ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ২১ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১

পুতুলের অনন্য কারিগর

প্রদীপ দত্ত

প্রকাশিত: ২২:৩০, ১৬ মে ২০২৪

পুতুলের অনন্য কারিগর

পুতুলের অনন্য কারিগর

নাচের পুতুলগুলোর কোনো কোনোটি রাজা আবার কেউবা রাণী পুতুল, রাজকন্যা, নদের চাঁদ-মহুয়া, প্রাণের লখাই- বেহুলা, চাঁদ সওদাগর নয়তো পদ্মাবতী-মনসা, আবার বাঁশী হাতে রাখাল, ঘোমটা মাথায় গাঁয়ের বধূ, নৌকার মাঝি বরযাত্রী নিয়ে চলেছে, সঙ্গে যাচ্ছে বাদ্যকরেরা। কখনো ডাকাত পড়েছে নৌকায়, সেখানে আছে ডাকাতরূপী পুতুল। আবার পুতুল দারোগা, সে আসামি বেঁধে চালান করছে সদরে।

এভাবেই জমজমাট কাহিনীর মঞ্চায়ন। মঞ্চের সাদা পর্দার আড়ালে আঙুলে সুতো জড়িয়ে নিপুণ কৌশলে টান দিয়ে চলেছে একজন মানুষ আর সেই টানেই নাচছে প্রাণহীন পুতুলগুলো। সেই সঙ্গে নাকি সুরে সংলাপ, গান আর কাহিনীর বর্ণনা। তা দেখে দর্শক হাঁসছে কাঁদছে আনন্দে হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিচ্ছে। এই পুতুলগুলি নাচছে অদৃশ্য সুতোর টানে।

তবে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলোর কেউই তেমন প্রাণহীন পুতুল নয়। এ যেন বাঙালির আটপৌরে জীবনের পাত্র-পাত্রীদের গল্প। এখানে নিত্যদিনের সুখ-দুঃখ, পরচর্চা, ধর্ম, সমাজ-সংস্কার, প্রেম-বিচ্ছেদ পরকীয়া এমনকি দেহবোধের উগ্র কিংবা প্রচ্ছন্ন প্রকাশ সবই পাঠককে স্পর্শ করে। চরিত্রগুলো নিতান্ত সাধারণ। পশ্চাদপদ গ্রাম জীবনের এই চেনা চরিত্রগুলোকে ঘিরে কাহিনী গড়িয়ে চলে।

কিন্তু মনে হয় অদৃশ্য সুতোয় কে যেন একজন নেপথ্যে বসে টান দিয়ে যাচ্ছে আর তাই প্রতিনিয়ত সবাই পুতুলের মতোই নেচে চলেছে। মাণিক কি চেতন কিংবা অবচেতন মনে এমনই এক অদৃশ্য কাউকে অনুভব করেছিলেন তাঁর গল্প-উপন্যাসের চরিত্র সৃষ্টিতে। তাই হয়তো পুতুল নাচের ইতিকথা ব্যাসের চরিত্র অনন্ত বলছে ‘পুতুল বৈ তো নই আমরা, একজন আড়ালে বসে খেলাচ্ছেন’।

‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ আর ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ এই দুটো উপন্যাস প্রায় কাছাকাছি সময়ে প্রকাশ পেয়েছিল। দুটো উপন্যাসেই বিশাল ক্যানভাসে কত বিচিত্র মানুষের চরিত্র তিনি তাঁর সংস্কারমুক্ত মন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যাতে পুরোমাত্রায় ছিল তাঁর বোধ আর বিশ^াসের প্রতিফলন।

পদ্মাপাড়ের কৈবর্ত জেলেদের দিন যাপনের চিত্র আঁকতে গিয়ে তিনি লিখছেন ‘জেলেপাড়ার ঘরে ঘরে শিশুর ক্রন্দন কোনোদিন বন্ধ হয় না। ক্ষুধাতৃষ্ণার দেবতা, হাসিকান্নার দেবতা, অন্ধকার আত্মার দেবতা ইহাদের পূজা কোনোদিন সাঙ্গ হয় না’। ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসের শুরু একান্ন বছর বয়সী হারু ঘোষের মৃত্যু দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে, যার কিনা ‘আকাশের দেবতার কটাক্ষে’ বজ্রপাতে এক জনমানবহীন জঙ্গলে অপমৃত্যু হয়।

