ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১

আসছে এক কার্গো এলএনজি, দুই/এক দিনের মধ্যেই বাড়বে উৎপাদন

বিদ্যুতে ভোগান্তি কাটছে

স্বপ্না চক্রবর্তী 

প্রকাশিত: ২৩:১০, ৮ জুন ২০২৩

বিদ্যুতে ভোগান্তি কাটছে

তীব্র তাপপ্রবাহ বিদ্যুতের চাহিদা ছাড়িয়েছে রেকর্ড

তীব্র তাপপ্রবাহ বিদ্যুতের চাহিদা ছাড়িয়েছে রেকর্ড। ঠিক এমন সময় কয়লা সংকটে বন্ধ হয়ে যায় দেশের সবচেয়ে বড় তাপভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পায়রার উৎপাদন। ফলে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন তলানিতে নেমে আসায় দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ে অসহনীয় হয়ে ওঠে জনজীবন। তবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। আজ-কালের মধ্যেই এক কার্গো এলএনজি দেশের বন্দরে পৌঁছার কথা রয়েছে। যেখানে প্রায় ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন এমএমবিটিইউ (এলএনজির ইউনিট) গ্যাস রয়েছে। এই গ্যাসের পুরোটাই ব্যবহার হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে।

এতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চাহিদার অনেকটাই পূরণ হবে। শুধু তাই নয়, উৎপাদনে আসতে যাচ্ছে বেসরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে দেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারা পশ্চিম বড়ঘোনা এস আলমের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও। ১৩২০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি থেকে দৈনিক অন্ততপক্ষে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার আশা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। সরবরাহ বাড়াতে চেষ্টা করছে আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রও। সক্ষমতার পুরোটাই বাংলাদেশের সংকটকালীন দেওয়ার চেষ্টা করছে ভারতের এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। একইভাবে বাড়ানো হচ্ছে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও। এদিকে একদিনের ব্যবধানে আবহাওয়ায়ও এসেছে লক্ষণীয় পরিবর্তন। বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির পাশাপাশি দেশজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ কমতে শুরু করেছে। এর সঙ্গে কমতে শুরু করেছে বিদ্যুতের চাহিদাও। ফলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপাত বিপদ উত্তরণের পথে রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
কমতে শুরু করেছে চাহিদা ॥ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার দিনেরবেলা দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয় ১২ হাজার ৬৭৭ মেগাওয়াট। চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন কম হওয়ায় দেশজুড়ে লোডশেডিং করতে হয় ১ হাজার ৭৪১ মেগাওয়াট। যা আগের দিনের চাইতে প্রায় অর্ধেক। এর আগেরদিন অর্থাৎ বুধবারে একই সময়ে দেশজুড়ে লোডশেডিং করা হয় ২ হাজার ৩৮০ মেগাওয়াট। পিডিবি জানায়, উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদিত হয় ৬ হাজার ৪৪৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

একইভাবে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন হয় ৩ হাজার ৫২ মেগাওয়াট, কয়লা থেকে ১ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট, হাইড্রো থেকে ২ ৫ মেগাওয়াট, সোলার থেকে ১৬৪ মেগাওয়াট, বায়ু থেকে ৪ মেগাওয়াট, ভেড়ামারা থেকে পাওয়া যায় ৯৩০ মেগাওয়াট এবং ত্রিপুরা থেকে আসে ১৫৪ মেগাওয়াট। 
বাড়ানো হচ্ছে উৎপাদন ॥ জ্বালানি সংকটে এতদিন বড় পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চলছে অর্ধেক সক্ষমতায়, একই অবস্থা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রেরও। পিডিবি জানিয়েছে, দেশে চালু মোট ১৪৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে জ্বালানি সংকটে বন্ধ রয়েছে অন্তত ৫০ টি বিদ্যুৎকেন্দ্র। পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ রয়েছে সবচেয়ে বড় তাপভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পায়রার উৎপাদন। এতে করে এ কয়দিন দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ে তীব্রতা বাড়ে। কিন্তু সংকট সমাধানে সরকার একগুচ্ছ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জানিয়ে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন জনকণ্ঠকে বলেন, বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পায়রার জন্য কয়লা আনতে ডলার সরবরাহ করেছে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন।

