বর্তমান সময়ে কবিতার নাম করে যে ধারা আমরা দেখি, তা নিয়ে অনেকেরই ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে। একসময় কবিতা ছিল ভাবের, অনুভূতির, ছন্দ ও রূপকের এক অনবদ্য সমন্বয়। কিন্তু আজকাল অনেক কবিতা যেন সেই নান্দনিকতার বন্ধন ছিঁড়ে এক অগোছালো বক্তব্যের স্তূপে পরিণত হয়েছে। এই কবিতাগুলোতে না আছে ছন্দের শৃঙ্খলা, না আছে উপমার সৌন্দর্য, না আছে ভাবনার গভীরতা। ফলে পাঠকের কাছে সেগুলো হয়ে উঠছে অনাকর্ষণীয় এবং অশালীন।
ছন্দ ব্যবহারের ফলে অনেক সময় কবিতায় ভাব প্রকাশের পথে একটি সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার তাগিদ থেকেই গদ্য কবিতার জন্ম।
গদ্য কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি গদ্যে লেখা হলেও এতে কবিতার ছন্দ, চিত্রকল্প ও অন্যান্য অলঙ্কার ব্যবহৃত হয়, যা একে স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছে।
কবিরা স্বাধীনভাবে মনের ভাব প্রকাশ করার সুযোগ পান।
তাই বলে এপাশ ওপাশ কিছু শব্দ ব্যবহার করে এক পাতা লিখে ফেললেই কি গদ্য কবিতা হয় আসলেই কি তাই? এতই সহজসাধ্য বিষয় গদ্য কবিতা?
বাংলা কবিতা সেই যে চর্যাপদ থেকে যার যাত্রা শুরু তা এখন ঠেকেছে অতি আধুনিকতায়। আর এ আধুনিক কবিতার মূল বিবর্তন এসে স্থিতি লাভ করেছে গদ্যছন্দে। তাই বাংলা কবিতায় গদ্য কবিতা আধুনিক সংস্করণ।
অনেকেই এদিক থেকে ভেবে বসেন, গদ্য কবিতায় কোনো ছন্দই নেই। এটি অবশ্যই ভুল ভাবনা; ছন্দ ব্যতীত কবিতা হতে পারে না। গদ্য কবিতার প্রতি পঙক্তি বা লাইনের অন্তরালে এক ধরনের ছন্দ নিহিত রয়েছে। কবি লেখার সময় কিংবা কবিতার ঋদ্ধ পাঠক কবিতা পাঠের সময় এ অন্তর্নিহিত ছন্দ অনুভব করেন।
বর্তমান অনেকেই স্বাধীন ভাব প্রকাশের নামে এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে ভাষার স্বাধীনতা ভাবের সূক্ষ্মতা কিংবা কবিতাকে শিল্প শিল্প হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায় না। অনেক কবি মনে করেন সবকিছু খুলে বলা যেমন সরাসরি যৌনালাপ বর্ণনা করা মানে সাহসী কবিতা যেখানে নেই কোন নান্দনিক উপমা। কিন্তু আসলে প্রশ্ন হল শিল্পের মূল সত্তা হলো পরোক্ষতায়, সংযমে, ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার ক্ষমতা।
রবীন্দ্রনাথ কাজী নজরুল ইসলাম জীবনানন্দ দাশ সবাই তাদের কবিতায় গভীর চিন্তা রূপক প্রতীক আবেগের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।
তাদের কবিতা পড়লে পাঠকের মনে প্রশ্ন আসে, ভাবনা জন্মায়। কিন্তু আজকের কবিতা যেন শুধু লেখক এর আত্মদর্শনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে কবিতায় থাকে খোলামেলা নারীর দৈহিক বর্ণনা, যৌনতা, কিংবা অযৌক্তিক বাক্য বিন্যাস, নেই কোন অন্তর্নিহিত ভাব বা দার্শনিক গভীরতা।
এই উলঙ্গ কবিতার ধারা সাহিত্য কে যেন বিভ্রান্ত করছে তেমনি পাঠকের এক ধরনের অনিহা তৈরি করছে।
মনে করুন, আপনি হাঁটছেন। এই যে হাঁটছেন, এর মাঝে এক ধরনের ছন্দ রয়েছে। আপনি ক্লান্ত হয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর পূর্বেই বসে পড়লেন। আপনার হাঁটার ছন্দে পতন ঘটলো। গদ্য কবিতার ধর্ম ঠিক এরূপ। গদ্যের সুরে পাঠক কবিতা পড়ে যাবেন, মুগ্ধ হবেন। এর মাঝে পাঠক ক্লান্ত হবেন না। পাঠক কবিতা পাঠ করতে গিয়ে যদি ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তার মাঝে যদি বিতৃষ্ণা আসে, তবে বুঝতে হবে কবিতার ছন্দপতন ঘটেছে।
