ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২৮ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

স্বর্ণকুমারী দেবী ॥ এক দীপ্ত মনীষা

প্রদীপ দত্ত

প্রকাশিত: ২২:২২, ১৮ এপ্রিল ২০২৪

স্বর্ণকুমারী দেবী ॥ এক দীপ্ত মনীষা

স্বর্ণকুমারী দেবী

স্বর্ণকুমারী দেবীর প্রথম উপন্যাস ‘দীপনির্বাণ’ (১৮৭৬) মূলত ইতিহাস আশ্রয়ী উপন্যাস। দ্বাদশ শতকে দিল্লি ও এর পার্শ্ববর্তী রাজাদের মধ্যে আত্মকলহ গৃহবিবাদ ও পররাজ্য দখলের প্রবণতা থেকে সৃষ্ট অনৈক্য; এসবের ফলে বহিরাগত আফগানিস্তানের গজনী রাজ্যের প্রধান সেনাপতি মুহম্মদ ঘোরীর দিল্লি জয়, এবং এর মধ্যে দিয়েই ভারতবর্ষে কথিত আর্য রাজ্যের বিলোপ ও মুসলিম শাসনামল শুরু। এই প্রেক্ষাপটে উপন্যাসটি লেখা

উনিশ শতকে বাংলার মহা-জাগৃতির যুগে তিনি জন্মেছিলেন জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে। তাঁর পরিচয়, তিনি  মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কন্যা। আবার শৈশবে পেয়েছিলেন  দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মতো অগ্রজদের সান্নিধ্য। মাত্র এগারো বছর বয়সে  জানকীনাথ ঘোষালের মতো শিক্ষিত উদারমনা যুবককে পেয়েছিলেন স্বামী হিসেবে। এদিকে আবার কনিষ্ঠ ভ্রাতা রবীন্দ্রনাথ।

তবে সবকিছু ছাপিয়ে  ঠাকুরবাড়ীর আরও কয়েকজন এক-একটি আলো ছড়ানো মানুষগুলোর পাশে স্বর্ণকুমারী দেবী স্বতন্ত্র মণীষায় তাঁর স্থান করে নিয়েছিলেন এ কথা বলাই যায়। ১৮৭৬ সালে মাত্র বিশ বছর বয়সে ‘দীপনির্বাণ’ উপন্যাস লিখা দিয়ে শুরু করেছিলেন তিনি; আর শেষ ত্রয়ী উপন্যাস ‘বিচিত্রা’-‘স্বপ্নবাণী’-‘মিলনরাত্রী’ এর প্রকাশকাল ১৯২৫ সালে, যখন তাঁর বয়স ঊনসত্তর বছর। তিনি লিখেছিলেন বারোটি উপন্যাস, পঁচিশটির মতো ছোটগল্প, বেশ কিছু প্রবন্ধ, কবিতা, গাথাকাব্য, কৌতুকনাট্য, শিশুতোষ রচনা ইত্যাদি।

প্রায় এগারো বছর ‘ভারতী’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন তিনি। সম্পাদনায় তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। সমাজসংস্কার বিশেষত পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের উন্নতির জন্য ‘সখিসমিতি’ গঠন করেছিলেন। স্ত্রী শিক্ষার বিস্তার, বিধবা ও নিরাশ্রয় নারীদের আশ্রয়দান, বিধবা শিল্পাশ্রম প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির মাধ্যমে নারীমুক্তির জন্য কাজ করে গেছেন। তবে তিনি যে সময়টাতে জন্মেছিলেন তখন এ সকল কাজ করার মতো যথেষ্ট অনুকুল সময় যে ছিল তা বলার কোনো সুযোগ নেই।

