প্রথম বৃষ্টিতে আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে
শ্রীমঙ্গলকে বলা হয় ‘দুটি পাতা একটি কুড়ির দেশ’ মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় সবচেয়ে বেশি চা-বাগান রয়েছে । দেশ-বিদেশে একে ‘চায়ের রাজধানী’ বলা হয়। প্রায় প্রতিটি চা-বাগানে রয়েছে নিজস্ব চা ফ্যাক্টরি, যেখানে উৎপাদিত কচি পাতা প্রক্রিয়াজাত করে দেশি ও আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়। দীর্ঘ বিরতির পর বসন্তের প্রথম বৃষ্টিতে আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে শ্রীমঙ্গলের বিস্তীর্ণ সবুজ চা-আঙিনা।
গত শুক্রবার সকালের বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে জেলাজুড়ে দেখা গেছে নতুন উদ্দীপনা। বৃষ্টির স্পর্শে গাছে ফুটেছে কচি কুঁড়ি, আর বাগানজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তাজা পাতার সুবাস। হলদে হয়ে পড়া শীতল পাতা ঢেকে দিয়েছে নতুন সবুজের সমারোহ। এই সময় থেকেই শুরু হয়েছে বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ মৌসুমের প্রথম ধাপের চা-পাতা চয়ন, যা চা শিল্পে ‘ফার্স্ট ফ্লাশ’ নামে পরিচিত। চা বাগান সূত্র জানায়, খরার কারণে জেলার ২৫-৩০ শতাংশ বাগানের চারা গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। কাক্সিক্ষত নতুন কুঁড়ি বা চা-পাতার অভাবে বেশিরভাগ কারখানা চালু করা যায়নি। এতে গেল বছরের মতো এ বছরও চায়ের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় ছিল। অবশেষে বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরেছে বাগানগুলোতে।
সরেজমিন দেখা গেছে, গত জানুয়ারি থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় অনেক বাগানেই সেচ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। কোথাও পানির উৎস নেই, কোথাও জলাধার শুকিয়ে গেছে। ফলে স্প্রিংলার দিয়ে সেচ ব্যবস্থাও অনেক জায়গায় অচল হয়ে পড়েছিল। অবশেষে বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরেছে জেলার চা-বাগান এলাকায়। চা শিল্পাঞ্চলের চা উৎপাদক মহলে স্বস্তি এনে দিয়েছে।
জানা গেছে, দুই দফায় ৩৬ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এর মধ্যে শুক্রবার ভোর ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে ৩ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। তারপর দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয় ৩২ দশমিক ৫ মিলিমিটার। সব মিলিয়ে ৩৬ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
চা গাছের সঠিক বৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য বৃষ্টিপাত একটি অপরিহার্য উপাদান, যা চা গাছকে আর্দ্রতা সরবরাহ করে। চা গাছের বৃদ্ধি ও চা পাতা উৎপাদনের জন্য আদর্শ বৃষ্টিপাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চা গাছের সঠিক বৃদ্ধির জন্য বৃষ্টিপাতের মাসিক বণ্টন খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং চায়ের মৌসুমে তা কমপক্ষে ১০০ মিমি থাকা বাঞ্ছনীয়। মাসিক বৃষ্টিপাত ১০০ মিলিমিটার এর কম হলে চা গাছ খরায় টিকতে পারে না।
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. আনিসুর রহমান জানান, শুক্রবার সকাল ৫টা থেকে ৬টা পর্যন্ত ৩ দশমিক ৮ মিলিমিটার এবং দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ৩২ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
চা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রথম বৃষ্টির পর জন্মানো পাতাগুলো তুলনামূলক কোমল ও সুগন্ধি হওয়ায় এর মানও বেশি। এর স্বাদ ও ঘ্রাণ বাজারে চা-প্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে।
ফিনলে টি কোম্পানির ভাড়াউড়া ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ শিবলি স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ‘যতটুকু বৃষ্টিপাত হয়েছে, তাতে আমরা স্বস্তিবোধ করছি। কিছুদিন আগে এই চা-গাছের মাথা ছাঁটাই করা হয়েছিল। রুক্ষভাব দেখা গিয়েছিল চা-বাগানে। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টির কারণে আবারও জেগে উঠেছে চা-গাছগুলো। প্রথম বৃষ্টির পর চা গাছে যে কচি পাতাগুলো গজায়, সেগুলোকে বলা হয় ‘ফার্স্ট ফ্লাশ’ বা প্রথম ধাপের চা পাতা। এই পাতাগুলো সবচেয়ে কোমল ও সুগন্ধি হওয়ায় এর মানও তুলনামূলক বেশি।
ইস্পাহানি জেরিন চা-বাগানের উপমহাব্যবস্থাপক সেলিম রেজা জানান, ‘শীতের পর আমরা কৃত্রিমভাবে চা-গাছে পানি দিচ্ছিলাম। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় গাছগুলো রুক্ষ্ম হয়ে গিয়েছিল। তবে এই বৃষ্টিতে গাছগুলো আবার সতেজ হয়ে উঠেছে। নতুন চারা ও প্রুনিং করা গাছের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগাম বৃষ্টির কারণে দ্রুত কুঁড়ি বের হবে এবং আমরা দ্রুত পাতা সংগ্রহ শুরু করতে পারব। এতে এবারের উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
এ বিষয়ে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা চা গবেষক ড. শামীম আল মামুন স্থানীয় গনমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ‘চা গাছের বেড়ে ওঠা আর পাতা উৎপাদনের জন্য বৃষ্টি অত্যন্ত জরুরি। বছরে ২ হাজার মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত চা শিল্পের জন্য আদর্শ। আর একটি পরিণত চা গাছ শীতকালে গড়ে ১ দশমিক ৩ মিলিমিটার ও গ্রীষ্মকালে প্রায় ৬ মিলিমিটার পানি প্রয়োজন হয়।’
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘মৌলভীবাজারে মৌসুমের শুরুতে হওয়া বৃষ্টিপাত জেলার রবি ফসলের জন্য আশীর্বাদ। এই বৃষ্টিতে ধান, চাসহ সব ধরনের ফসলের উপকার হবে।’
প্যানেল হু








