প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া খালখননের মাধ্যমে দেশব্যাপী খালখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাইরের দেশগুলো যদি সুন্দর হয়, তবে আমাদের দেশ কেন সুন্দর হবে না। সে দেশগুলো তো জিন এসে সুন্দর করে দেয় নাই, যা করেছে মানুষই করেছে। ওরা পারলে আমরা কেন পারব না। আমরাও ইনশাআল্লাহ পারব। দেশের মানুষই সুন্দর আগামী গড়ে তুলবে, দরকার শুধু পরিকল্পণা। তিনি বলেন, এদেশের মানুষই একাত্তর সালে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল। আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্র-জনতা এ দেশ থেকে স্বৈরাচার বিদায় করেছে। এই দেশের মানুষ শহীদ জিয়ার সময় খাল খননের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুন করে বিদেশে খাদ্য রফতানি করেছে। তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন রকম কথা-বার্তা বলে যারা দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সজাগ থাকতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা এমন একটি দল করি, যেই দলের কাজ হচ্ছে সাধারণ মানুষের উপকারে আসে এমন কাজ। যেই কাজ করলে সাধারণ মানুষ খুশি হয়। আমরা সেই কাজ করি। আজ আনুষ্ঠানিকভাবে সাহাপাড়া খাল খনন শুরু হলো। খালটির ১২ কিলোমিটার খনন শেষ হলে ৩১ হাজার কৃষক উপকৃত হবেন। এই খাল থেকে পানি নিয়ে কৃষকরা ১২০০ হেক্টর জমিতে সেচ দিতে পারবেন। সুবিধার আওতায় আসবে সাড়ে ৩ লাখ মানুষ। সবচেয়ে বড় বিষয় এই এলাকার কৃষকরা যে ফসল উৎপাদন করছে, তার থেকে ৬০ হাজার মেট্রিক টন বেশি ফসল উৎপাদন করতে পারবেন। দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুর সাহাপাড়ার খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন শেষে সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এর আগে সোমবার সকাল থেকেই রাস্তার দুই পাশে মানুষের ভিড় চোখে পড়ার মতো। শিশু-কিশোর, গৃহবধূ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবাই হাত নেড়ে স্বাগত জানাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে। আজ এই গ্রামটি শুধু জনসমুদ্রের কারণে নয়, ইতিহাসের এক দীর্ঘসূত্রের পুনরাবৃত্তির কারণে আলোচনারও কেন্দ্রবিন্দু। প্রায় পাঁচ দশক আগে ১৯৭৭ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল হাতে নিয়ে এই সাহাপাড়া খাল খননের কাজ শুরু করেছিলেন। জরিনা বেগম নামে ৭৫ বছরের এক বৃদ্ধা স্মৃতিচারণ করে বললেন, বাবার মতোই ছেলে খাল কাটছে। শহীদ জিয়া মানুষজনকে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল কাটার কর্মসূচিতে যোগ দিতেন। এখন তারেক রহমান সেই পথ অনুসরণ করছেন।
সোমবার দুপুরে তারেক রহমান খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। পরে খালের পাড়ে একটি নিম গাছ রোপণ করেন তিনি। ১২ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ সাহাপাড়া খাল পুনঃখননের মাধ্যমে শুরু হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি। একই সঙ্গে তিনি ভার্চুয়ালি দেশের ৫৪টি জেলার খাল খনন কার্যক্রমও উদ্বোধন করেন। এদিন সকাল ১০টার দিকে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছে নেতাকর্মীদের ফুলেল অভ্যর্থনা গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ বুলেটপ্রুফ বাসে করে তিনি সৈয়দপুর শহর অতিক্রম করে দিনাজপুরের বলরামপুর সাহাপাড়া এলাকায় রওনা হন। পথে স্থানীয় লোকজন হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান আর উৎসাহ-উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ে শহরজুড়ে।
দিনাজপুরের সাহাপাড়ার লোকজন দীর্ঘদিন ধরে খালের বেহাল দশা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। আমেনা বেগম নামের এক গৃহবধূ বলেন, খালটি পুনঃখনন হলে আমাদের জলাবদ্ধতার সমস্যা দূর হবে। শহরের পানিপ্রবাহ আগের মতো থাকবে না, বর্ষার সময়ে জলাবদ্ধতা কমবে। খালটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা পুনর্ভবা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। নদীর পানি ঠাকুরগাঁও হয়ে দিনাজপুরে প্রবেশ করে, পরে মহানন্দা নদীতে গিয়ে মিশে যায়। খাল পুনঃখনন হলে স্থানীয় কৃষিজমির সেচ সুবিধা উন্নত হবে, মাছ চাষ ও হাঁস-পালনের মতো খালনির্ভর অর্থনীতি বৃদ্ধি পাবে এবং বনায়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্থানীয় শিক্ষার্থী রাশিদ রহমান বলেন, খালে পানি থাকলে মাছ চাষ করা যাবে, খালের দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণ হলে সুবজ বনায়ন হবে। এটি গ্রামকে নতুন দিক দেবে। শিউলী নামের এক নারী স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননে অংশ নিতে পেরে বললেন, আজকে আমাদের খুশির দিন। আমাদের লিডার এসেছে, আমাদের হৃদয়ের আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই উদ্যোগকে স্থানীয়রা শুধু খাল পুনঃখনন হিসেবে দেখছেন না; তারা এটিকে পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা, গ্রামীণ অর্থনীতি ও ইতিহাসের সাথে সংযোগের প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