তখন পরাধীন বাংলার নারীসমাজ অশিক্ষা-অজ্ঞানতা-ধর্মীয় প্রথাবদ্ধতার সংস্কারে আচ্ছন্ন এক আঁধারকাল পাড়ি দিচ্ছে। সেখানে অন্তঃপুরবাসিনী কোনো নারীর পক্ষে একাই দপ করে জ্বলে উঠা খুব সহজসাধ্য ছিল না। কিন্তু ঠাকুরবাড়ীর অগ্রসর ধ্যান-ধারণা, শিক্ষা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, গুণী মানুষজনের সাহচর্য্য আর আপন প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে সেই সময়কে তিনি অর্জনে পরিণত করেছেন। জীবনস্মৃতি বিষয়ক একটি প্রবন্ধে তিনি লিখছেন ‘আমি শৈশবে অন্তঃপুরে সকলেরই লেখাপড়ার প্রতি একটা অনুরাগ দেখিয়াছি।

ঘরে ঘরে সকলেরই যেমন আলমারি ভরা পুতুল, খেলনা, বস্ত্রাদি থাকত, তেমনি সিন্দুকবন্দি পুস্তকরাশিও থকত।’ এমন একটি পারিবারিক আবহে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। বাড়িতেই একজন প-িতের কাছে তার সংস্কৃত শিক্ষা শুরু হয়। এরপর একজন ইংরেজ মেমের কাছেও কিছুদিন শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর আদিব্রাহ্ম সমাজের নবীন আচার্য্য অযোদ্ধানাথ পাকড়াশীকে গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেন পিতা দেবেন্দ্রনাথ। তাঁর কাছ তিনি অঙ্ক, সংস্কৃত, ইতিহাস, ভূগোল, ইংরেজি প্রভৃতি স্কুলপাঠ্য বইসমূহ পড়তে থাকেন।

স্বামী জানকীনাথ ঘোষাল ছিলেন প্রচ- আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন মানুষ। স্বর্ণকুমারী দেবীকে তিনি শুধু ঘরকন্নায় আবধ্য রাখেননি। নিজের জীবন বিকাশে পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও স্বামী জানকীনাথ ঘোষালের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে  স্বর্ণকুমারী দেবী লিখছেন ‘আমার পূজনীয় ও স্নেহময়  পিতৃদেব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার জীবনব্রত উদ্যাপন করিবার জন্য যেভাবে শিক্ষা দিয়াছিলেন, তৎকালে হিন্দুবালিকাগণকে সেভাবে শিক্ষা প্রদত্ত হইত না।

তথাপি আমার প্রিয়তম স্বামীর সাহায্য ও উৎসাহ ব্যতিরেকে আমার পক্ষে এতদূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব হইতো না। আজ বহির্জগত আমাকে যেভাবে দেখিতে পাইতেছে, তিনিই আমাকে সেইভাবে গঠিত করিয়া তুলিয়াছিলেন এবং তাঁহার প্রেমপূর্ণ  উপদেশে বা ঝটিকা বিক্ষুব্ধ সমুদ্রেও যেমন সন্তরণনিপুণ ব্যক্তি সহজে ও অবলীলাক্রমে সন্তরণ করিয়া যায় সাহিত্যজীবনের ঝটিকাময় ও উত্তাল তরঙ্গের মধ্য দিয়া আমিও সেইরূপ অবলীলাক্রমে চলিয়া আসিয়ছি।

সাহিত্যের প্রতি যে গভীর প্রেম তিনি আমার মধ্যে সঞ্চারিত করিয়া দিয়াছিলেন, তাহাই আমাকে তৎকালীন সর্বোৎকৃষ্ট জ্ঞানদোতক মাসিকপত্রগুলোর অন্যতম ভারতী মাসিক পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্বপূর্ণ ভার গ্রহণ করিতে অনুপ্রেরিত করিয়াছিল, এবং মানসিক স্বাধীনতার সুখের যে স্বাদ তিনি আমাকে উপভোগ করাইয়াছিলেন, তাহাই আমাকে আমার দেশবাসীগণের সহিত বর্তমান উন্নতিযুগের ক্রমবর্ধমান বিকাশে সহযোগিতা ও বিস্তারসাধনে সহায়তা করিতে উদ্দীপ্ত করিয়াছে।’ (তথ্যসূত্র : স্বর্ণ-স্মৃতি, শ্রী মম্মথনাথ ঘোষ, স্বর্ণকুমারী দেবীর রচনা-সংকলন পৃষ্ঠা-৫১২ দে’জ পাবলিশিং কলকাতা)।