প্রাচীনকালের কবিতার বিষয়বস্তু ছিল মূলত ধর্মীয়, সমাজ সংস্কৃতি ও প্রকৃতি নিয়ে। এতে নির্দিষ্ট ছন্দ, উপমা চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবিতা অলংকরণ করা হতো। বাংলা কবিতার আদিযুগের নিদর্শন চর্যাপদের কবিতাগুলো আধ্যাত্মিক উপমা সমন্বিত।
আধুনিক কবিতায় ধর্মীয় ও দেবদেবীর বিষয়বস্তুর পরিবর্তে মানবতাবাদ, মানব মনস্তত্ত্ব এবং মানুষের জীবন ও বাস্তবতাকে কবিতার প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে।
একটি লেখা তখনই কবিতায় পরিণত হয় যখন তা নির্দিষ্ট কিছু উপাদানের মাধ্যমে আবেগ, কল্পনা ও চিন্তাকে আকর্ষণীয় ও শৈল্পিক রূপে প্রকাশ করে। এর জন্য প্রয়োজন ছন্দ, শব্দচয়ন, এবং একটি নির্দিষ্ট বিন্যাস, যেমন—গদ্যের তুলনায় ভিন্নধর্মী পঙক্তিবিন্যাস, যা পাঠককে শব্দের গভীর অর্থ ও অনুভূতি বোঝাতে সাহায্য করে।
কবিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল উপমা
কবিতার উপমা বলতে বুঝায় দুটি বস্তুর মধ্যে রূপ, গুণ অবস্থার সাদৃশ্য রেখে উপস্থাপন করা।
উপমা হলো কবিতার শিল্প। আভাসই তার আভরণ। তাই কবিতা যা বলে তার চেয়ে যা বলতে চেয়ে বলেনি বা বলেই না তারই শিল্পগুরুত্ব অতুলনীয়।
উপমা যত বেশি পাকাপোক্ত হবে কবিতার ভাব অর্থ ততো বেশি উহ্য থাকবে প্রত্যেকটা শব্দ প্রত্যেকটা লাইন পাঠককে ভাবাবে শেষে পাঠক একটি মেসেজ অনুভব করবে যেটা পাঠককে তৃপ্তি দিবে।
উপমা কখনো ইঙ্গিতকে অধিকতর ইঙ্গিতবহ করে তোলে। তাতে কবিতার দেহে তৈরি হয় লুকোচুরি খেলা। কবিতা পড়ার সাথে সাথে পাঠকের মনে ইমেজ তৈরি হয়। ইন্দ্রীয় চেতনার দৃষ্টি, শ্রম্নতি, স্পর্শ, ঘ্রাণ, স্বাদ ইত্যাদির পাঠক অনুভব করে। ইমেজ বা চিত্রকল্প কবিতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উপাদেয় উপাদান বটে, কিন্তু তা কোনো অর্থেই কবিতার বহিরঙের বিষয় নয়। ইমেজ হচ্ছে কবিতার অন্তর্গত বিষয়ক। উপমা একটি কবিতার গুন ও সৌন্দর্য শতগুণে বাড়িয়ে দেয়। তবে তা যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায়। উপমাই বাঁচিয়ে রাখে কবিতার প্রাণ। উপমাহীন কবিতা অনেকটাই ইটের খোয়া বিছানো অর্ধনির্মিত পথে হাঁটার মতোই। উপমাহীন কবিতাগুলো হয়ে উঠে প্রচারপত্রের মতো শিল্প না হয়ে অপুষ্প উদ্ভিদের মত বেড়ে ওঠে।
বর্তমান আধুনিক কবিতার নামে চলছে শুধু ছলাকলা বেশিরভাগ কবিতার মধ্যে কোন উপমা নাই ছন্দ বিন্যাস নেই কবিতা পড়তে গেলে অনিহা আসে। কবিতার মধ্যে সবকিছু খোলামেলা বর্ণনা করে গেছেন কবিতার মধ্যে ভাববার কোনো বিষয় নেই আমার কাছে এক ধরনের উলঙ্গ কবিতা মনে হয়।
তবে সব আধুনিক কবিতাকে একই দোষে দোষারোপ করা যাবে না। কিছু কবি এখনো ভাষার নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধান করেছে। কবিতার মূল সৌন্দর্য নতুন ছন্দের খোঁজ করছেন। কবিতা শুধু নিজের অনুভূতির নগ্ন প্রকাশ নয় বরং পাঠকের মনে নতুন ভাবনা ও আলো জ্বালানোর মাধ্যম কবিতার ছন্দ থাকতেও পারে নাও থাকতে পারে কিন্তু থাকতে হবে রুচি গভীরতা ও সৌন্দর্য নইলে তা কবিতা নয় কেবল শব্দের উলঙ্গ প্রদর্শনী।
প্যানেল/মো.








