মিরা তিতলির কলেজ জীবনের বান্ধবী। একসঙ্গে ক্লাস করেছে, একসঙ্গে ক্যান্টিনে বসে স্বপ্ন বুনেছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে হাসাহাসি করেছে। দশ বছর কেটে গেছে এই দীর্ঘ সময়ে জীবনের চেহারা যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে তাদের নিজেদের ভেতরকার মানুষটাও।
আজ হঠাৎ করেই মিরা শহরে এসেছে। ফেসবুকের মেসেঞ্জারে কথাবার্তা হয়েছে কয়েকদিন ধরে। কথার ফাঁকে পুরোনো স্মৃতি, কলেজের দিন, সেসব ফেলে আসা দুঃখ-হাসি সবকিছু মিলেমিশে একটা দেখা করার আকুলতা তৈরি হয়েছিল। ঠিক হয়, নদীর ধারের পার্কে দেখা করবে তারা। নির্ধারিত সময়ে মিরা পার্কে এসে পৌঁছায়। বসে বসে অপেক্ষা করে। তার চোখে বিরক্তি নেই, বরং একধরনের আত্মবিশ্বাসী স্থিরতা।
মোবাইলটা বারবার হাতে নিচ্ছে, সেলফি তুলছে, আয়নায় নিজের চুল ঠিক করছে। তিতলির আসতে একটু দেরি হয়। দেরির কারণ চার বছরের দুরন্ত এক বাচ্চা তিতির। তিতিরকে ভাত খাওয়াতে বসলে যেন সময় দাঁড়িয়ে যায়। এক গ্রাস খাওয়াতে গেলে সে দৌড়ায়, আরেক গ্রাসে খেলনা নিয়ে বসে। তিতলির মাথার ভেতর তখন ঘড়ির কাঁটার শব্দ বাজে। কিন্তু তিতিরকে রেখে বের হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তিতলি জানে এই বাচ্চাটার দুনিয়া এখনো তার মা। তিতলি চাকরি করে। প্রতিদিন ভোরে উঠে সাতটার মধ্যে তিতিরকে ঘুম থেকে তুলে ভাত খাওয়ায়, ব্যাগ গোছায়, তারপর নিজের কাজের প্রস্তুতি। আজ অফিস বন্ধ, তাই সে একটু স্বস্তি নিয়ে বেরুতে পেরেছে। সব কাজ শেষ করে রিকশায় চেপে সোজা পার্কের দিকে রওনা হয়। দশ বছর পর দেখা। তিতলি মিরাকে দেখেই থমকে যায়। চকচকে, ঝকঝকে, সাজানো একদম কলেজ জীবনের মতোই। সময় যেন ওকে ছুঁতেই পারেনি। তিতলি বিস্ময়ে বলে, Í“তুই তো একটুও বদলাস নাই! একদম আগের মতনৃ কি সুন্দর লাগছে তোকে !”
মিরার ঠোঁটে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি। সে জানে, এই প্রশংসার ভেতরে বিস্ময়ের সঙ্গে একটা তুলনাও লুকিয়ে আছে। ‘আরে কি যে বলিস না,’ সে হেসে বলে, ‘এগুলো কিছুই না।’
মিরাকে সত্যিই পুতুলের মতো লাগছিল। আধুনিক পোশাক, পরিমিত মেকআপ, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি। যেন নিজের শরীর, নিজের উপস্থিতি সবকিছুর ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। হাঁটতে হাঁটতে তারা চায়ের কথা তোলে। দুজনেরই চা খুব প্রিয়। ‘চল, ভালো চা খাই,’ মিরা বলে, ‘শহরে এখন ভালো চা কোথায় পাওয়া যায়?’ তিতলি তাকে নিয়ে যায় একটা দোকানে।
‘এখানে গরুর দুধের চা খুব ভালো,’ সে নিশ্চিত গলায় বলে। মিরা নাক কুঁচকে বলে, ‘না না, আমি গরুর দুধের চা খাই না। গুঁড়া দুধের চা খেতে হবে।’
তিতলি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তার কাছে এই পছন্দটা অদ্ভুত লাগে। তবু কিছু বলে না। তারা আবার হাঁটা শুরু করে। অবশেষে একটা দোকান পাওয়া যায়। তারা বসে। চা আসার পর কথাবার্তা ধীরে ধীরে জীবনের দিকে মোড় নেয়। মিরা জানায়, সে চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে। এখন দুই বাচ্চার দেখাশোনা করছে। তিতলি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘চাকরি ছেড়ে দিলি? কেন? কি সমস্যা হলো ?’
