ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৭ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২

যুক্তরাষ্ট্রের সেকশন ৩১-এর আওতায় তদন্ত শুরু

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে ফের উদ্বেগ

মীর্জা মসিউজ্জামান

প্রকাশিত: ০০:৪০, ১৭ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে ফের উদ্বেগ

বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের

বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্য পদক্ষেপ। বিদেশি পণ্যের ওপর সম্ভাব্য নতুন আমদানি শুল্ক আরোপের লক্ষ্যে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যার আওতায় বাংলাদেশের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশের রফতানি খাত-বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে কূটনৈতিক ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, সময়োপযোগী কৌশল ও সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) জানিয়েছে, ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১ অনুযায়ী বিদেশি দেশগুলোর উৎপাদন কাঠামো, সরকারি নীতি এবং বাণিজ্যিক আচরণ পর্যালোচনার জন্য এই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পণ্যের ওপর নতুন আমদানি শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
এই তদন্তে বাংলাদেশসহ মোট ১৭টি দেশ ও অর্থনৈতিক অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তালিকায় থাকা অন্যান্য দেশের মধ্যে রয়েছে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, মেক্সিকো, জাপান ও ভারত।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প খাত ও কর্মসংস্থান সুরক্ষাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তিনি জানান, বিদেশি বাজারে অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা, সরকারি ভর্তুকি, শ্রম অধিকার লঙ্ঘন কিংবা বাজার বিকৃতকারী নীতির কারণে মার্কিন কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতায় অসুবিধার মুখে পড়ছে কি না— তা খতিয়ে দেখা হবে।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ ॥ বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র দেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের বড় একটি অংশ এই বাজারের ওপর নির্ভরশীল।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৫ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার। যা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১৯ দশমিক ৫০ শতাংশ।
ফলে, সম্ভাব্য নতুন শুল্ক আরোপ হলে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত- বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পÑ চাপের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে অযথা উদ্বিগ্নও হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং তথ্যভিত্তিক উপস্থাপন ও কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি বোঝানো সম্ভব।

শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রতিক্রিয়া 
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ওই রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, তদন্তের তালিকায় বাংলাদেশের নাম আসা কিছুটা অস্বস্তিকর হলেও এটিকে বড়ো ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখার কারণ নেই।
তার মতে, মূলত অন্যায্য বাণিজ্য চর্চা, শ্রম অধিকার লঙ্ঘন, অতিরিক্ত প্রণোদনা বা মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের মতো অভিযোগ যাচাই করতেই এই তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে উৎপাদন খাতে মেধাস্বত্ব সংক্রামিত কার্যক্রম খুব সীমিত এবং মার্কিন ব্র্যান্ডের পণ্যের বাজারও তুলনামূলকভাবে ছোট। শ্রম অধিকার পরিস্থিতিও গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।’
আদালতের রায়ের পর নতুন কৌশল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টদের। যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন তদন্ত উদ্যোগের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ আদালতের রায়।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জরুরি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দেখিয়ে বিদেশি পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেছিলেন। তবে চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সেই শুল্ক ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়।
রায়ে বলা হয়, ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার অ্যাক্ট ব্যবহার করে ব্যাপকভাবে আমদানি শুল্ক আরোপ করার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নেই। শুল্ক নির্ধারণের মূল ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে থাকা উচিত। এই রায়ের পর বিকল্প আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নতুন শুল্ক আরোপের পথ খুঁজতে শুরু করে মার্কিন প্রশাসন।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ। রপ্তানি বাজার সুরক্ষায় কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার ও কৌশলগত বাণিজ্য আলোচনার পরামর্শ তাদের।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন জনকন্ঠকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড়ো বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় কৌশলগত কূটনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উচিত তথ্যভিত্তিক যুক্তি তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানো যে, বাংলাদেশের উৎপাদন কাঠামো মার্কিন শিল্পের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতামূলক নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের গবেষক ড. তৌহিদুল ইসলাম জনকন্ঠকে বলেন, ‘এই পরিস্থিতিকে কেবল ঝুঁকি হিসেবে না দেখে বরং একটি নতুন বাণিজ্য সংলাপের সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।’
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের বড়ো একটি অংশ মনে করছেন, এই তদন্তের ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের জন্য বড়ো কোনো নেতিবাচক সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়।
কারণ বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতামূলক নয়। ফলে কূটনৈতিক সংলাপ, তথ্যভিত্তিক উপস্থাপন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্যানেল হু

×