ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৪ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

একটি আণুুবীক্ষণিক পাঠ প্রতিক্রিয়া

সুহৃদ সরকার

প্রকাশিত: ২২:২৯, ৪ জুলাই ২০২৪

একটি আণুুবীক্ষণিক পাঠ প্রতিক্রিয়া

তাপস মজুমদার

ধীরাজ ভট্টাচার্য। নির্বাক থেকে সবাক চলচ্চিত্র যুগের এক মহানায়কের নাম। প্রেম আর বিরহের মিহি সুতায় বোনা এক ধীশক্তিসম্পন্ন কথাকার ও নাটকীয় চরিত্র। টেকনাফ থানার মাথিনের কূপের নায়ক। জন্ম ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে যশোর জেলার রতœগর্ভা পাঁজিয়াতে। তাকে নিয়ে ‘জীবনীগ্রন্থ’ লিখেছেন পাঁজিয়া গ্রামের সন্তান লেখক ও প্রাবন্ধিক তাপস মজুমদার। একই গ্রামের দুই বাসিন্দা। সেহেতু আবেগজনিত উদাস থাকাটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু আবেগের মাত্রাবোধ না থাকলে সেই জীবনী যথোপযুক্ত হয়ে ওঠে না। হয়ে যায় স্তুতি। সে ক্ষেত্রে তাপস মজুমদার আবেগজনিত পরিমিতি বোধ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। মেঘের আড়ালে যখন সূর্য ঢাকা পড়ে যায়, তখন একটি দমকা হাওয়া এসে সূর্যের উজ্জ্বল মুখ দেখায়। ১৯০৫ থেকে ১৯৫৯। মাত্র ৫৪ বছরের জীবন। কিন্তু কর্মময় জীবন পেয়েছিলেন চলচ্চিত্র নায়ক ও লেখক ধীরাজ ভট্টাচার্য।

যৌবনের শুরুতেই পুলিশের চাকরিতে প্রবেশ। যোগদান কলকাতাতে, তারপর চট্টগ্রাম। সেখান থেকে টেকনাফ। প্রেম আর ধীরাজ ভট্টাচার্য যেন একে অপরের পরিপূরক। মাথিনের কূপকে ঘিরে ধীরাজ-মাথিনের প্রেমের উপখ্যান। সেই বিষয় অত্যন্ত চমৎকারভাবে ধরা পড়েছে জীবনীকার তাপস মজুমদারের হাতে। না, হাতে কোনো তুলি ছিল না। কালি ও কলমের নিপুণ সুতায় তিনি বুনেছেন ধীরাজ ভট্টাচার্যের শৈল্পিক জীবনকে।
সর্বমোট ১১টি অধ্যায়ের এক অনবদ্য ‘জীবনীগ্রন্থ’। ধীরাজ ভট্টাচার্য প্রায় বিস্মৃত। এই ক্ষণজন্মা মেঘে ঢাকা তারাটিকে দীর্ঘদিন পর পরমযতেœ পাঠক সমাজের সামনে তুলে ধরেছেন। ১১টি অধ্যায়ের মধ্যে আছেÑ ধীরাজ ভট্টাচার্যের শিক্ষাজীবন, ধীরাজ ভট্টাচার্যের চলচ্চিত্রে আগমন, পুলিশ ধীরাজ ভট্টাচার্য, ধীরাজের টেকনাফ যাত্রা, মাথিনের কূপ ও ধীরাজ ভট্টাচার্য, চলচ্চিত্র অভিনেতা ধীরাজ ভট্টাচার্য, ধীরাজ ভট্টাচার্য অভিনীত কিছু সিনেমা, জন্মভূমির নাট্য সমাজ ও ধীরাজ ভট্টাচার্য, শিক্ষক ধীরাজ ভট্টাচার্য, লেখক ধীরাজ ভট্টাচার্য, ধীরাজ ভট্টাচার্যের মহাপ্রয়াণ।
ধীরাজ ভট্টাচার্যের জীবনবোধ ছিল এ রকমÑ ‘আমার জীবন নদীতে জোয়ার নেই, শুধু ভাটা। অনাদি-অনন্তকাল ধরে একঘেঁয়ে মিনমিনে জলস্রোত বয়ে চলবে লক্ষ্যহীন, উদ্দেশ্যহীন পথভোলা পথিকের মতো। বাঁকের মুখে ক্ষণিক থমকে দাঁড়াবে, আবার চলতে শুরু করবে গতানুগতিক রাস্তা ধরে। এ নদী শুকিয়ে চরা পড়ে গেলেও জোয়ার কোনোদিন আসবে না, এ বোধ হয় নিয়তির বিধান।’

নিজেকে নিয়ে মহানায়কের এই নীরব মহাক্রন্দনের এক অগ্নিময় স্রোতধারা মানেই ধীরাজ ভট্টাচার্য। তৎকালীন কুলিন সমাজের অসহ্য কৌলিন্যজনিত চিন্তা ও বোধের কারণে মগ রাজার কিশোরী কন্যা মাথিন আর ধীরাজ ভট্টাচার্যের প্রেমকে পূর্ণতায় নিয়ে যেতে দেয়নি। আর দেয়নি বলেই ধীরাজের জন্য অপেক্ষা, আর অপেক্ষার শেষে বিরহে কাতর মাথিনের আত্মবিসর্জন।

ধীরাজও অগ্নিদগ্ধ এক বিরহী পুরুষ। আমৃত্যু সেই যন্ত্রণাবোধ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে জীবনের এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে। ধীরাজ ভট্টাচার্য ভুলতে পারেননিÑ ‘অপরূপ সুন্দরী মেয়ের টানা টানা চোখ, নাক-মুখ যেন তুলি দিয়ে আঁকা মগ রাজকন্যা মাথিনকে।
চমৎকার বাঁধাই আর মুদ্রণ শিল্পের আধুনিকতম শিল্প সৌকর্যে গ্রন্থটি প্রকাশ করেছেন অনার্য পাবলিকেশন্স লি. ১১১, নয়াপল্টন (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা। ধীরাজ ভট্টাচার্যের নায়ক জীবনের একটি ছবি দিয়ে চমৎকার প্রচ্ছদ অঙ্কন করেছেন অমিত সরকার। বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ২৫০ টাকা।
বইটিতে আলোকচিত্র রয়েছে মহানায়কের জন্মভুমি পাঁজিয়ার বাড়ি ও মাথিনের প্রেমের সাক্ষী আদি অক্ষত থাকা মাথিনের কূপ। সুখপাঠ্য এই জীবনীগ্রন্থটি পাঠকপ্রিয় হয়ে পৌঁছে যাবে অনেকের কাছে। এ যেন তাপস মজুমদারের হাতে প্রেমালোকে ফোটা কনকচাপার ফুল।

×