ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৭ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে যশোর

কায়েমকোলা গ্রামের ঐতিহ্য ‘জমাদার মসজিদ’

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ০০:৪১, ১৭ মার্চ ২০২৬

কায়েমকোলা গ্রামের ঐতিহ্য ‘জমাদার মসজিদ’

যশোরের ঝিকরগাছার কায়েমকোলা গ্রামে ঐতিহ্যবাহী ‘জমাদার মসজিদ’ বা ‘বড় মসজিদ’

যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার বর্ধিষ্ণু গ্রাম ‘কায়েমকোলা’ নামটি হয়তো অনেকের কাছে অচেনা, কিন্তু ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক থেকে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যশোর শহরের ধর্মতলা থেকে কাশীপুর সীমান্তগামী সড়ক ধরে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এগোলেই পৌঁছে যাওয়া যায় এই গ্রামে। আবার ঝিকরগাছা শহর থেকে চৌগাছা উপজেলা শহরের পথে মোহাম্মদপুর মোড় থেকে তিন কিলোমিটার পূর্বে গেলেই মিলবে কায়েমকোলার দেখা। যোগাযোগের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা এ গ্রামটি অতীতে যেমন সমৃদ্ধ ছিল, আজও তেমনি প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর।
একসময় গ্রামের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে যেত খরস্রোতা একটি নদী, যাকে অনেকে ‘গাঙ’ বলেই চিনতেন। সেই নদী আজ মৃতপ্রায় সময়ের প্রবাহে হারিয়ে গেছে তার স্রোত, কিন্তু রয়ে গেছে স্মৃতি। কায়েমকোলার পশ্চিম পাশের গ্রাম মাগুরা, যার একটি অংশের নাম ‘অমৃতবাজার’ সেখানেই জন্ম নিয়েছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক শিশিরকুমার ঘোষ। তিনি ছিলেন বিখ্যাত পত্রিকা ‘অমৃতবাজার’ এর সম্পাদক। ফলে এ অঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যেও সমৃদ্ধ।
বর্তমানে কায়েমকোলা একটি বৃহৎ জনপদ। কয়েক হাজার মানুষের বসবাস এখানে। শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি গ্রামটির সামাজিক অগ্রগতির সাক্ষ্য বহন করে। এখানে রয়েছে একটি হাইস্কুল, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কয়েকটি ফোরকানিয়া মাদ্রাসা এবং একটি বড় বাজার। গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্বাভাবিক ছন্দের পাশাপাশি আধুনিকতার ছোঁয়াও স্পষ্ট।
তবে কায়েমকোলার প্রকৃত ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে যে স্থাপনাটি, সেটি হলো স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘জমাদার মসজিদ’ বা ‘বড় মসজিদ’। অবস্থানগতভাবে এটি যশোর-কাশীপুর ও ঝিকরগাছা-চৌগাছা সড়কের সংযোগস্থলের কাছেই অবস্থিত। ৫২ দশমিক ৫ ফুট লম্বা ও ২১ ফুট প্রস্থের এ মসজিদের দেয়াল ৪ দশমিক ৫ ফুট পুরু, যা এর প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর দৃঢ়তার প্রমাণ দেয়। পূর্ব পাশে রয়েছে তিনটি প্রবেশপথ এবং পশ্চিম দেয়ালে একটি মিহরাব। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটির কোনো মিনার নেই, যা একে সুলতানি ও মুঘল আমলের গ্রামীণ মসজিদ স্থাপত্যের সঙ্গে তুলনীয় করে তোলে।
মসজিদটি ঠিক কবে নির্মিত হয়েছিল, তার নির্ভরযোগ্য দলিল পাওয়া যায়নি। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে, বাংলার নবাব আলীবর্দী খান-এর শাসনামলে ‘আগা বাকর’ নামে এক জমাদার এটি নির্মাণ করেন। এ কারণেই মসজিদটি ‘জমাদার মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়। এই তথ্য অনুযায়ী, এর নির্মাণকাল আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়। তবে কিছু ইতিহাস অনুরাগী ধারণা করেন, এর স্থাপত্যরীতি সুলতানি আমলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে মসজিদের দেয়ালে লবণাক্ততার ক্ষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, সেই সংস্কারের ফলে স্থাপনাটির কিছু অংশ আগের আদল হারিয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহলের অভিমত। ইতিহাস-ঐতিহ্যের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন সচেতন মহল।
কায়েমকোলার জমাদার মসজিদ সময়ের সাক্ষ্যবাহী এক ঐতিহাসিক দলিল। সঠিক সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এ মসজিদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অতীতের সমৃদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরতে পারে। ঐতিহ্য রক্ষায় স্থানীয় সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করলেই টিকে থাকবে এই মসজিদ।

প্যানেল হু

×