সেখানে এই অবস্থায় তাকে আবিষ্কার করে শশী ডাক্তার, সে গাওদিয়া গ্রামেরই ছেলে। তার পরিচয়ে বলা হয়েছে ‘সে কলিকাতার কলেজে পাশ করিয়া ডাক্তার হইয়াছে’। তাই হয়তো এই চরিত্রটিকে সংস্কারমুক্ত পরোপকারী একজন মানুষ হিসেবে কাহিনীর একেবারে শেষ অবধি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু কাহিনীর শুরুতে দেখা যায় শশী ডাক্তার মৃত হারু ঘোষের লাশ জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে নৌকায় তোলার সময় মাঝি গোবর্ধনকে তা ছুঁতে নিষেধ করে। বলে- ‘দূর হতভাগা তোকে ছুঁতে নেই’।

গোবর্ধন বলে ওঠে- ‘ছুঁলাম বা কে জানছে?’ শশী ভাবে ‘গোবর্ধন ছুঁইলে শবের আর এমন কি বেশি অপমান? অপঘাতে মৃত্যু হইয়াছে ॥ মুক্তি হারুর গোবর্ধন ছুঁইলেও নাই, না ছুঁইলেও নাই’। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসের প্রথম পর্বে দেখা যায় কলেরায় মৃত ছ’সাত বছরের একটি বালকের মৃতদেহ এমনইভাবে অর্ধেক জলে আর অর্ধেক বালুচরে পড়ে ছিলো।

সেই অবস্থা থেকে ইন্দ্রনাথ মৃতদেহটিকে ডিঙ্গি নৌকায় তুলে নেয়। নৌকার অপর সাথী শ্রীকান্তের জন্মগত সংস্কার তাকে দ্বিধাগ্রস্ত করে ‘কি জাতের মড়া তুমি ছোঁবে?’ ইন্দ্রনাথ মমতামাখা কণ্ঠে বলে ‘নইলে বেচারাকে শিয়ালে ছেঁড়া-ছিঁড়ি করে খাবে আহা! কহিল, মড়ার কি জাত থাকে রে’? কিন্তু এমন সাহসী উচ্চারণ শশী ডাক্তারের মুখ থেকে বের হয়নি। তাহলে কি কিছু সংস্কার তাকে ঘিরে ছিলো সবসময়।

মৃত হারু ঘোষের মেয়ে মতি শশীকে বলছে- ‘বৌ বলে আপনি সাহেব মানুষ, ঠাকুর দেবতা মানেন না। সত্যি ছোটবাবু? শশী উত্তরে বলে না, ‘সত্যি নয় ঠাকুর- দেবতা খুব মানি।’ এখানে বউ চরিত্রটি মৃত হারু ঘোষের ছেলে হারানের স্ত্রী কুসুম। কিশোরী মতি গ্রামে যাত্রা দেখে যাত্রাদলের রাজপুত্র চরিত্রের অভিনেতা কুমুদকে ভালোবেসে ফেলে। কুমুদ ছন্নছাড়া বোহেমিয়ান স্বভাবের মানুষ।

আর পাঁচজনের মতো ছকে বাঁধা জীবন তার নয়। এদিকে কুসুম শশীকে একান্ত নিজের করে পেতে চায়। কাজের ফাঁকে আড়াল আবডালে সে শশীর সঙ্গে দেখা করে মনের কথা বলে। রহস্যময়ী এক চরিত্র কুসুম, সে বলে ‘এমনি চাঁদনি রাতে আপনার সঙ্গে কোথাও চলে যেতে সাধ হয়। আপনার কাছে দাঁড়ালে আমার শরীর এমন করে কেন ছোটবাবু?

শশী কুসুমের সান্নিধ্য এড়াতে পারে না তবুও বলে ‘শরীর! শরীর! তোমার মন নাই কুসুম?’ শশীর ক্রমাগত প্রত্যাখ্যান কিংবা নির্লিপ্ততায় কুসুম আরও প্রবলভাবে শশীকে আঁকড়ে ধরতে চায়। শশী মনে মনে ভাবে, ‘কুসুমের সংস্পর্শে সে বছরের পর বছর কাটাইয়া দিয়াছিল, একদিনও সে কি টের পাইল না কুসুম কি চায়? একটি নারীমন ভুলাইতে চাহিতেছে এটুকু বুঝিতে কি সাত বছর সময় লাগে মানুষের?’