আশা করছি, ২৪ জুনের মধ্যে কয়লা পৌঁছে যাবে দেশের বন্দরে। তার পর পরই পায়রায় পুনরায় উৎপাদন শুরু হবে। এছাড়া দুই/একদিনের মধ্যে সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র এস আলমের বাণিজ্যিক উৎপাদনের তারিখ (সিওডি) ঘোষণা করা হবে। যদিও তারা এরই মধ্যে পরীক্ষামূলক উৎপাদন করছে। পরিমাণে কম হলেও তা সংকটে আমাদের কাজে দিচ্ছে। একইভাবে আদানিও তাদের সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। যদিও গত বুধবার রাতে তাদের একটি লাইন বাংলাদেশের রহনপুর এলাকায় ট্রিপ করেছিল। কিন্তু তা কিছুক্ষণের মধ্যেই পুনরায় চালু হয়ে স্বাভাবিকভাবে সরবরাহ করছে। এদের থেকেও বাড়তি বিদ্যুৎ পাওয়ার আশা করছি আমরা। সবচেয়ে বড় কথা, আজ বা কালের মধ্যে এলএনজির একটি কার্গো দেশের বন্দরে ভিড়বে। যার পুরোটাই ব্যবহার হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। তাই লোডশেডিংয়ের তীব্রতা অনেকটাই কমে যাবে বলে আমরা আশা করছি।
গলার কাঁটা রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ॥ দেশজুড়ে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ১৫৩টি। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের কেন্দ্র রয়েছে ৭০ থেকে ৭৪টি। এসব কেন্দ্রের বেশিরভাগই জ্বালানি সংকটে বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রয়েছে অনেক রেন্টাল, কুইক রেন্টাল কেন্দ্রও। এসব কেন্দ্র উৎপাদন না করেও সরকারের কাছ থেকে দিনের পর দিন আদায় করছে ক্যাপাসিটি চার্জ। গত বছর সংসদীয় কমিটির কাছে দেওয়া প্রতিবেদনে নয় মাসে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা চার্জ দেওয়ার কথা জানিয়েছে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় জানায়, এর আগের বছরের জুলাই থেকে ওই বছরের মার্চ পর্যন্ত সরকারি, বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৯০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ১৬ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়েছে। প্রতিমাসে গড়ে দেওয়া হয়েছে এক হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা।

এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৮ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৮ হাজার ১২৩ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়েছে। প্রায় তিন বছরে মোট দেওয়া হয়েছে ৫৩ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা। সংকটকালীন এসব কেন্দ্রকে বসিয়ে না রেখে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ডলার সংকটে দেশের অর্থনীতি যখন টালমাটাল; বিদ্যুতের জ্বালানি আমদানি পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে তখন এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে বসিয়ে অর্থ পরিশোধের কোনো মানে হয় না। এগুলোকে হয় উৎপাদনে নিয়ে আসা হোক না হয় বন্ধ ঘোষণা করা  হোক।

