ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

বরাদ্দ বাড়ল প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা

লোডশেডিংমুক্ত দেশ গড়তে মহাপরিকল্পনা

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২৩:০৪, ১ জুন ২০২৩

লোডশেডিংমুক্ত দেশ গড়তে মহাপরিকল্পনা

যখন ডলার সংকটে টালমাটাল অবস্থা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের তখন আসন্ন বাজেট নতুন আশা বয়ে আনল

যখন ডলার সংকটে টালমাটাল অবস্থা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের তখন আসন্ন বাজেট নতুন আশা বয়ে আনল। গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হলো এ খাতে। লোডশেডিংমুক্ত দেশ গড়তেই এ উদ্যোগ বলে জানানো হয় বাজেট উপস্থাপনকালে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এর জন্য গত অর্থবছরের ২৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হলো ৩৪ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের  চেয়ে ৮ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা বেশি।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেটে এসব তথ্য জানা গেছে। ২০০৯ সালের ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট থেকে বর্তমানে ২৬ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে জানিয়ে এ সময় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ধারাবাহিকভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভবিষ্যতে বর্ধিত বিদ্যুৎ চাহিদার বিষয় বিবেচনায় রেখে আমরা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির ব্যবহার বহুমুখীকরণের জন্য গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি কয়লা, তরল জ্বালানি, ডুয়েল-ফুয়েল, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করব বলে আমরা অঙ্গীকার করেছিলাম। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ সক্ষমতা সম্প্রসারণের ফলে এরই মধ্যে দেশের শতভাগ জনগোষ্ঠী বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। তিনি আরও বলেন, পটুয়াখালীর পায়রা, কক্সবাজারের মহেশখালী ও মাতারবাড়ি এলাকায় নির্মিত পাওয়ার হাবগুলোতে মেগা-প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। রামপালে কয়লাভিত্তিক ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থার্মাল প্রজেক্ট (প্রথম ইউনিট) ও পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রকল্পে এরই মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে। মাতারবাড়িতে কয়লাচালিত আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ চলছে।

এসময় আরও জানানো হয়, সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে জীবাশ্ম এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক মোট ১২ হাজার ৯৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৩৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন আছে এবং ২ হাজার ৪১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ১৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি প্রক্রিয়াধীন আছে। এ ছাড়া সরকার মোট ১০ হাজার ৪৪৩  মেগাওয়াট ক্ষমতার আরও ৩৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে।
দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও উপআঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমেও বিদ্যুৎ সংগ্রহ করা হচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে প্রায় ৯ হাজার  মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে। বর্তমানে আন্তঃদেশীয় গ্রিড সংযোগের মাধ্যমে ভারত থেকে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। এ ছাড়া ভারতের ঝাড়খণ্ডে নির্মিত দুই ইউনিটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে ৭৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।

নেপালের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে নির্মিতব্য জল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে বাংলাদেশ, ভুটান এবং ভারতের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত পর্যায়ে স্বাক্ষরের অপেক্ষায় আছে। সব মিলিয়ে আমরা ২০৩০ সালে ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারব বলে আশা করছি।
এ ছাড়া, ২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ আমরা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি থেকে সংগ্রহ করতে চাই উল্লেখ করে মুস্তফা কামাল বলেন, উৎপাদিত বিদ্যুৎ জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য গত ১৪ বছরে ৬ হাজার ৬৪৪ সার্কিট কিমি সঞ্চালন লাইন স্থাপন করেছি। এর ফলে, সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ বর্তমানে ১৪ হাজার ৬৪৪ কিমিতে  উন্নীত হয়েছে। এ ছাড়া কমেছে সিস্টেম লস।
জ্বালানি খাত সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জ্বালানি তেলের মজুত ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন উদ্বোধন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে আমদানি করা জ্বালানি তেল (ডিজেল) দেশের উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় এবং সৈয়দপুরের ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ভারতের শিলিগুড়ি মার্কেটিং টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের পার্বতীপুর ডিপো পর্যন্ত পাইপলাইন স্থাপনের কাজ চলছে। এর মাধ্যমে ১০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল স্বল্প সময়ে বাংলাদেশে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।  দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিশোধনের ধারণ ক্ষমতা উন্নীত করার জন্য উদ্যোগ  নেওয়া হয়েছে। পায়রা সমুদ্র বন্দর এলাকায় একটি বৃহৎ সমন্বিত তেল শোধনাগার, স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণের সিদ্ধান্ত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি ভোলা জেলার ইলিশা গ্যাস ক্ষেত্রে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত আবিষ্কার হয়েছে। তেল ও গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হযেছে। দেশের একমাত্র  তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৪ এর মধ্যে আরও ৪৬টি কূপ খনন করা হবে। আশা করছি, এসব কূপ খনন শেষে দৈনিক অতিরিক্ত ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। সমুদ্র অঞ্চলেও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ চলমান আছে। জ্বালানির বর্ধিত চাহিদা মেটানোর জন্য তরলী করা প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি ও স্পট মার্কেট থেকে ক্রয় করা হচ্ছে। এ ছাড়া, কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। গ্যাসের পাইপলাইন বৃদ্ধির পাশাপাশি এর অপচয় রোধে প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।
কয়লা সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত ৫টি কয়লা ক্ষেত্রের মজুত করা কয়লার পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার ৮২৩ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে কেবল বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করা হয়। খনিটির বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা বার্ষিক ৮ লাখ মে. টন। দেশের কয়লা ক্ষেত্রগুলো থেকে কয়লা সংগ্রহের কারিগিরি ও অন্যান্য সম্ভাবনা যাচাইয়ের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

×