ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৭ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২

পরিবহন সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া ও যানজটসহ নানা ভোগান্তি

টার্মিনালে ঘরমুখো মানুষের ভিড় বাড়ছে যাত্রীর চাপ

ইবরাহীম মাহমুদ আকাশ

প্রকাশিত: ০১:২৩, ১৭ মার্চ ২০২৬

টার্মিনালে ঘরমুখো মানুষের ভিড় বাড়ছে যাত্রীর চাপ

নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে রাজধানীবাসী। সোমবার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল

ঈদ উপলক্ষে রাজধানী ছাড়ছেন ঘরমুখো মানুষ। ঈদের আগে সোমবার শেষ কর্ম দিবস থাকায় অফিস শেষে গ্রামে যেতে দেখা গেছে অনেককেই। আজ মঙ্গলবার থেকেই শুরু হচ্ছে ঈদের ছুটি। এবার সাপ্তাহিক বন্ধসহ ঈদে মোট ৭ দিন ছুটি পাবেন কর্মজীবী মানুষরা। এ ছাড়া ঈদের বন্ধের পরে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের আরও একটি ছুটি পাবেন তারা। তাই দীর্ঘ ছুটিতে পরিবার নিয়ে ঢাকার বাইরে ঘুরতে ও গ্রামের বাড়ি ঈদ করতে যাচ্ছে অনেকেই।

