অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মৃত্যুর পর অধিকাংশ জাতীয় দৈনিক ও গণমাধ্যম তাঁর সম্পর্কে একটি বিশেষণ প্রয়োগ করেছেÑ ‘চেতনার বাতিঘর’। তাঁর সম্পর্কে এর চেয়ে উপযুক্ত বিশেষণ আর কিছু হতে পারে না। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে আনিসুজ্জামানের অবদান সম্পর্কে একাধিক প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করা যায়। কোন সামাজিক-সাংস্কৃতিক নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত না হলেও তিনি বাংলা ভাষা ও বাঙালিত্বের চর্চা সম্পর্কে যা লিখেছেন, গবেষণায় যে নতুন মাত্রা যোগ করেছেনÑ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতে পারতেন। তবে বহু বিজ্ঞজনের মতো শিক্ষকতা, গবেষণা, পা-িত্য তাঁকে সমাজবিমুখ করেনি। বরং তাঁর সমাজমনস্কতা, ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
আনিসুজ্জামান জন্মেছেন ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি পনেরো বছরের কিশোর, পুরান ঢাকার জগন্নাথ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস থেকে জেনেছিÑ রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে কিশোর আনিসুজ্জামান ‘আমাদের ভাষার লড়াই’ নামে দীর্ঘ একটি ইশতেহার লিখেছিলেন, যা পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। তেরো বছর বয়সে তাঁর ছোট গল্প প্রকাশিত হয়েছিল সাহিত্য সাময়িকী ‘নওবাহার’-এ। ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদান সম্পর্কে ১৯৭০ সালে জহির রায়হান আমাকে বলেছিলেন, ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে প্রথম যে দশজন ছাত্র পুলিশের উদ্যত বন্দুক উপেক্ষা করে মিছিলে বেরিয়েছিলেন, তাঁদের একজন ছিলেন ভাষা সংগ্রামী আনিসুজ্জামান।
সেই থেকে রাজপথের আন্দোলনে তাঁর পদচারণা শুরু। একজন সচেতন বুদ্ধিজীবী হিসেবে আমৃত্যু তিনি দায়বদ্ধ ছিলেন সমাজ ও মানুষের প্রতি। আমাদের ‘একাত্তরের ঘাতক-দালাল-নির্মূল কমিটি’র ৮ম জাতীয় সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল এ বছর ১৯ ও ২০ জানুয়ারি, পরে তারিখ পরিবর্তন করে ২৭ ও ২৮ মার্চ নির্ধারিত হয়েছিল। এই সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা ছিল আমাদের সংগঠনের অন্যতম উপদেষ্টা, যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিরুদ্ধে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত গণআদালতের অন্যতম প্রধান অভিযোগকারী অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের। করোনা সংক্রমণের কারণে যেভাবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান স্থগিত হয়েছে, একইভাবে আমাদের জাতীয় সম্মেলনও স্থগিত হয়েছে। করোনা মহামারী না হলে মার্চের ২৭ তারিখে তাঁর সভাপতিত্বে সারা দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নাগরিক আন্দোলনের পাঁচ হাজার নেতাকর্মীর সম্মেলন হতো, নতুন কর্মসূচী নেয়া হতোÑ আমাদের দুর্ভাগ্য তা হয়নি।
গত শতাব্দীর ভাষা আন্দোলনের পর ষাটের দশকে রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্বের চেতনার যে পুনরুজ্জীবন ঘটেছিল, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত বাঙালীর অধিকার ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক আন্দোলনের যে মেলবন্ধন ঘটেছিল, সেখানে যাঁরা অনুঘটকের ভূমিকায় ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাঁদের অন্যতম। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের সংগ্রামের পুরোভাগে ছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম পরামর্শক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার উদ্দেশে একটি বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য ডঃ কুদরতে খোদার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু যে শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন তার অন্যতম সদস্য। এই শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছিলÑ ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতিÑ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু সংবিধানে চলবে না, মাধ্যমিক স্তর থেকে ¯œাতকোত্তর পর্যায়ে তা পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকা-ের পর পাকিস্তানপন্থী মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক অপশক্তির প্রতিনিধি জেনারেল জিয়াউর রহমান অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখল করে রাষ্ট্রের মৌলনীতি বাতিল করার পাশাপাশি অনন্যসাধারণ শিক্ষানীতি বাতিল করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার পথ প্রশস্ত করেছেন।
১৯৭৫-এর পর প্রথমে জেনারেল জিয়া, এরপর জেনারেল এরশাদ এবং সর্বশেষে জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী খালেদা জিয়া বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনাশের পাশাপাশি ’৭১-এর গণহত্যাকারী, স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার বানিয়েছিলেন, যা এদেশের সচেতন নাগরিক সমাজ কখনও মেনে নেয়নি। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংবিধান পুনঃপ্রবর্তনের যে নাগরিক আন্দোলনের সূচনা হয়, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন তার অন্যতম রূপকার। ১৯ জানুয়ারি (১৯৯২) নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠার ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিলÑ সরকার যদি ২৫ মার্চের ভেতর জামায়াতে ইসলামীর আমির, পাকিস্তানি নাগরিক, ’৭১-এর শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচার না করে আমরা ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণআদালত বসিয়ে তার বিচার করব। গণআদালত চরিত্রগতভাবে প্রতীকী হলেও আমরা প্রচলিত আদালতে বিচারের রীতি সেখানে অনুসরণ করেছিলাম। সিদ্ধান্ত ছিল যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারের জন্য গঠিত এই গণআদালতে একটি বিচারকম-লী থাকবেন, অভিযোগকারী থাকবেন, সাক্ষী থাকবেন এবং দুই পক্ষের আইনজীবীও থাকবেন। শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের বিচারকম-লী গঠনের পর প্রশ্ন উঠল অভিযোগকারী কে হবেন। আমরা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে প্রধান অভিযোগকারী হওয়ার জন্য অনুরোধ জানালাম। সম্মতি জানিয়ে বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যেহেতু তিনি ভারতে ছিলেন তখন অবরুদ্ধ বাংলাদেশে যারা ছিলেন তাদের কাউকে অভিযোগকারীদের তালিকায় রাখা দরকার। তাছাড়া গোলাম আযম তো অনেক অপরাধ করেছে। আনিস স্যার বললেন, তিনি গোলাম আযমের বিরুদ্ধে তাঁর সহকর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগ আনবেন। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী আমরা কথা বললাম অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ও সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে। এঁরা তিন জন ছিলেন যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিরুদ্ধে শহীদজননী জাহানারা ইমামের গণআদালতের তিন প্রধান অভিযোগকারী। এঁদের ভেতর একমাত্র অধ্যাপক আনিসুজ্জামানই লিখিত অভিযোগ এনেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত বেঁচেছিলেন। অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর মারা গেছেন দু মাসও হয়নি, এ বছর ২৩ মার্চ আর বরেণ্য লেখক সৈয়দ শামসুল হক না ফেরার দেশে চলে গেছেন ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। এঁরা তিনজনই একাত্তরের ঘাতক-দালাল-নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা ছিলেন আমৃত্যু।
আমরা যারা নির্মূল কমিটি করি তাদের ভেতর অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ছাত্রসংখ্যা কম নয়। শহীদজননী জাহানারা ইমাম থেকে আরম্ভ করে অভাজন আমিÑ আমরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে আনিস স্যারের ছাত্র ছিলাম। অসাধারণ বিনয়ী ছিলেন তিনি। ছাত্ররা বয়সে যত ছোটই হোক সব সময় তাদের ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করেছেন। জাহানারা ইমাম বয়সে আনিস স্যারের চেয়ে আট বছরের বড় ছিলেন। তিনি স্বাভাবিকভাবেই তাঁর শিক্ষককে স্যার বলতেন। আনিস স্যার এতে বিব্রত বোধ করতেন। জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পর আমাদের আন্দোলনকে দীর্ঘ সময় অত্যন্ত কঠিন সময় অতিক্রম করতে হয়েছে। খালেদা-নিজামীদের সরকার আমাদের বার বার ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’র অভিযোগে গ্রেফতার করে কারানির্যাতন করেছে। ২০০১ সালে আমার গ্রেফতারের পর মুক্তির দাবিতে এমন কোন প্রতিবাদসভা বা বিক্ষোভ মিছিল ছিল না যেখানে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন না। সেই সময় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার যে নজিরবিহীন নির্যাতন চালিয়েছিল তার বিরুদ্ধে আনিসুজ্জামান কঠোর ভাষায় শুধু প্রতিবাদই করেননি, উপদ্রুত বহু এলাকায় ছুটে গিয়েছেন, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য শুনেছেন, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নাগরিক কমিটি গঠন করে নির্যাতিত মানুষের সে সব জবানবন্দী প্রকাশও করেছেন।
১৯৯২ সালে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিরুদ্ধে গণআদালত গঠন করার জন্য পাকিস্তান ও জামায়াতপ্রেমী খালেদা জিয়ার সরকার শহীদজননী জাহানরা ইমামসহ যে ২৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করেছিল তাঁদের অন্যতম অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। সে সময় খালেদা জিয়ার সরকার তাঁকে বিদেশে পর্যন্ত যেতে দেয়নি।
বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাও অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কৃতি ছাত্রদের অন্যতম। শিক্ষকদের যোগ্য মর্যাদা দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কখনও কার্পণ্য করেননি। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে তাঁর সরকার ২০১৫ সালে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ প্রদান করেছে। ২০১৪ সালে ভারত সরকার তাঁকে প্রদান করেছে মর্যাদাপূর্ণ ‘পদ্মভূষণ’ পরস্কার। তাঁর আগে বাংলাদেশে আর কেউ এই মর্যাদা অর্জন করেননি। বাংলাদেশ ও ভারতের বহু বিশ্ববিদ্যালয় এবং বহু প্রতিষ্ঠান তাঁকে পুরস্কৃত করে ধন্য হয়েছে। অগণিত পুরস্কার কিংবা হিমালয়সদৃশ খ্যাতি কখনও তাঁকে স্বভাবসুলভ বিনয় থেকে বিচ্যুত করেনি। ধর্ম-বর্ণ-বিত্ত-মর্যাদা নির্বিশেষে সকল মানুষ ছিল তাঁর সম্মানের পাত্র।
মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি আমৃত্যু লড়াই করেছেন ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার জন্য। আমাদের আন্দোলনের লক্ষ লক্ষ কর্মী ও সমর্থক তাঁর দীপ্র চেতনায় আলোকিত। আমাদের আন্দোলন ও সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সবার হৃদয়ে অফুরন্ত প্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবেন।
জয়তু আনিসুজ্জামান।
১৬ মে ২০২০