কিন্তু এই কুসুমই একসময় রহস্যময়ী হয়ে ওঠে। কিন্তু একসময় শশী যখন জড়তা মুক্ত হয়ে কুসুমের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় তখন প্রত্যাখ্যান কুসুমের দিক থেকেই, বলে ‘মানুষ কি লোহায় গড়া যে চিরকাল সে একরকম থাকবে, বদলাবে না? বলতে বসেছি যখন কড়া করেই বলি, আজ হাত ধরে টানলেও আমি যাব না’।

কুসুমের এই প্রত্যাখ্যান কি তার জমে থাকা অভিমানের প্রকাশ নাকি নারীমনের দুর্বোধ্যতা? শশী ডাক্তারের বন্ধু, যাত্রাদলের অভিনেতা কুমুদ গাওদিয়ার গ্রাম্য কিশোরী মতিকে বিয়ে করে কলকাতা নিয়ে যায়। কুমুদের অনিশ্চিত ছন্নছাড়া জীবনযাপনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে খাপ খাইয়ে নিতে শেখে মতি।

কুমুদ যখন বিনোদিনী অপেরায় অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে কলকাতা ছেড়ে যাবার জন্য ট্রেনে চেপে বসে, তখন স্টেশনে পৌঁছে দিতে এসে শেষ মুহূর্তে মতি ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পরও ট্রেন থেকে নেমে আসে না। সে স্বামীর সহযাত্রী হয়। 
‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে কপিলা কুবের মাঝির স্ত্রী মালার ছোট বোন। সে স্বামীর সঙ্গে কলহ করে বাপের বাড়ি চলে এসেছে। এদিকে কপিলার স্বামী শ্যামদাস আবার দ্বিতীয় বিয়ে করেছে, তাই সেই সংসারে তার ফিরে যাবার পথ বন্ধ। একবার প্রবল বন্যায় কুবেরের শ্বশুরবাড়ী চরডাঙ্গা গ্রাম ডুবে গেলে কপিলা কুবেরের সঙ্গে কেতুপুর চলে আসে। মাণিক লিখছেন ‘কলঙ্ক কিনিবার সাধ যে কপিলার ষোলআনা’।
কপিলা আর কুবেরের মনোদৈহিক আকর্ষণে সুতার টানে এগিয়ে চলে উপন্যাস। কপিলা কুবেরকে ভালোবাসে, কুবেরের অন্তরেও কপিলার প্রতি তীব্র আকর্ষণ, ‘তোর লাইগা দিবারাত্র পরাণডা পোড়ায় কপিলা’ কারণ ‘বাঁশের কঞ্চির মতো অবাধ্য কপিলা’ তাই কপিলার ‘আমারে নিবা মাঝি লগে?’ এই অমোঘ আহ্বান কখনো উপেক্ষা করতে পারেনি কুবের।

উপন্যাসের শেষের দিকে মিথ্যা চুরির দায়ে পুলিশের ভয়ে কেতুপুর ছেড়ে ময়নাদ্বীপে হোসেন মিয়ার নতুন উপনিবেশে পাড়ি জমায় কুবের। উপন্যাসে মাণিক লিখছেন ‘কুবের নিরবে নৌকায় উঠিয়া গেল, সঙ্গে গেল কপিলা। ছইয়ের মধ্যে গিয়া সে বসিল। কুবেরকে ডাকিয়া বলিল, ‘আমারে নিবা মাঝি লগে?’ হ, কপিলা চলুক সঙ্গে। একা অত দূরে কুবের পাড়ি দিতে পারব না।’

কপিলা সমাজ আর সংস্কারের সবগুলো বাঁধন ছিঁড়ে কুবেরের সঙ্গে অনিশ্চিত যাত্রায় ভেসে যেতে পেরেছিল কিন্তু কুসুম তা পারেনি। শশীর প্রবল আকর্ষণ উপেক্ষা করে একসময় তার রুগ্ন স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে গাওদিয়া গ্রাম ছেড়ে কুসুম তার বাপের বাড়ি চলে যায়। যাবার সময় কেবল বলে ‘থেকে কি করব ছোটবাবু, আপনার কষ্ট আমারও কষ্ট; এ বয়সে আর কি কষ্ট সইতে পারব?’। ‘দিবারাত্রির কাব্য’ উপন্যাসের সুপ্রিয়া অসুখী দাম্পত্য থেকে প্রেমিক হেরম্বর প্রতি আসক্ত।

