ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

নারীদের উদ্বুদ্ধ করতে জ্বালিয়েছিলেন আলোর মশাল

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: ০১:৩২, ৯ ডিসেম্বর ২০২৩

নারীদের উদ্বুদ্ধ করতে  জ্বালিয়েছিলেন  আলোর মশাল

.

একটা সময় ছিল যখন দেশের নারীদের সম্পর্কে ভাবতে গেলেই চোখের সামনে আসত শিশুসন্তান কোলে নিয়ে চুলার পাশে বসে আছেন একজন মমতাময়ী মাতার চারপাশে হাঁড়ি-পাতিল, চুলায় কড়াই, বঁটিতে কাটছেন তরকারিবাজারের থলিটা পড়ে আছে কাছেইসময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে দৃশ্যপটজাতিসংঘ থেকে শুরু করে নাসা, মেট্রোরেল থেকে উড়োজাহাজ দক্ষ হাতে চালাচ্ছেন দেশের নারীরারান্নাঘরের বৃত্ত ভেঙে আলো ছড়াচ্ছে দেশ-বিদেশের নানা কর্মক্ষেত্রেতবে দিনগুলো এমনি এমনি পরিবর্তন হয়নিরান্না আর ঘরগৃহস্থালীতেই যখন বন্দি ছিল নারী জীবন, তখনই আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন একজন মহীয়সী নারীবাংলার ঘরের এককোণায় আঁধারি জীবনকে দিয়েছিলেন পূর্ণ আলোর ছটাযেই ধারা অব্যাহত রয়েছে আজওতার জ্বালিয়ে দেওয়া আলোর পথের যাত্রায় আজ সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছাতে পারছেন নারীরাদেশের এমন কোনো খাত নেই যেখানে পড়েনি নারীদের দৃপ্ত পদচারণাচিকিসা, শিক্ষা, ব্যবসা, রাজনীতি, আমলাতন্ত্রসহ খেলাধুলায়ও সমানে ছড়াচ্ছেন দক্ষতার ছাপআর তাদের উদ্বুদ্ধ করতে যে নারী আলোর মশালটা জ্বালিয়েছিলেন, তিনি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন

প্রায় দেড়শবছর আগে দেশের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্ম নেওয়া এই নারী বেরিয়ে এসেছিলেন নৈমিত্তিক জীবনধারা ভেঙেদেখিয়ে দিয়ে গেছেন নারী মুক্তির দিশাতার লেখা সুলতানাস ড্রিমস’-এর মতোই যেন নারীদের আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন আজ সত্যিআর সেই নারীকে সম্মাননা জানাতে প্রতিবছর তার জন্ম এবং মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ৯ ডিসেম্বর পালন করা হয় বেগম রোকেয়া দিবসপ্রতিবছরের মতো এ বছরও নানা আয়োজনে আজ দিবসটি পালন করা হচ্ছে

দিবসটি উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দেশজুড়ে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচিদিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাদিবসটি উপলক্ষে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের পাঁচ নারীর হাতে তুলে দেওয়া হবে বেগম রোকেয়া পদক ২০২৩এ বছর বেগম রোকেয়া পদক পাচ্ছেন নারী শিক্ষায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য খালেদা একরাম, মরণোত্তর (ঢাকা জেলা)নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় ডা. হালিদা হানুম আখতার (রংপুর জেলা), নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কামরুন্নেছা আশরাফ দিনা, মরণোত্তর (নেত্রকোনা জেলা), নারী জাগরণে উদ্বুদ্ধকরণে নিশাত মজুমদার (লক্ষ্মীপুর জেলা) ও পল্লী উন্নয়নে রনিতা বালা (ঠাকুরগাঁও জেলা)

শুধু এই পাঁচ নারী নন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন নারীরাআর এই পথের অগ্রপথিক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন মন্তব্য করে বিশেষজ্ঞ চিকিসক ডা. আয়েশা আক্তার জনকণ্ঠকে বলেন, একটা সময় আমাদের মেয়েরা পুরুষ চিকিসকের কাছে গর্ভকালীন সেবা নিতে অস্বীকৃতি জানাতেননারী চিকিসক ছিল হাতেগোনা কয়েকজনকিন্তু আজ সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছি আমরাশুধু রাজধানীই নয়, দেশের প্রত্যেক অঞ্চলেই চিকিসা খাতে নারীরা যে অবদান রাখছে তা দেশ-বিদেশেও প্রশংসিত হয়েছেবিশেষ করে করোনাকালে আমাদের চিকিসক-নার্সরা রোগীদের যে সেবা দিয়েছেন তা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা লাভ করেছেকিন্তু এসব সম্ভব হতো না যদি সেই উনবিংশ শতাব্দির শুরুতে বেগম রোকেয়া আলোর প্রদীপটা জ্বালিয়ে না যেতেন

একই কথা বলেন পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এর সাবেক সভাপতি ড. রুবানা হকজনকণ্ঠকে তিনি বলেন, একজন নারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হবেন এটা যেন অবিশ্বাস্য একটা শব্দ ছিল যুগের পর যুগসমাজের মানুষের বদ্ধ ধারণা ছিল নারীরা শুধু রান্না-ঘর গৃহস্থালীর কাজেই পার করে দেবেন জীবনকিন্তু এখনকার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ননারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশের অন্যতম রপ্তানির খাত পোশাক শিল্পেদেশ-বিদেশের ক্রেতাদের সঙ্গে সমান তালে প্রদর্শন করে যাচ্ছেন নিজের যোগ্যতাযা ২০ বছর আগেও কেউ কল্পনা করতে পারত না কেউএই ধারার সূচনা করে গেছেন কিন্তু বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনযা এখনো অব্যাহতভাবে চলছে

