ব্যাংকাররা বিশাল বেতনধারীকিন্তু তারা যেমন আমাদের সাধারণ মানুষের ব্যাংক সঞ্চয়ের অর্থ ঋণ নিয়ে ও দিয়ে বিদেশে পাচার করতে একটুও চিন্তা না করে বিদেশকে ভালবাসছে, বিপদগ্রস্ত করছে স্বদেশকে- এরা তো এক কথায় দেশদ্রোহীতারা এ স্বাধীন দেশকে চুষে খেয়ে ছিবড়া করে রাখছেএদের নাম, ঠিকানা, সুইসব্যাংকে রাখা অর্থ ও সম্পদের তথ্য প্রকাশ করতে আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্র এখনই আদান-প্রদান করা আবশ্যকএ সঙ্গে জাতিসংঘে একটি অনুরোধপত্র দেয়া প্রয়োজন, যাতে পৃথিবীর কোন দেশের কোন ব্যাংক অন্য দেশের ব্যক্তিদের প্রেরিত অবৈধ অর্থ গচ্ছিত রাখা নিষিদ্ধ করেসুইস রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য আমাদের জন্য অবমাননাকর

সুইস ব্যাংকগুলো কেন, কি উদ্দেশ্যে, কোন প্রশ্ন ছাড়া ভিনদেশী নাগরিকদের অর্থ গচ্ছিত রাখে? এ প্রশ্ন তাদেরকে আমাদের করতে হবেএতে তাদের কোন লাভ না থাকলে কোন ইউরোপীয় দেশ, যারা পুরো পৃথিবীকে উপনিবেশে পরিণত করে দুই-তিনশবছর ঐসব দেশের সম্পদ শোষণ করেছে, তারা এ কাজ করত নামানুষকে দাস বানিয়ে তাদের শ্রম পর্যন্ত লুট করে বিপুল সম্পদ যারা সৃষ্টি করেছে, তাদের অনেককে খুব কাছ থেকে দেখে তাদের লাভ ও লোভ সম্বন্ধে স্পষ্ট ভাল ধারণা আছেশ্বেতাঙ্গরা যখন অন্যায় করে তখন তারা খুব সহজে তাদের অন্যায়ের শিকারকেই অপরাধীর অবস্থানে নিয়ে ফেলতে নানা অপকৌশল-ষড়যন্ত্র করতে পটুএই কৌশলটি খুঁজে পেলাম রাষ্ট্রদূতের উক্তির মধ্যে- কি নিয়মে এই তথ্য তাদের কাছে চাইতে হবে সেটি নাকি তারা সরকারকে জানিয়েছে! সে নিয়মে সরকার টাকা পাচারকারীদের তথ্য জানতে চায়নিএই নিয়মটি কি, তা আমাদের জানা দরকারযদিও বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদক জানিয়েছে তারা ৬৭ জনের নাম দিয়ে টাকা পাচারের তথ্য জানতে চেয়েছে বেশ আগেই এবং বেশ কয়েকবারতাহলে সুইজারল্যান্ডকে যদি অর্থ পাচারের স্বর্গ বলা হয়, তাহলে সে অর্থ যে কালো হবেÑ এ বিষয়ে সুইস রাষ্ট্রদূত জানেন না, তা হতে পারে না

যা হোক, এখন পুরো বিশ্বের সব দেশেই জ্বালানি সঙ্কট চলছে এবং পণ্যমূল্যের উর্ধগতি সব দেশের জনগণকে নিদারুণ কষ্টে ফেলেছেআমাদের দেশের দরিদ্র, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা এ সময়ে অসহনীয় হয়ে উঠেছে- এ তো আমরা বাজারে গিয়ে দেখতে পাইসেদিন টকশোতে জানলাম, কানাডা, জার্মান ও যুক্তরাজ্য সরকার জনগণকে থোক বরাদ্দ দিয়ে জ্বালানি ও দ্রব্যমূল্যকে সহনীয় করে তুলেছেআমাদের ছোট অর্থনীতির দেশে সরকার বিনামূল্যে অন্তত ১২ কোটি নর-নারীকে করোনা টিকা দিয়েছেএটি অসাধারণ একটি অর্জন, যা পৃথিবীর কোন স্বল্পোন্নত দেশ করতে পারেনিবর্তমানে ১ কোটি নারী-পুরুষকে মাসে একবার কম মূল্যে চাল ছাড়া তেল, ডাল, চিনি প্রদান করছে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমেসেপ্টেম্বরে পনেরো টাকা কেজিতে চাল দেবে সরকার ৫০ লাখ পরিবারকে

এই দরিদ্রবান্ধব কাজগুলো পৃথিবীর ধনী-দরিদ্র কোন দেশের সরকার করার কথা ভাবেনিএর ওপর, দেশে চলছে অবকাঠামো নির্মাণ কাজএর প্রত্যেকটির ব্যয় বিপুল- পদ্মা সেতু, পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ, শাহজালাল বিমানবন্দর প্রসারিত করার কাজগুলোর জন্য দেশের কর না দেয়া বিপুল জনগোষ্ঠীর দেশে কঠিন ও দুরূহ কাজ

বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ধনীদের জন্য আসলে সমস্যা হয়নিসমস্যা হয়েছে ডিজেলচালিত কৃষকের সেচ কাজ ও সাধারণ মানুষের পরিবহনের কাজেকারখানার শিল্প উপাদনে বিদ্যুত ব্যয়ে ধনী গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের পণ্য মূল্য বৃদ্ধি পাবেসে তো সব দেশেই বৃদ্ধি পাবেচালকল মালিকরা ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সুযোগে চালের দাম বরাবরের মতো বাড়িয়েছেতবে এক টাকার স্থলে দশ টাকা! অন্য ভোগ্যপণ্যের অতি উচ্চ মূল্যও অস্বাভাবিক এবং  সেটাও মধ্যস্বত্ব ভোগীদের অতি মুনাফার লোভের ফল

বর্তমান পরিস্থিতিতে চালের মূল্য না কমলে টিসিবিকে চাল ও অন্য পণ্য দরিদ্র, মধ্যবিত্তকে কম মূল্যে বিতরণ করতে হবে আগের মতোইএক কোটি কার্ডধারীর নামের তালিকায় স্বজনপ্রীতিসহ স্থানীয় সরকারী দলের নেতাদের দ্বারা প্রণীত তালিকা থেকে অনেক দরিদ্র বাদ পড়া এবং সচ্ছল ব্যক্তিদের নাম থাকার অভিযোগ উঠেছে, যা দ্রুত সংশোধন দাবি করে

এ ছাড়া, একটি শ্রমজীবী শ্রেণী, চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি মাত্র ১২০ টাকা! শুনে স্তম্ভিত হয়েছিমাসে ৩,৬০০/- টাকায় চারজনের একটি পরিবারে কি খাদ্য তারা ক্রয় করবে, ভেবে পাচ্ছি নাযে মালিক পক্ষ তাদের কিছু আটা রেশন দিয়ে, শিশুদের শিক্ষা এবং গর্ভবতী নারী, সন্তান জন্মদানসহ নারী-পুরুষের কোন রকম স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা না করে চা শ্রমিকদের মাত্র ১২০ টাকার দৈনিক মজুরি দিয়ে সম্পদশালী হয়েছে- তাদের আদৌ কোন বিবেকবোধ নেই

চা শ্রমিকদের উত্তোলিত পাতার ওজনে যেভাবে ঠকানো হতো, তা সইতে না পেরে আমার ভাই একসময় চা কোম্পানির ম্যানেজারের চাকরি পেয়েও অল্প সময়েই ছেড়ে দেয়!  আজও তা হয়ঘটনার বিশ-বাইশ বছর পরও চা শ্রমিকের ১২০ টাকা দৈনিক মজুরি অকল্পনীয়এই বাজারে ওরা চাল কিনতে পারবে না, তেল-ডাল তো নাগালের বাইরে, অন্য সবজি তো কেনা অসম্ভবওরা আর গার্মেন্ট শ্রমিকরা তো একই পেশাধারী শ্রমিকএরা সেলাইয়ে দক্ষ, ওরা ওদের কাজে দক্ষতাহলে তাদের বেতন-কাঠামো থাকবে না কেন? তাদের মজুরি গার্মেন্টের শ্রমিকদের মজুরির সমানই বা হবে না কেন? তাদের শিশুরা, সন্তানরা কি শিক্ষার সুযোগহীন, স্বাস্থ্য সেবার সুযোগহীন হয়ে সেই ব্রিটিশ, পাকিস্তানী যুগের মতোই থাকবে?

চা বাগানের মালিকদের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দেয়ার জন্য প্রচলিত নিয়মের অধীনে আনতে হবেতারা কি জানেনি যে, এই চা শ্রমিকরা ৭১-এ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল? চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছিল? বিনিময়ে আমরা তাদের কিছুই দেইনিএখন অন্তত তাদের কৃষি শ্রমিকের মজুরি বা কারখানা শ্রমিকের সমান মজুরিটা দেবভয় নেই, এতে চা মালিকদের মুনাফা কমবে না

দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী কোন চাল-তেল-ভোগ্যপণ্য দেশপ্রেমিক ব্যবসায়ী কি নেই, যারা পণ্য মূল্যের হ্রাস কিছুটা হলেও টেনে ধরতে পারেন? পাঠককে বলব জাতির ভুলে বিএনপি-জামায়াত আবার ক্ষমতায় এলে এদেশ কিন্তু পাকিস্তান হবেবন্ধ হবে শিক্ষা-সাংস্কৃতিক সব কর্মকা- চর্চাও৭৬-এর পর, ২০০১- এর পর জঙ্গী দেশ হয়েছিল বাংলাদেশ কাদের নেতৃত্বেÑ স্মরণ করুন

টেলিভিশনে দেখলাম, একজন কৃষিবিদ প্রস্তাব করলেন- কৃষককে ডিজেল ও ইউরিয়া সারের জন্য ভর্তুকি দেয়ার ব্যবস্থা করা উচিতকারণ, এই অনাবৃষ্টিতে আমন ধান ভালভাবে বোনা সম্ভব হয়নিঅথচ দেশের জন্য খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, আত্মনির্ভর হওয়ার বিকল্প নেইকৃষক, গার্মেন্ট শ্রমিক এবং চা শ্রমিকসহ সব দরিদ্র শ্রমজীবীকে বাঁচাতে হবেবঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রধান উন্নয়ন লক্ষ্য-কৃষক এবং শ্রমিকআবারও বলছি- সাময়িক তেলের উচ্চমূল্যের জন্য নির্বাচনে ভুল রাজনৈতিক দলকে বেছে নিলে জাতি, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের আবারও ৭৬-এর মতো চরম মূল্য দিতে হতে পারে লেখক : শিক্ষাবিদ