স্বর্ণকুমারী দেবীর অন্যান্য ভাইয়েরাও ছিলেন নিজ নিজ প্রতিভা আর সৃষ্টিকর্মে একেকজন উজ্জ্বল মানুষ। দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, হেমেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, এমনকি গনেন্দ্রনাথ, গুনেন্দ্রনাথ প্রমুখের সৃষ্ট সাহিত্য-সংস্কৃতির বলয়ে স্বর্ণকুমারী দেবী স্ব-মহিমায় বিকশিত হয়ে উঠেছিলেন। জ্যেতিরিন্দ্রনাথ তাঁর জীবনস্মৃতিতে লিখছেন ‘জানকী বিলাত যাইবার সময়, আমার কনিষ্ঠা ভগিনী স্বর্ণকুমারী আমাদের বাড়িতে বাস করিতে থাকায়, আমরাও তাঁহাকে একজন যোগ্য সঙ্গীরূপে পাইলাম। স্বর্ণকুমারীও অনেক সময় আমার রচিত সুরে গান প্রস্তুত করিতেন।

সাহিত্য এবং সংগীতের চর্চায় আমাদের তেতলা মহলের আবহাওয়া তখন দিবারাত্রি পূর্ণ হইয়া থাকিত।’ ১৮৫৬ থেকে ১৯৩২ এই দীর্ঘ কালসীমায় আপন আলোয় প্রদীপ্ত থেকেছেন স্বর্ণকুমারী দেবী। ঊনিশ শতকের শেষ অর্ধেক আর বিশ শতকের শুরু এই যাপিত সময়টা শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, ধর্ম, স্বদেশ চেতনা সবকিছুতেই নবজাগরণের ঢেউ। পুরনো উপনিবেশিক মানসিকতায় পরিবর্তনের হাওয়া, সংকীর্ণতার খোলশ ছেড়ে নতুন জীবন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

বঙ্গভঙ্গ রোধ, বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী পথ অনুসরণ, বিলাতি পণ্য বর্জন, সত্যাগ্রহ, চরকা কাটা খাদি আন্দোলন, বুর্জোয়া নেতৃত্বের দুর্বলতা সমকালীন এই বিষয়গুলো তাঁর গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধে ছাপ ফেলেছে, একইসঙ্গে চিরকালীন সাহিত্যের মূল ভাবনাও তাঁর রচনার বাইরে থাকেনি। সমকালীন সাহিত্যের একজন খ্যাতিমান নারী কবি, কামিনী রায় (১৮৬৪Ñ১৯৩৩) তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘এদেশের প্রতি দিনের, প্রতি স্থানের সুলভ ঘটনা, যাহা জীবনের করুণ ও শান্ত ভাবগুলোকে ফুটাইয়া তোলে, সৌন্দর্যের ও মহত্ত্বের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সে রকম চিত্র তিনি সহজ সুন্দরভাবে আঁকিয়া দেখিতে চেষ্টা করিয়াছেন এবং সফল যতœ হইয়াছেন।