দিবসটি উপলক্ষে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বেগম রোকেয়া দিবসে দেশের সব জেলা ও উপজেলায় নারী উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন ও অধিকার বিষয়ে প্রচার ও সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আলোচনাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছেটেলিভিশন ও রেডিওতে নারীর অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠায় বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবেনারী শিক্ষা, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার বিতরণ করা হবে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়

১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের মিঠাপুকুর থানার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্ম নেন বেগম রোকেয়ারক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি নারী জাগরণের অগ্রদূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হনসমাজ সংস্কারক এই নারীর মৃত্যু হয় ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বরবাবা জহির উদ্দিন মুহম্মদ আবুল আলী হায়দার সাবের, মা রাহাতুন্নেছা চৌধুরানীবেগম রোকেয়ার ছিল দুই ভাই ও দুই বোনবড় ভাই ইবরাহিম সাবের ছিলেন প্রগতিশীল মানুষঅগোচরে মোমের আলোয় বেগম রোকেয়া ও আরেক বোন করিমুন্নেছাকে দিতেন বর্ণশিক্ষাআর রোকেয়ার ছিল জানার ও শিক্ষার অদম্য আগ্রহ

বেগম রোকেয়ার জীবনী পর্যালোচনায় জানা যায়, ১৮৯৬ সালে ১৬ বছর বয়সে বেগম রোকেয়ার বিয়ে হয় ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদূর সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গেরোকেয়া পেলেন আরেক জন প্রগতিশীল মানুষের সাহচার্যস্বামী সাখাওয়াত হোসেন বেগম রোকেয়ার লেখাপড়ার প্রতি অকুণ্ঠ আগ্রহ দেখে তাকে সাহায্য করতে লাগলেন বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে এবং তার লেখালেখিতে সাহায্য করতে লাগলেনএই শিক্ষাই বেগম রোকেয়াকে ভাবতে শিখিয়েছিল সে সময়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন জীবন, শিক্ষাহীন নারী সমাজের মুক্তির কথানারীদের অশিক্ষার অন্ধকার থেকে কী করে তাদের টেনে তোলা যায়, সে ভাবনা থাকত তার মাথায়আর তাই তো তিনি স্বপ্ন দেখলেন একটি স্কুলেরযেখানে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীরা লেখাপড়া শিখবেআর তার এ স্বপ্নকে আরও বড় করে তোলেন তার স্বামী সাখাওয়াত হোসেন১৯০২ সালে পিপাসানামে একটি বাংলা গল্প লিখে সাহিত্যের জগতে প্রবেশআর ১৯০৫ সালে রোকেয়া ইংরেজিতে লিখলেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ সুলতানাস ড্রিমসসাখাওয়াত হোসেন লেখাটি পড়ে অভিভূত হয়ে পড়েন এবং তাকে উসাহ দেন লেখাটি বই আকারে প্রকাশ করার জন্য১৯০৮ সালে সুলতানাস ড্রিমস বই আকারে প্রকাশিত হয়পরবর্তীকালে বইটি বাংলায় সুলতানার স্বপ্ননামে রূপান্তরিত হয়েও প্রকাশিত হয়এই বইটিকে বিশ্বের নারীবাদী সাহিত্যে একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হয়তার অন্যান্য গ্রন্থ হলো অবরোধবাসিনী’, ‘মতিচুর’, ‘পদ্মরাগ১৯০৯ সালে সাখাওয়াত হোসেন খান মৃত্যুবরণ করেন

সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুর পাঁচ মাস পর ১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর ভাগলপুরের তদানীন্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ শাহ আব্দুল মালেকের সরকারি বাসভবন গোলকুঠিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুলতখন এর ছাত্রী সংখ্যা ছিল পাঁচজন১৯১০ সালে সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলার কারণে স্কুল বন্ধ করে কলকাতায় চলে যান

পরবর্তীতে ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ স্কুলটি কলকাতায় ১৩ নম্বর ওয়ালীউল্লাহর ভাড়া বাড়িতে নতুন করে পুনরায় চালু করা হয়বর্তমানে স্কুলটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার পরিচালনা করছেকলকাতায় প্রাথমিক অবস্থায় এই স্কুলের ছাত্রী সংখ্যা ছিল মাত্র আটজনসে সময় নারী শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রীদের ও তাদের অভিভাবকদের বোঝাতেন শিক্ষার কথাএতে ধীরে ধীরে ছাত্রী সংখ্যা বাড়তে লাগল১৯৩০ সালে এটি হাইস্কুলে পরিণত হয়স্কুল প্রতিষ্ঠা করা ছাড়াও সে সময়ের নিগৃহীত নারী সমাজের অধিকার আদায়ের প্রতিষ্ঠাকে আরও বেগবান করার জন্য ১৯১৬ সালে আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলামনামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেনসেই সঙ্গে চলতে থাকে সমাজের নানা অসঙ্গতির বিরুদ্ধে তার ক্ষুরধার লেখনি১৯১৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মুসলিম মহিলা ট্রেনিং স্কুলসেখানে নারীদের রান্না, সেলাই, সন্তান পালনসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো১৯৬৩ সালে প্রথম রোকেয়ার নামে একটি কলেজ স্থাপন করা হয়পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে এটি জাতীয়করণ করা হয়১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী হলের নামকরণ করা হয় তার নামানুসারেবর্তমান সরকার ২০০৯ সালে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়করে

×