মিরার গলাটা এবার একটু ভারী হয়। সে বলে, তার দুই বাচ্চা এখন স্কুলে যায়। স্কুলে আনা-নেওয়ার মতো কেউ নেই বাসায়। শাশুড়ির হার্টের অপারেশন হয়েছে ১১ ঘণ্টার দীর্ঘ অপারেশন। শরীরে আর সেই শক্তি নেই। শ্বশুর ডিমেনশিয়ায় ভুগতেন সব ভুলে যেতেন। মাস কয়েক আগে মারা গেছেন। ‘হাজব্যান্ড বলেছিল, চাকরি করলে সে সাপোর্ট দেবে,’
মিরা শান্ত গলায় বলে, ‘কিন্তু বাস্তবে সাপোর্টটা কিভাবে দেবে? নিজের চাকরি রেখে কি সে বাচ্চাদের স্কুলে আনবে ? ভবিষ্যৎটা তো ওদেরই নষ্ট হতো।’
সব ভেবেচিন্তেই সে চাকরি ছেড়েছে। তিতলি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর হঠাৎ প্রশ্ন করে, ‘কিন্তু আধা ঘণ্টার মধ্যে তুই দুই বাচ্চাকে খাইয়ে, রেডি করে, নিজে এত সাজগোজ করে এখানে এলি কিভাবে?’ মিরা হেসে ফেলে। ‘খুব সোজা,’ সে বলে, ‘দুইজনের হাতে দুইটা ব্রেড দিয়ে বেরিয়ে এসেছি।’
তিতলি অবাক হয়ে তাকায়। ‘সকালবেলা বাচ্চাদের খাওয়ানোর এত প্যারা আমি নেই না,’ মিরা নির্বিকারভাবে বলে, ‘আমি নিজেকে ভালোবাসি। আমার যখন যেখানে যেতে ইচ্ছা করে যাই। বাচ্চাদের এত বেশি প্রশ্রয় দিলে শেষে ওরাই আমাদের ভুলে যায়।’ সে একটু থামে, তারপর বলে, ‘নিজের জীবনে আমি কোনো আক্ষেপ রাখতে চাই না। বাচ্চার জন্য এটা করতে পারিনি, ওটা করতে পারিনি এই আফসোস নিয়ে বাঁচতে চাই না।’
মিরা জীবনকে উপভোগ করার কথা বলে। সে বলে, জীবন একটাই, সেটাকে ভোগ করতে হয়। কিন্তু হঠাৎই সে স্বীকার করে ‘আমি কিন্তু ডিপ্রেশনের ওষুধ খাই।’ তিতলি চমকে যায়। ‘কেন?’
সে ধীরে প্রশ্ন করে। মিরা উত্তর দেয় না। চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে থাকে। তিতলি তখন বুঝতে চেষ্টা করে হয়তো এই অতিরিক্ত আত্মভোগের আড়ালে কোথাও একটা শূন্যতা আছে। হয়তো নিজের জন্য বাঁচার এই ঘোষণার ভেতরেও এক ধরনের ক্লান্তি লুকিয়ে আছে। হয়তো ‘আমি নিজেকে ভালোবাসি’ এই বাক্যটা সে নিজেকেই বারবার বোঝাতে চায়। পার্কের নদীর পানি তখন ধীরে বয়ে যায়। দুজন নারী দুজন আলাদা পথ বেছে নেওয়া মানুষ নীরবে বসে থাকে। তিতলি মনে করে, জীবন একটাই। কিন্তু সেই জীবনের অর্থ, উপভোগ আর দায়বোধ সবার কাছে এক রকম নয়।
প্যানেল/মো.








