আজকের তারিখ লিখব না।
রোজ রোজ তারিখ লিখতে ভাল লাগে না। বিড়ালের বাচ্চা দুটো সুন্দর ছিল না? কী নরম গা ওদের। ঘর থেকে বের করে দিতে মায়া লাগছিল। কিন্তু কি করব বল? ঘরে বিড়াল থাকলে তোর শ্বাসকষ্ট হয় যদি?
তোর রিপন মামার বাসা থেকে ফেরার সময় সেই জায়গাটা দেখলাম, একদম আগের মতোই আছে। মানুষের কোলাহল থেমে গেছে ওখানে। পাখিরা যে যার মতো সংসার পেতে বসেছে। জ্বালাতন করার কেউ নেই। আমি একা একা থাকি বলে সবাই ভাবে আমি বুঝি একাকীত্বের পূজারী। তুই তো জানিস আমি নির্জনতা ভালবাসি কিন্তু একাকীত্ব না। নির্জনতায় ডুবে তুই আর আমি। হ্যাঁ- একদিন যাব ওখানে, শুধু তুই আর আমি। তোকে সব থেকে সুন্দর লাল ফ্রকটা পরাব। চারপাশের সবুজ সকালের মোলায়েম আলোয় অন্য রকম দেখাবে। তোর মতো দুর্বোধ্য ভাষায় পাখিরা গান গাইবে। মনমরা কাঠবিড়ালিকে তুই সঙ্গ দিস, কেমন?
সেদিন একটুও বাঁধা দেব না তোকে। নীল প্রজাপতির পেছনে ছুটে বেড়াতে দেব। তোকে কোলে তুলে পরিষ্কার জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকব। নিজের ভাষায় অর্থহীন কথার খৈ ফোটাবি তুই। তোর মিষ্টি মুখের দিকে তাকিয়ে মহাশূন্যের মতো দুর্বোধ্য তোর কথার অর্থ বুঝে নেব এক নিমেষে। গুঁইসাপ দেখে ভয় পেলে তুই আমায় জড়িয়ে ধরিস। টলমলে পায়ে ধাওয়া করিস লাল ফড়িংটাকে। আমি তোর পাশে পাশেই থাকব। তুই হাত বাড়াবি, টলময়ে পায়ে ঝুমঝুম নূপুর বাজিয়ে হাঁটবি, ফোকলা মুখে হাসবি। আমি তোকে কাছে টেনে নেব না, তুল তুলে গালে চুমু খাব না, কেবল দৃষ্টির মমতায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখব তোকে। বেলা গড়াবে। পাখিরা যার যার ঘরে খিল দেবে। শিমুল ফুল চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে যাবে। দূরের কোলাহল আরও দূরে সরে যাবে।
আবছা শহর দৃষ্টির আড়ালে গা-ঢাকা দেবে। দিগন্তের ওপারে কোন মাটির ঘরে তেলের কুপি জ্বেলে মা তার সন্তানকে বর্ণমালা শেখাবে। সেই ভাঙ্গা স্বর ‘অ-আ’ আমার কানে এসে ধাক্কা দেবে। অন্ধকার আরও অন্ধকার হবে। গভীর রাত আরও গভীর হবে। কোথাও শিয়াল ডাকবে না। রাতজাগা পাখিরা আর্তনাদ করবে না। দূরের বাড়ি থেকে ভেসে আসা একটা বাচ্চার কান্না আমার সমস্ত পৃথিবীকে এলোমেলো করে দেবে। শূন্যতা আমাকে গ্রাস করে ফেলবে, একাকীত্ব ছেয়ে ফেলতে থাকবে। তুই তো জানিস আমি নির্জনতা ভালবাসি কিন্তু একাকীত্ব না। তোকে একবার বলেছি। বার বার বলি। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এ-পিঠ ও-পিঠ করে বলি। আমার একাকীত্ব আমাকে বাঁচতে দেয় না, মৃত্যুর পথ আগলে দাঁড়ায়। আমি মরি না-বাঁচি না। প্রতিদিন তোর কাছে প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গি। হাজারবার কাঁদব না বলে কেঁদে ডায়েরির বুক ভাসাই। একটানা চোখের জলে ভিজে গলে যায় নীল কলমের দাগ; তোর জন্য লেখা শেষ চিঠিটা। রাত শেষে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের তৃপ্তিটুকুই আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। একজন নিঃসন্তান মায়ের হৃদয়ের হাহাকারটুকু তুই বুঝিস?
nufrat _yareen@ yahoo. com