নির্যাতিতা নারীর দুঃখে তাঁহার হৃদয় কাঁদিয়াছে, তথাপি রুদ্র বিদ্রোহের রক্ত ধ্বজা তুলিয়া তিনি এক হীনতা হইতে আর এক হীনতায় ঝাঁপাইয়া পড়িতে নারীকে আহ্বান করেন নাই। তিনি সকল বিষয়ে ধীর ও সংযত ছিলেন। কোনো উদ্দাম ভাব তাঁর কথায় বা লেখায় খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। পাঠককে আকৃষ্ট করিবার জন্য কোনো অযথা চেষ্টা তাঁহার ছিল না।’
অবরোধবাসীনি চির উপেক্ষিতা নারী সমাজের প্রতি ছিল তাঁর গভীর মমত্ববোধ ও দায়বদ্ধতা। ‘ভারতী’ পত্রিকায় বিবিধ প্রসঙ্গ লিখতে বসে তিনি লিখেছিলেন ‘যাহারা হারিবে জানিয়াও সমস্ত পণ করে তাহারা পাগল, কিন্তু এরূপ পাগলের সংখ্যা পৃথিবীতে অল্প নহে, অন্তত অর্ধেকÑ নারীজাতি!’  তাই স্বর্ণকুমারী দেবী তাঁর বেশিরভাগ উপন্যাস আর গল্পে এই ‘পাগল’ মেয়েদেরই তুলে এনেছেন অপরিসীম মমতায়।  জগৎসংসারের সবার প্রতি ভালোবাসা সমর্পণ করে যারা জীবনকে পণ করেছে আর পরিণামে লাভ করেছে  অনাদর আর উপেক্ষা।
স্বর্ণকুমারী দেবীর প্রথম উপন্যাস ‘দীপনির্বাণ’ (১৮৭৬) মূলত ইতিহাস আশ্রয়ী উপন্যাস। দ্বাদশ শতকে দিল্লি ও এর পার্শ্ববর্তী রাজাদের মধ্যে আত্মকলহ গৃহবিবাদ ও পররাজ্য দখলের প্রবণতা থেকে সৃষ্ট অনৈক্য; এসবের ফলে বহিরাগত আফগানিস্তানের গজনী রাজ্যের প্রধান সেনাপতি মুহম্মদ ঘোরীর দিল্লি জয়, এবং এর মধ্যে দিয়েই ভারতবর্ষে কথিত আর্য রাজ্যের বিলোপ ও মুসলিম শাসনামল শুরু।

এই প্রেক্ষাপটে উপন্যাসটি লেখা। তবে এই উপন্যাসে আমরা দিল্লির শাসক পৃথ্বিরাজ চৌহানের রাজসভায় একজন প্রসিদ্ধ রাজপুত কবি ‘চাঁদকবির’ সন্ধান পাই যাকে উপন্যাসে কবিচন্দ্র নামে অভিহিত করা হয়েছে। যিনি সমরবিদ্যার পাশাপাশি রাজপুত জাতীর শৌর্যবীর্য বিষয়ে মহাকাব্য লিখেছিলেন। 
‘ছিন্নমকুল’ (১৮৭৯) উপন্যাসের নায়িকা কনক একজন কুমারী মেয়ে আর ‘¯েœহলতা’ (১৮৯২) উপন্যাসের নায়িকা স্নেহলতা এক অকাল বিধবা কিশোরী। কুমারী কনক আর অকাল বৈধব্যের যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকা স্নেহলতা এই দুইজন নারীকে এক সমান্তরালে এনে মেয়েদের জীবনকে পর্যালোচনা করতে চেয়েছিলেন তিনি। শান্ত সহনশীল নিরভিমানী মেয়েরা অদৃষ্টের প্রবোধ মেনে সবকিছু নীরবে সহ্য করে এসেছে।

কিন্তু একদিন নিজের কাছে হেরে গিয়ে আত্মহননে হারিয়ে যায় জীবন থেকে। অপরাধ কি কেবল নারী হয়ে জন্মানো? সমাজব্যবস্থায় পুরুষের ইচ্ছার প্রাধান্য যেখানে প্রতিষ্ঠিত সেখানে বিবাহের পাত্র নির্বাচনে নারীর ইচ্ছা অনিচ্ছা কি একেবারেই মূল্যহীন? উপন্যাসের নায়ক অল্পবয়সী বিপতœীক চারু তার সব স্খলন সত্ত্বেও যদি নতুন জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে তবে স্মামীহারা স্নেহলতাকে কেন আশ্রয়হীন হয়ে আত্মহননের পথেই মুক্তি খুঁজে নিতে হবে? আবার লেখিকা সমাজ সংসারের বিরাজমান গ-ির বাইরেও পা বাড়াতে চাননি।
‘কাহাকে’ (১৮৯৮) উপন্যাসটিকেই স্বণকুমারী দেবীর শ্রেষ্ঠ রচনা মনে করা হয়। ‘কাহাকে’ একটি আত্মকথন জাতীয় নিটোল প্রেমের গল্প যা মনস্তত্ত্বের অনেক বাঁক পেরিয়ে একটা ইচ্ছা পূরণের পরিণতিতে পৌঁছেছে। গল্পের মূল চরিত্র মৃণালিনী কিংবা মণি ছোটবেলায় পাঠশালার সাথী ছোটুকে মনের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলে। ছোটুর অস্ফুট স্বরে গাওয়া একটা গান তার মনে স্থান করে নেয়।