উদ্বোধন শেষে খালপাড়েই আয়োজিত এক সমাবেশে যোগ দেন তারেক রহমান। সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আজ থেকে শুরু হলো দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি। খাল খনন করে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করাই হলো আমাদের রাজনীতি। আমরা চাই এমন পদক্ষেপ নিতে, যার মাধ্যমে সাধারণ জনগণের আয় দ্বিগুণ হবে। এটাই হচ্ছে আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য। এটাই হচ্ছে শহীদ জিয়ার রাজনীতি। এটাই হচ্ছে খালেদা জিয়ার রাজনীতি।
কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড প্রদান করা হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা নির্বাচনের আগে অনেক কথা বলেছি। আমরা বলেছি সারাদেশে ৪ কোটি পরিবারের ফামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। আমরা সারা দেশে ফ্যামিলি কার্ড দিতে শুরু করেছি। মধ্যপ্রাচ্যে অনেক মানুষ কাজ করে। তাদের বিষয়ে আমরা চিন্তা করছি। তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে একটু সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু আমারা যে সব ওয়াদা করেছি, সেগুলোর কাজ আমরা এরই মধ্যে শুরু করেছি। খাল কাটার কাজ শুরু করেছি।
মা-বোনদের ফ্যামিলি কার্ড দিতে শুরু করেছি। কৃষকদেরও কার্ড দেয়া হবে। আগামী মাস থেকে কৃষকদের কৃষক কার্ড দেয়া হবে। ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও মধ্যম কৃষকরা কার্ড পাবেন। এই কার্ড দিয়ে কৃষকরা সকল সুযোগ-সুবিধা পাবেন। শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়া ছিলেন কৃষকদের বন্ধু। আমরা কৃষকদের বন্ধু। কৃষক-কৃষানী ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকবো। তাই তাদের ভালো রাখতে চাই। বাংলাদেশের কৃষকদের শক্তিশালী ভিত্তির ওপর রাখতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রামের মানুষদের প্রধান পেশা হচ্ছে কৃষি। কৃষি যদি বাঁচে, তাহলে কৃষক বাঁচবে, তাহলেই দেশ বাঁচবে। খালগুলো খনন না হওয়ার কারণে ভরাট হয়ে গেছে। নদীও ভরাট হয়ে গেছে। বর্ষার মৌসুমের অনেক খরা হয়। পানি পাওয়া যায় না। আমরা এই বর্ষার পানিকে কাজে ব্যবহার করতে চাই। আমরা এমন ভাবে পানি ব্যবহার করতে চাই, যাতে করে সমগ্র এলাকার মানুষ উপকার পায়। আজকে খাল খনন শুরু করলাম। আগামী ৫ বছর সমগ্র দেশের ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করবো।
উজান থেকে যখন পানি আসে, তখন নদীর পাশের মানুষ ও পশুর ক্ষতির পাশাপাশি ঘরবাড়ী নষ্ট হয়। আমরা খাল খননের পর বর্ষার সময়ে অতিরিক্ত পানির ধরে রাখব। উজান থেকে নেমে আসা পানি ধরে রাখতে পারলে আমরা সবাই উপকৃত হবো। শুস্ক কিংবা বর্ষা মৌসুমে কৃষকের পানি সরবরাহ করতে পারি। কৃষির উৎপাদন বাড়াতে হবে। এত মানুষের খাবার বিদেশ থেকে আনা সম্ভব নয়। তাই কৃষকের উপরে গুরুত্ব দিতে হবে। পানিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। তিনি বলেন, দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চল কৃষক প্রধান এলাকা। কৃষির সঙ্গে জড়িত দেশের অনেক বড় কোম্পানি। আমরা সে সকল কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছি। ঈদের পর তাদের সঙ্গে বসব। উত্তরাঞ্চল থেকে কৃষিভিত্তিক কল-কারখানা গড়ে তোলার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। সেখানে কৃষকদের সন্তানরাও চাকরি পাবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের রাজনীতি হচ্ছে কৃষকের উপকার করা, মা-বোনদের স্বাবলম্বী করে তোলা, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভালো করে গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তিনি বলেন, আমি কিন্তু একা এসব কাজ করতে পারবো না। এ জন্য দেশের জনগণকে সঙ্গে লাগবে। আপনাদের সমর্থন ছাড়া আমরা এই কাজগুলো করতে পারব না। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই হচ্ছে সকল ক্ষমতার উৎস। এই খাল খনন উদ্বোধনের মাধমে আজ থেকে দেশ গড়ার কর্মসূচির কাজ শুরু করলাম ইনশাআল্লাহ।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও দিনাজপুর জেলা বিএনপির উদ্যোগে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। দিনাজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মোফাজ্জল হোসেন দুলালের সভাপতিত্বে জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার আহমেদ কচি সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, সমাজকল্যাণ ও নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, দিনাজপুর-৪ আসনের এমপি ও জাতীয় সংসদের হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া, দিনাজপুর-১ আসনের এমপি মনজুরুল ইসলাম, দিনাজপুর-২ আসনের এমপি সাদিক রিয়াজ চৌধুরী পিনাক, দিনাজপুর-৩ আসনের এমপি সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ। সমাবেশে স্থানীয় নেতা-কর্মী, প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিনাজপুর জেলা শহরের ফরিদপুর কবরস্থানে তার নানা-নানি, খালার কবর জিয়ারত করেন। বিকালে তিনি গোর-এ শহীদ ময়দানে জেলা বিএনপি ও প্রশাসনের আয়োজিত ইফতার মাহফিল ও সুধী সমাবেশে যোগদান করেন। ইফতারের পর মাগরিবের নামাজ আদায় শেষে তিনি দিনাজপুর ত্যাগ করেন।
প্যানেল হু








