ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১

দ্বিতীয় ধাপের ভোট কাল

উপজেলা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিই চ্যালেঞ্জ

​​​​​​​শরীফুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২২:৫৫, ১৯ মে ২০২৪

উপজেলা নির্বাচনে ভোটার  উপস্থিতিই চ্যালেঞ্জ

.

এবার দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের অপেক্ষা। কাল মঙ্গলবার দ্বিতীয় ধাপে সারাদেশের ১৫৭ উপজেলা পরিষদের নির্বাচন। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) তবে নির্বাচনে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতিই ইসিসহ সকল অংশীজনের বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথম ধাপের নির্বাচনে সর্বনি¤œ ভোটার উপস্থিতির রেকর্ড হওয়ায় এবার উপস্থিতি বাড়াতে দৌড়ঝাঁপ করছে নির্বাচন কমিশন। প্রার্থীরাও ভোটারদের মন জয় করতে নানামুখী কৌশল গ্রহণ করছে।

দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা নির্বাচনের আগে রবিবার মধ্যরাতেই শেষ হয়েছে প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার। এখন গোপনে চলছে প্রার্থী এবং তাদের সমর্থক স্বজনদের ভোট প্রার্থনা। বিভিন্ন কৌশলে চলছে বিরামহীনভাবে গণসংযোগ। কিভাবে ভোট ব্যাংক বাড়ানো যায় শেষ মুহূর্তেও সে চেষ্টা চলছে। তবে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে কঠোর বার্তা দিলেও মন্ত্রী-এমপিরা বিভিন্নভাবে তাদের স্বজন কিংবা পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে মাঠে সক্রিয় থাকায় তাদের কর্মী-সমর্থকরা প্রভাব বিস্তার করছে। নিয়ে দলীয় অন্য প্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

এদিকে দলের নির্দেশ উপেক্ষা করে দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বিএনপি থেকে ৭১ জনকে বহিষ্কার করা হয়। তাদের বহিষ্কারের পরও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। প্রথম ধাপের নির্বাচনেও বিএনপির ৮০ জন প্রার্থী ছিলেন। এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে ২৮ জন প্রার্থীর মধ্যে জন বিজয়ী হয়েছেন। এবারও বিভিন্ন উপজেলায় বহিষ্কৃত বিএনপি নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ বিজয়ী হবেন বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা প্রত্যাশা করছেন।

এদিকে ভোট গ্রহণকালে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে কঠোর অবস্থানে নির্বাচন কমিশন। ইতিমধ্যেই ইসির পক্ষ থেকে মন্ত্রী-এমপিদের সতর্ক করা হয়েছে। নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে মন্ত্রী-এমপিরা কারও পক্ষে কাজ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও ইসি জানিয়েছে। ছাড়াও কোনো প্রার্থী কিংবা তাদের পক্ষের লোকেরা বিশৃঙ্খলা করলে কঠোর হাতে দমনের কথা বলা হয়েছে। প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও রয়েছে সতর্ক অবস্থানে।

মে প্রথম ধাপে ১৩৯ উপজেলা নির্বাচনে ভোট পড়ে মাত্র ৩৬ দশমিক শতাংশ। তাই নির্বাচনের পর থেকেই ভোট কম পড়ার বিষয়টিটক অব দ্য কান্ট্রি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়েও কম ভোট পড়লÑ নিয়ে জনমনে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন দল নানামুখী প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই এবার যাতে বেশি সংখ্যক ভোটার কেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদান করেÑ সে জন্য ইসি সরকারের পক্ষ থেকে অংশীজনের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

ভোটের দিন প্রতিটি উপজেলায় থাকবে তিনস্তরের নিরাপত্তা। কেন্দ্রে কেন্দ্রে পর্যাপ্ত পুলিশ আনসার বাহিনী নিয়োজিত করার পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং র‌্যাব বিজিবির টহল থাকবে। উপকূলাঞ্চলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে কোস্টগার্ড। আর সব এলাকায় সাদা পোশাকে থাকবে পর্যাপ্ত গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন। যদি কেউ নির্বাচনের আচরণবিধি ভঙ্গ করেন তাহলে নির্বাচন কমিশন আইন অনুসারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

চারধাপের উপজেলা নির্বাচন শুরু হয় মে। জুন পর্যন্ত চার ধাপে শেষ হবে ৪৯৫টির মধ্যে ৪৮১টি উপজেলার নির্বাচন। প্রথম ধাপে অনুষ্ঠিত হয় ১৩৯ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। দ্বিতীয় ধাপে কাল ২১ মে অনুষ্ঠিত হবে ১৫৭টি উপজেলায় নির্বাচন। তৃতীয় ধাপে ২৯ মে অনুষ্ঠিত হবে ১১২ উপজেলার নির্বাচন। আর চতুর্থ ধাপে জুন অনুষ্ঠিত হবে ৫৫ উপজেলার নির্বাচন। প্রথম ধাপের  ২২টিতে ভোটগ্রহণ হয় ইভিএমে। কাল দ্বিতীয় ধাপে ৮টি উপজেলায় ইভিএমে ভোট হবে। তৃতীয় ধাপে  ২১টি উপজেলায় ভোট হবে ইভিএমে। আর চতুর্থ ধাপে  ২টি উপজেলায় ভোট হবে ইভিএমে। 

দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা নির্বাচনে ভোটগ্রহণকালে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিটি কেন্দ্র আশপাশের এলাকায় থাকবে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রতিটি সাধারণ কেন্দ্রে ১৭ জন ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৯ জন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। আর দুর্গম এলাকায় সাধারণ কেন্দ্রে ১৯ জন ঝঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ২০ থেকে ২১ জন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের করা হবে। সাধারণ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পাশাপাশি ৪৫৭ প্লাটুন বিজিবি দায়িত্ব পালন করবে। এই নির্বাচনে জরুরি সেবা মিলবে ৯৯৯ নম্বরে। নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনে প্রতি ইউনিয়নে থাকবে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। ছাড়া মোবাইল স্ট্রাইকিং ফোর্সের সঙ্গে, বিশেষ করে বিজিবির প্রতিটি মোবাইল টিমের সঙ্গে একজন করে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত থাকবেন। ভোটের দিন মঙ্গলবার ১৫৭ উপজেলায় সাধারণ ছুটি থাকছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন থেকে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানানো হয়।

দ্বিতীয় ধাপে ৬৩টি জেলার যে ১৫৭টি উপজেলা পরিষদে নির্বাচন হবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- রংপুর বিভাগের পঞ্চগড় জেলার বোদা দেবীগঞ্জ; ঠাকুরগাঁও জেলার সদর রাণীশংকৈল; নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর, কিশোরগঞ্জ জলঢাকা; দিনাজপুর জেলার বিরল, কাহারোল, বীরগঞ্জ বোচাগঞ্জ; লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ আদিতমারী; রংপুর জেলার মিঠাপুকুর পীরগঞ্জ; কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট, উলিপুর সদর; গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী সদর।

রাজশাহী বিভাগের জয়পুরহাট জেলার সদর পাঁচবিবি; বগুড়া জেলার দুপচাঁচিয়া, আদমদীঘি কাহালু; চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ; নওগাঁ জেলার সাপাহার, পোরশা নিয়ামতপুর; রাজশাহী জেলার পুঠিয়া, বাগমারা দুর্গাপুর; নাটোর জেলার লালপুর বাগাতিপাড়া; সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া তাড়াশ; পাবনা জেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ফরিদপুর।

খুলনা বিভাগের মেহেরপুর জেলার গাংনী, কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা, মিরপুর, কুমারখালী দৌলতপুর; চুয়াডাঙ্গা জেলার সদর আলমডাঙ্গা; ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকু- শৈলকুপা; যশোর জেলার চৌগাছা, ঝিকরগাছা শার্শা; মাগুরা জেলার শালিখা মহম্মদপুর; নড়াইল জেলার সদর লোহাগড়া; বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট, মোল্লাহাট চিতলমারী; খুলনা জেলার তেরখাদা, দিঘলিয়া ফুলতলা; সাতক্ষীরা জেলার তালা, দেবহাটা আশাশুনি।

বরিশাল বিভাগের বরিশাল জেলার মুলাদী হিজলা; পটুয়াখালী জেলার দশমিনা, গলাচিপা বাউফল; পিরোজপুর জেলার কাউখালী নেছারাবাদ; ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন, সদর দৌলতখান; ঝালকাঠী জেলার সদর নলছিটি; বরগুনা জেলার বেতাগী সদর।

ঢাকা বিভাগের ঢাকা জেলার সাভার ধামরাই; গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী মুকসুদপুর; নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ, রূপগঞ্জ আড়াইহাজার; গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর শ্রীপুর; রাজবাড়ী জেলার সদর, গোয়ালন্দ বালিয়াকান্দি; মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয়, ঘিওর দৌলতপুর; ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা সালথা; মাদারীপুর জেলার কালকিনি; শরীয়তপুর জেলার সদর জাজিরা; নরসিংদী জেলার বেলাবো মনোহরদী; টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর, কালিহাতি ঘাটাইল; মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং টুঙ্গিবাড়ী; কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী, নিকলী অষ্টগ্রাম।

ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ জেলার সদর, মুক্তাগাছা গৌরীপুর; জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ, দেওয়ানগঞ্জ ইসলামপুর; শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী নকলা; নেত্রকোনা জেলার সদর, পূর্বধলা বারহাট্টা।

সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর জামালগঞ্জ; সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর গোয়াইনঘাট; মৌলভীবাজার জেলার সদর রাজনগর; হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল নবীগঞ্জ।

চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা আখাউড়া; কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ বরুড়া; চাঁদপুর জেলার সদর, শাহরাস্তি হাজীগঞ্জ; নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী, চাটখিল সেনবাগ; লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ রায়পুর; চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী ফটিকছড়ি; কক্সবাজার জেলার ঈদগাঁও, চকরিয়া পেকুয়া; খাগড়াছড়ি জেলার সদর, দীঘিনালা পানছড়ি; রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই, বিলাইছড়ি রাজস্থলী এবং বান্দরবান জেলার লামা নাইক্ষ্যংছড়ি।

উল্লেখ্য, দেশে প্রথম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালে। এর পর ১৯৯০ সালে দ্বিতীয়বার ২০০৯ সালে তৃতীয়বার, ২০১৪ সালে চতুর্থবার এবং ২০১৯ সালে পঞ্চমবার উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৯ সালে দেশে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় ৪৮৮টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ৪৫৫টির নির্বাচন যথা সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। বাকি উপজেলাগুলোর নির্বাচন পরে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৯ সালের ১০ মার্চ প্রথম ধাপে ৮২টি উপজেলার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর পর ১৮ মার্চ দ্বিতীয় ধাপে ১২৩টি, ২৪ মার্চ তৃতীয় ধাপে ১২২টি, ৩১ মার্চ চতুর্থ ধাপে ১০৬টি এবং ১৮ জুন পঞ্চম ধাপে ২২টি উপজেলায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

×