একটু বড় হলে মণি তার দিদি জামাইবাবুর বাড়িতে গিয়ে বসবাস করতে থাকে। সেখানে পরিচয় হয় বিলাত ফেরত রমানাথের সঙ্গে। পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে উভয়ের । হঠাৎ একদিন রমানাথ ছোটুর গাওয়াা গানটাই গুন গুন করে গাইতে থাকে । তখন মণি তার বাল্যকালের হারিয়ে যাওয়া সাথী ছোটুকে খুঁজে পায় রমানাথের মধ্যে। এর মধ্যে তাদের জীবনে আসে জামাইবাবুর বন্ধু ডা. বিনয়, তিনিও বিলাত ফেরত । একদিন মনি জানতে পারে এক বিদেশিনীর সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রমানাথ।

আর সে তার জন্যেই অপেক্ষা করে আছে। তখন মন ভেঙে যায় মণির। সে নিজেকে গুটিয়ে নেয় রমানাথের কাছ থেকে। বিভিন্ন ঘটনায় বিনয় ডাক্তারের প্রতি মণির শ্রদ্ধা বেড়ে যায়। মণি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে কাকে সে বিয়ে করবে। এমন টানাপোড়েনের মধ্যে মণির বাবা এসে তাকে দেশে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁর মনোনীত পাত্রের সঙ্গে বিয়ে স্থির করে। মণি জানতে পারে এটা তার ছেলেবেলার সহপাঠি ছোটু।

এবারও মণি বড় ভাবনায় পড়ে যায়, কারণ সে নিজে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত আর ছোটু  গ্রামের ছেলে এখন সে কি অবস্থায় আছে তাও জানে না। এর মধ্যে বিনয় ডাক্তার একদিন মণিদের বাড়িতে এসে হাজির হয়। তখন মণি জানতে পারে এই বিনয় ডাক্তারই তার সেই ছোটবেলার সহপাঠি ছোটু আর তিনিই তার বাবার ঠিক করা পাত্র। কাহিনীর শেষ এখানেই। পাত্র নির্বাচনে মণির নিজের সিদ্ধান্তহীনতা ও নারীর মনস্তত্ত্ব নিয়েই উপন্যাস ‘কাহাকে’। স্বর্ণকুমারী দেবীর লেখা ছোটগল্পগুলো আরও বৈচিত্র্যময়।

চরিত্রসৃষ্টি আর কাহিনী বিন্যাসে তাঁর মমতা ও যতœ পাঠক হৃদয়কে স্পর্শ করবেই।
সাহিত্য সমালোচক ও খ্যতিমান লেখিকা    ড. সুদক্ষিণা ঘোষ লিখছেন ‘প্রতিদানহীন প্রেমেরই জগৎ স্বর্ণকুমারীর ছোটগল্পে, এমনই সৌন্দর্যময় সে প্রেমের জগৎ, যে দুশ্চরিত্র খলনায়িকাকেও যথোচিত খলচরিত্র বলে মনে হয় না, বেদনাময় অনুকম্পা জেগে ওঠে তার জন্যেও।
স্বর্ণকুমারী দেবীর সাহিত্যকর্মের বর্তমান সময়ের পাঠককে স্মরণে রাখতে হবে আঠারো-উনিশ শতকে জমিদার পরিবারে বিপুল বৈভবের মধ্যে জন্মগ্রহণ করে আয়েসি জীবনের বিপরীতে, সর্বোপরি অবগুণ্ঠিতা শেকলে বাঁধা নারী সমাজের মধ্যে দপ্ করে জ্বলে উঠার কাজটি খুব সহজসাধ্য ছিল না। যিনি সাহসের সঙ্গে এই কাজটি করতে পেরেছিলেন তিনিই স্বর্ণকুমারী দেবী। শুধু একটি স্বতন্ত্র মনীষার গুণেই এটা সম্ভব হয়েছিল।

×