তাই দীর্ঘ পাঁচ বছর পর দেখা হলেও বলে ‘আপনি আমাকে ডাকলেই পারেন। আপনি ডাকলেই...’। হেরম্বর নির্লিপ্ততায় সে বলে ‘আপনি মেয়ে মানুষের সর্বনাশ করেন আর তাদের ভার নেওয়ার বেলায় এড়িয়ে যান’। ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসের এক দুর্বোধ্য চরিত্র রাজকুমার। এই উপন্যাস গিরি, মালতী, সরসী ও রিনি নামের চারজন তরুণীর সঙ্গে তার চতুষ্কোনিক প্রেম-প্রণয় তা থেকে সৃষ্টি হওয়া শরীরী আকর্ষণ; মনোদৈহিক নিরীক্ষা আর ভাবালুতা থেকে বাস্তববোধে ফিরে আসার অসামান্য দার্শনিকতায় উত্তীর্ণ।

উপন্যাসে বলা হয়েছে ‘চতুষ্কোণ ঘরের মতোই চতুষ্কোণ টেবিলেও মাঝে মাঝে প্রান্তরের বিস্তৃতি পায়। এত দূর মনে হয় একটি প্রান্ত হইতে আরেকটি প্রান্ত’। কাহিনীর শুরুর দিকে এক মনোদৈহিক খামখেয়ালিতে রাজকুমার আকস্মিকভাবেই গিরির হাত চেপে ধরে। হৃদস্পন্দন কেমন চলছে এটা অনুভব করতে গিয়ে তার বুকে হাত দিয়ে পরীক্ষা করতে যায়।

এই ঘটনার রেশ ধরে গিরির মায়ের কাছে অপমানিত হয় রাজকুমার। গিরির সঙ্গে সম্পর্কটুকু শেষ হয়ে যায়। কিন্তু মালতি, সরসী, রিনি এরা গিরির তুলনায় অপেক্ষাকৃত আধুনিকা তাই সংস্কারমুক্ত মন নিয়েই রাজকুমারের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলে। রিনি মনে করে ‘রাজকুমারের মন কবিত্বময়; বাস্তব জগতের অনেক উঁচুতে নিজের মানস-কল্পনার জগতে সে বাস করে’।

সরসী মনে করে ‘এতদিন তার শরীররটাই ছিল রাজকুমারের কাছে বড়। তারপর ক্রমে ক্রমে তার গভীরতার জন্য রাজকুমার তাকে ভালোবাসিয়া ফেলিয়াছে। মালতি ভাবে ‘চোখে তার ভালোবাসা নাই। মনে মনে কি যেন সে হিসাব করিতেছে আর যাচাই করার দৃষ্টিতে তার সর্বাঙ্গে চোখ বুলাইতেছে’। রাজকুমারের দৃষ্টিতে নারীর মন কিংবা নিরাবরণ দেহ কোনটি শ্রেয়তর!

কাহিনীর এমন অনেক মনস্তাত্বিক জিজ্ঞাসা আর প্রহেলিকার অবসানে মানসিক রোগগ্রস্ত রিনিকে সুস্থ করার দায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত রাজকুমার রিরি সঙ্গে একই ঘরে অবস্থান করে দিনরাত সঙ্গ দিয়ে যায়। কারণ মানিক লিখছেন, ‘জীবন তো খেলার জিনিস নয় মানুষের’। ‘প্রাগৈতিহাসিক’ ছোটগল্পের ডাকাত ভিখু গৃহস্থ বাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়ে বর্শার আঘাতে গুরুতর আহত হলে তার ডান হাত চিরদিনের জন্য অকেজো হয়ে যায়।

শেষে ভিক্ষা করে জীবন চালালেও খুন আর নারীদেহ ভোগের স্বভাব থেকে সে মুক্ত হতে পারেনি। প্রবল আক্রোশে ভিখারি বসির মিয়াকে রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত অবস্থায় সে খুন করে। তারপর তার সঞ্চয়টুকু হাতিয়ে নিয়ে বসির মিয়ার পঙ্গু সঙ্গীনি পাঁচীকে কাঁধে তুলে ভোরের আলো ফোটার আগেই পাড়ি দেয় আরেক অন্ধকার জীবনের পথে।
মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রতিটি উপন্যাস আর ছোটগল্পগুলোর চরিত্র সৃষ্টিতে বহু বিচিত্র নিরীক্ষা, কখনো খামখেয়ালিপনা আর ভাবনার অবাধ স্বাধীনতাকে বেছে নিয়েছিলেন। আর এভাবেই হয়ে উঠেছিলেন পুতুলরূপী অসংখ্য মানব চরিত্র সৃষ্টির অসামান্য কারিগর।

×