তবে অধিকাংশ রেন্টাল,Ñকুইক রেন্টাল কেন্দ্রেরই মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে জানিয়ে পিডিবি’র পরিচালক (জনসংযোগ পরিদপ্তর) মো. শামীম হাসান জনকণ্ঠকে বলেন, ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো করা হয়েছিল একটি বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায়। সেই পরিস্থিতি এখন আর  নেই। বর্তমানে যে সংকট তৈরি হয়েছে তাও সাময়িক। সংকট সমাধানে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২৪ জুনের মধ্যে কয়লাও চলে আসবে। চাহিদাও কমতে শুরু করেছে। আশা করছি, মানুষের ভোগান্তি কমবে দুই/একদিনের মধ্যেই। 
অলস বসিয়েই অর্থ শোধ ॥ কেরানীগঞ্জের পানগাঁওয়ের এপিআর এনার্জি বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির ক্ষমতা ৩০০ মেগাওয়াট। ২০১৯-২০ অর্থবছরে  কেন্দ্রটি থেকে মাত্র ৩৪ লাখ ৪৮ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। যা সক্ষমতার এক শতাংশেরও কম। কেন্দ্রটিকে ৫৩২ কোটি ৯১ লাখ টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়। ফলে আইপিপি কেন্দ্রটির প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় পড়ে একহাজার ৫৭৯ টাকা ৫৭ পয়সা। যা দেশে সর্বোচ্চ রেকর্ড।
২০২০-২১ অর্থবছরে একই বিদ্যুৎকেন্দ্র সাত কোটি ৭২ লাখ ইউনিট উৎপাদন করায় প্রতি ইউনিটের খরচ পড়েছে ৮৯ টাকা। এই অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি দাম পড়েছে ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার সিরাজগঞ্জের প্যারামাউন্ট বিট্যাক এনার্জি লিমিটেডের উৎপাদিত বিদ্যুতের। প্রতি ইউনিটের দাম পড়েছে ১৮০ টাকা। এই উদাহরণ অন্য অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রেরও। বিশ্লেষকরা বলছে, দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ৪০  থেকে ৪৮ ভাগ গড়ে অব্যবহৃত থাকে। কিন্তু তাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ উৎপাদনের খরচ দিয়ে দিতে হয়। ফলে ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের অনেক দাম পড়ে যায়। যা বর্তমান সংকটের সময় বাঞ্ছনীয় নয়। 
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ২০০৯-১০ সালের বিদ্যুৎ খাত এবং এখনকার বিদ্যুৎ খাত এক নয়। তখন জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল। চুক্তিগুলো ছিল তিন থেকে পাঁচ বছরের। কিন্তু এর পর এগুলোর সঙ্গে একই শর্তে কেন চুক্তি নবায়ন করা হলো বুঝতে পারছি না। সম্প্রতি আরও পাঁচটির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সুবিধা দিতে করা হয়েছে। যখন দেখা গেল চাহিদার চেয়ে ৪০ থেকে ৪৮ ভাগ ক্যাপাসিটি বেশি তখনই তো সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার ছিল। দেশ এখন একটি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখন এগুলোকে বসিয়ে বসিয়ে টাকা দেওয়া অর্থনীতির বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে বলে আমরা মনে করি। 
বিদ্যুতের ভুল নীতি ॥  সাম্প্রতিক এই সংকট বিদ্যুত বিভাগের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাওয়ার সেলের তথ্যমতে, দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা এখন ২৭ হাজার ৩৬১ মেগাওয়াট। গত মঙ্গলবার জ্বালানির অভাবে ৫ হাজার ৩৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়নি। এ ছাড়া নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য ২ হাজার ৯৭৭ মেগাওয়াট বন্ধ ছিল। এর পরও পিডিবির হাতে ছিল ১৫ হাজার ৩৩৩ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা। এদিনের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল রাত ৯টায় ১৫ হাজার ৮০০  মেগাওয়াট।

অর্থাৎ ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেদিন ৩ হাজার ৯৩ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেড করতে হয়েছে। এটি বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু ভুল নীতি গ্রহণের ফলেই হচ্ছে দাবি করে অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, চাহিদার চেয়ে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ শতাংশ বেশি। ফলে জ্বালানি সংকট ছাড়াও অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকে। কিন্তু তাদের ক্যাপাসিটি চার্জের অর্থ ঠিকই পরিশোধ করতে হয়। যা বিদ্যুৎ খাতের জন্য বাড়তি বোঝা  তৈরি করেছে। গত ১২ বছরে ক্যাপাসিটি পেমেন্টের নামে ১ লাখ কোটি টাকার ওপর নিয়ে গেছে বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীরা।

বিদ্যুৎ খাতের লুটপাটের জন্যই চাহিদা না থাকলেও একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানো হয়েছে। দেশী গ্যাস, কয়লার উত্তোলন আর অনুসন্ধানে উদ্যোগ না নিয়ে আমদানির দিকে ঝুঁকেছে সরকার। কারণ এতে কমিশন মেলে। যার কুফল এখন ভোগ করছে জনগণ। এখনই উপযুক্ত সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করার। না হলে জনগণকে দুর্ভোগ পোহাতেই হবে। 

×