যাত্রাপথে পরিবহন সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া ও যানজটসহ নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সড়কপথের যাত্রীদের। নৌপথে লঞ্চের কেবিন সংকটসহ অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেন যাত্রীরা। অনেকটা স্বস্তিতে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে রেলপথের যাত্রীদের। 
তবে এবারের ঈদযাত্রায় নিরাপত্তা বিঘেœর মতো বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নেই বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, ‘ঈদযাত্রায় নিরাপত্তা বিঘিœত করার মতো বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। তারপরও সতর্ক থাকব, যাতে যাত্রীসেবার মান বজায় থাকে।’ সোমবার রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা বলেন।  পরিদর্শনকালে মন্ত্রী লঞ্চ টার্মিনালের বিভিন্ন গেট, যাত্রীসেবা কেন্দ্র ও ব্যবস্থাপনা ঘুরে দেখেন এবং ঈদে বাড়ি ফেরা লোকজনের সঙ্গে কথা বলে তাদের খোঁজখবর নেন। এ সময় তার সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান ও হাবিবুর রশিদ হাবিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় সড়ক, রেল ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রী বলেন, ‘পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সদরঘাট থেকে নদীপথে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঈদযাত্রায় যাত্রীদের সেবা দিতে হবে। আমরা চাই তারা যেন নির্বিঘেœ ও স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে পারেন। সেই লক্ষ্যেই সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এবারের ঈদযাত্রায় নিরাপত্তা বিঘেœর মতো বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। তারপরও সতর্ক থাকব, যাতে যাত্রীসেবার মান বজায় থাকে।’ পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী ঘাট শ্রমিকদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন। এ সময় তিনি তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘শ্রমিকদের কারণেই আমাদের বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আপনারা ঈদযাত্রায় ঘাট ব্যবহার করা যাত্রীদের সহযোগিতা করবেন। মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণ করলে যাত্রীরাও আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। কোনো যাত্রী যেন হয়রানির শিকার না হন।’
নৌপথের যাত্রীদের জন্য ট্রলি সুবিধা ॥ এদিকে নৌপথের যাত্রীদের জন্য সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে বিনা মূল্যে কুলি (পোর্টার) সেবা, ট্রলি ও হুইলচেয়ারসহ নানা সুবিধা চালু করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। সোমবার এই সেবা কার্যক্রম উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর বন্দর পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, নতুন সরকারের সময়ে যাত্রীদের কল্যাণে আরও উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগে সদরঘাটের ওপরের অংশ কিছুটা পরিচ্ছন্ন থাকলেও ভেতরের অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। এবার পুরো এলাকায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে এখন ঘাট অনেক বেশি সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন।’
বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা জানান, ঈদযাত্রীদের সুবিধার্থে ঈদের আগে পাঁচ দিন এবং পরে পাঁচ দিন করে মোট ১০ দিনের জন্য বিনা মূল্যে কুলি সেবা দেওয়া হবে। এসব কুলিকে বিআইডব্লিউটিএ নিজস্বভাবে মজুরি দিয়ে নিয়োগ দিয়েছে, যাতে যাত্রীরা কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন। এছাড়া, যাত্রীদের মালামাল বহনের সুবিধার্থে ১০০টি ট্রলি রাখা হয়েছে, যেগুলো বিমানবন্দর থেকে আনা হয়েছে। যাত্রীরা চাইলে নিজেরাই এসব ট্রলি ব্যবহার করতে পারবেন। সেই সঙ্গে অসুস্থ, অক্ষম ও বয়স্ক যাত্রীদের জন্য হুইলচেয়ারের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে সীমিত সংখ্যক হুইলচেয়ার ছিল, এবার সদরঘাটের ২০টি গেট এলাকায় মোট ৪০টি হুইলচেয়ার রাখা হয়েছে। এসব ব্যবহারে সহায়তা করবেন ক্যাডেট সদস্যরা।
নতুন দু’টি ঘাটে আজ থেকে চলবে লঞ্চ ॥ ঢাকা থেকে ঈদযাত্রায় নৌপথের যাত্রীদের চাপ নিয়ন্ত্রণে ঢাকার বসিলা ও নারায়ণগঞ্জের শিমুলিয়ায় বিকল্প লঞ্চ ঘাট চালু করা হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার সকাল বিকল্প এই দুই ঘাট লঞ্চ সার্ভিন চালু হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা নদী বন্দর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের বিকল্প হিসেবে রাজধানীর মোহাম্মাদপুরের বসিলা লঞ্চ ঘাট চালু করা হয়েছে। এই ঘাট থেকে ঢাকা-হাকিমুদ্দিন, ঢাকা-ইলিশা, ঢাকা-চাঁদপুর, ঢাকা-শরীয়তপুর ও ঢাকা-গলাচিপা রুটের ছয়টি লঞ্চ ছেড়ে যাবে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর লঞ্চ টার্মিনালের বিকল্প হিসেবে কাঞ্চন ব্রীজ সংলগ্ন শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাট চালু করা হয়েছে। এই ঘাট থেকে চাঁদপুর ও বরিশালগামী তিনটি লঞ্চ ছেড়ে যাবে। 
বসিলা ঘাট থেকে চলবে ৬টি লঞ্চ। এগুলো হলো-বসিলা-সদরঘাট-হাকিমুদ্দিন রুটের যাত্রীদের জন্য এমভি টিপু লঞ্চ; বসিলা-সদরঘাট-ইলিশা রুটের যাত্রীদের জন্য এমভি টিপু-৬ লঞ্চ; ভোলার ইলিশা ঘাটের উদ্দেশে রুটের যাত্রীদের জন্য দ্বিতীয় লঞ্চ এমভি ইয়াদ-১; বসিলা-সদরঘাট-চাঁদপুর-ঈদগা ফেরিঘাট-শরীয়তপুর রুটের যাত্রীদের জন্য এমভি ইমাম হাসান-৫ লঞ্চ; বসিলা-সদরঘাট-চাঁদপুর রুটের যাত্রীদের জন্য এমভি ঈগল-৪; বসিলা-সদরঘাট-ফতুল্লা-গলাচিপা রুটের যাত্রীদের জন্য এমভি এমভি বোগদাদীয়া-১২ অথবা এমভি শরিয়তপুর-৩ লঞ্চটি চলাচল করবে। শিমুলিয়া ঘাট থেকে চাঁদপুর ও বরিশাল রুটে চলবে তিনটি লঞ্চ। এগুলো হলা-এমভি সমতা অ্যান্ড সমৃদ্ধি এক্সপ্রেস লঞ্চটি শিমুলিয়া-ডেমরা-কাঁচপুর-নারায়ণগঞ্জ-চাঁদপুর রুটে চলাচল করবে; শিমুলিয়া-ডেমরা-কাঁচপুর-নারায়ণগঞ্জ-চাঁদপুর রুটে চলবে এমভি সমতা সমৃদ্ধি-১ লঞ্চটি; শিমুলিয়া-নারায়ণগঞ্জ-চাঁদপুর-বরিশাল রুটের যাত্রীদের জন্য এমভি রাজারহাট-বি লঞ্চটি চলাচল করবে।]
সড়ক পথে যানজটের ভোগান্তি ॥ ঈদ উপলক্ষে রাজধানী ছাড়ছে ঘরমুখো মানুষ। তাই সোমবার সড়কপথে বেড়েছে যানবাহনের চাপ। ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথেই যানজটের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। বিশেষ ঢাকা প্রবেশমুখের বেশির ভাগ সড়ক অবৈধ দোকান-বাজার ও গাড়ি পার্কিংয়ে দখল থাকায় ঈদের সময় এই দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয় রাজধানীর গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী প্রবেশমুখে। ঈদের সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-খুলনা গুরুত্বপূর্ণ এই চারটি মহাসড়কের যানবাহন ঢাকা থেকে বের হওয়ার সময় গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া, যাত্রাবাড়ী, দোলাইপাড়, পোস্তগোলা, বাবুবাজার ব্রিজ ও ডেমরা সেতু ব্যবহার করে থাকে।
কিন্তু এ সব এলাকার সড়কগুলো অর্ধেকের বেশি দখল থাকে অবৈধ দোকান-বাজার ও গাড়ি পার্কিংয়ে। কারণে ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথে যানজটে আটকে চরম ভোগান্তি পোহাতে ঘরমুখো মানুষদের। এছাড়া রাজধানীর শাহবাগ, ধানমন্ডি, পল্টন, ফার্মগেট, মিরপুর রোড, শ্যামলী, উত্তরা, মহাখালী, বনানী, রামপুরা, বাড্ডা ও মালিবাগ এলাকায় ট্রাফিক সিগন্যালগুলো দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকতে দেখা গেছে যানবাহনকে। তবে রাজধানীর বাইরে নবীনগর-চন্দ্রা ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের কয়েকটি পয়েন্টে যানজটে আটকে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। সাভারে কয়েক পয়েন্টে যাবাহনের জটলা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
মনির হোসেন নামের সিরাজগঞ্জগামী এক মুঠোফোনে জানান, সোমবার অফিস শেষ করে বাড়ি যাচ্ছি। গাবতলী বাস টার্মিনালে থেকে বাসে উঠেছি। ভাড়াও সহনীয়। বলা চলে স্বস্তির যাত্রা। তবে গাবতলী থেকে চন্দ্রা আসার পথে পথের কয়েকটি পয়েন্টে যানজট পেয়েছি। বাকি পথ ছিল পরিষ্কার।
প্রতি ট্রেন ছেড়ে গেছে নির্ধারিত সময়ে ॥ সোমবার বিকেল থেকে রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ঘরমুখো মানুষের প্রচ- ভিড় দেখা গেছে। প্রতিটি ট্রেন নির্ধারিত ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। তবে যাত্রীদের চাপ বেশি থাকায় অনেক যাত্রী নিদিষ্ট কোচে উঠতে পারেনি। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ট্রেনের আগাম টিকিট কেটে রাখা যাত্রীদের ঈদযাত্রা শুরু হয় গত শুক্রবার থেকে। সে হিসেবে সোমবার ট্রেনের অগ্রিম টিকিটধারীরা চতুর্থ দিনের ঈদযাত্রায় গ্রামের যেতে দেখা গেছে। তবে গত তিনদিন ঘরমুখো মানুষের ট্রেনযাত্রায় তেমন ভিড় দেখা যায়নি। বাড়তি ভিড় না থাকায় অনেকটা স্বস্তি ও আনন্দদায়ক পরিবেশে বাড়ি ফিরেছেন তারা। 
কিন্তু সোমবার সেই চিত্র কিছুটা বদলাতে গেছে। গন্তব্যে ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা ট্রেনগুলোর পাশাপাশি সবগুলো প্লাটফর্মে যাত্রীদের ভিড় বেশি দেখা গেছে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে সোমবার রাত ৮টায় লালমনি, রংপুর, কুড়িগ্রাম, বুড়িমারীর উদ্দেশে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। যাত্রীদের চাপে অতিরিক্ত বগি দেওয়া সত্ত্বেও অনেকে টিকিট নিয়ে নিজ বগিতে চড়তে পারেননি। গেটে ঝুলে যেতে দেখা গেছে যাত্রীদের। 
নির্ধারিত সময়ে ট্রেন ছেড়ে দেওয়ায় অনেকে টিকিট কেটেও ট্রেনে চড়তে পারেননি। জসিম, ছাইদুল ও রোকন তিন বন্ধু এই ট্রেনে অগ্রিম টিকিট কেটেছিলেন। তারা তিনজনই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। অফিসের কাজ শেষ করে বের হতে দেরি হওয়ায় তারা ৮টা ১০ মিনিটে স্টেশনে এসে পৌঁছান।  ট্রেন মিস করায় অভিযোগ করে তারা বলেন, সবসময় দেখেছি নির্ধারিত সময়ের ১০-১৫ মিনিট পরে ট্রেন ছেড়ে যায়। আজ একটুও দেরি করল না। আমরা ৩ জনই অগ্রিম টিকিট কেটেছিলাম, অল্প সময়ের জন্য ট্রেন মিস করলাম। এখন বাসে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। খরচও দ্বিগুণ হবে, আর কষ্টও বেশি।

প্যানেল হু

×