ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

সাজ্জাদ কাদির

সঙ্গীত এবং চিত্রের অনন্য শিল্পী

প্রকাশিত: ০৭:২৭, ২৫ জানুয়ারি ২০১৯

সঙ্গীত এবং চিত্রের অনন্য শিল্পী

সঙ্গীত পিপাসু মানুষের নিকট ইফ্ফাত আরা দেওয়ান অনেক বছর আগে থেকেই একটি স্বতন্ত্র পরিচয়ে পরিচিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত একজন মানুষ। তাঁর গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত কিংবা পুরনো দিনের গান মানুষের মনকে যে নিবিষ্ট করে রাখতে পারে এ কথা প্রমাণিত। এক্ষেত্রে অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন শিল্পী তিনি। সঙ্গীত ছাড়াও চিত্রশিল্পী হিসেবে তাঁর আরও একটি স্বতন্ত্র পরিচয় ইতোমধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। ইফ্ফাত আরা দেওয়ান মূলত পড়াশোনা করেছেন অর্থনীতি বিষয়ে। সেই সঙ্গে সঙ্গীতের উপর পাঠ নিয়েছেন ছায়ানটে। চিত্রকলার পাঠটি বলতে গেলে স্বশিক্ষা থেকে। সেই ১৯৯০ সাল থেকে তিনি চিত্রকর্মের চর্চা করে চলেছেন। সময়ের হিসাবে ২৯ বছর। ২৭ বছর আগে ১৯৯২ সালে প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী করেছেন। বলতেই পারি সঙ্গীত এবং চিত্রকর্ম তাঁর এ দুটি সত্তাই হাত ধরাধরি করে সমান তালে এগিয়ে চলেছে। ইতোমধ্যে তিনি বিদেশে ভারত, সিঙ্গাপুর ও ফ্রান্সে এবং নিজ দেশে সব মিলিয়ে এ যাবত ১৫টি একক চিত্রপ্রদর্শনী করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে অনেকগুলো দলগত প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। গত ১৫ জানুয়ারি ‘চাঁদের এত আলো’ শিরোনামে রাজধানীর লালমাটিয়ায় সমকালীন চিত্রশালা শিল্পাঙ্গনে তাঁর শোড়ষ একক চিত্রপ্রদর্শনী শুরু হয়েছে। এটি চলবে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। এতে ৪৮টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে। প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শিল্পানুরাগী মানুষের জন্য তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গীতের অনুরাগী সেই ছেলে বেলা থেকে। কিন্তু তাঁর কোন চিত্রপ্রদর্শনী বা চিত্রকর্মের আগে আমার দেখার সৌভাগ্য হয়নি। গত ১৬ জানুয়ারি আগ্রহ নিয়ে তাঁর চিত্রপ্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলাম। এক কথায় বলব আমার চেনা সঙ্গীতশিল্পী ইফ্ফাত আরা দেওয়ান অচেনা চিত্রশিল্পী ইফ্ফাত আরা দেওয়ান একজন শিল্পানুরাগী মানুষ হিসেবে আমাকে নিরাশ করেননি। সত্যিই তিনি সঙ্গীতের মতো চিত্রকর্মেও যে, এক অনন্য পরিচয় দিয়ে চলেছেন এবারের প্রদর্শনীটিও তাই প্রমাণ করে। তাঁর চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু অত্যন্ত সহজ-সরল কিন্তু একটি গতিময়তা আছে। তিনি বিষয়বস্তু হিসেবে ফুল, প্রকৃতি, নারী, জড়জীবন ইত্যাদি নিয়ে কাজ করেছেন। আমাদের ব্যস্ত জীবনকে সুবাসিত করার জন্য ঘরের কোনে রাখা ফুলদানিটা হয়ত কোন রকমে আমরা রেখে দেই। কিন্তু এটিও যে একটি শিল্পের বিষয়বস্তু হতে পারে শিল্পী তা দেখিয়েছেন। বিশেষ করে নগর জীবনে আপনার ঘরে ফুলদানি না থাক অন্তত একটি ফুলদানির চিত্রকর্ম থাকলেও আপনি একটি ফুলেল পরিবেশ পেতে পারেন শিল্পী হয়ত সেটিই বোঝাতে চেয়েছেন। ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা মনে মনে!’ রবীন্দ্রনাথের এই গানের মতো হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করবে আমাদের এই ব্যস্ত নগর জীবন ছেড়ে শিল্পীর আঁকা ‘আমাদের এই বসুন্ধরা’, ‘¯িœগ্ধ বসুন্ধরা’ কিংবা ‘হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো’ শিরোনামের চিত্রকর্মে। চাঁদের আলো কতটা ঝকঝকে এবং প্রশান্তিদায়ক সেটি হয়ত আমরা এই নগর জীবনে ভুলতে বসেছি। শিল্পীর আঁকা ‘চাঁদের এত আলো’ কিংবা ‘চুপি চুপি বাঁশি বাজে আকাশে’ শিরোনামের চিত্রকর্মের সামনে দাঁড়ালে মনে পড়ে যাবে জীবনের কোন এক সময় ফেলে আসা চাঁদনী রাতের মায়াময় পরিবেশের কথা। জড় জীবন হিসেবে বেছে নিয়েছেন ঘরের চেয়ার-টেবিল, ল্যাম্প, হারমনিয়াম কিংবা সেতার। জিনিসগুলো আমাদের নিত্য সাথী। কিন্তু আমরা কী এগুলোকে চোখ মেলে দেখি? শিল্পীর চোখে জড় জীবনগুলো দেখতে ভালই লাগে। ‘উতলা মাধবী রাতে’,‘মিউজিক এন্ড দ্য মুন’, ‘দ্য উইন্ডস অব চেঞ্জ’ চিত্রকর্মে উথাল পাথাল বাতাসে এলোমেলো জানালার পর্দা ভেদ করে চাঁদের আলোয় আলোকিত ঘরকে বড্ড মায়াময় পরিবেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। শিল্পী একজন নারী হিসেবে নারী প্রতিকৃতি আঁকতে ভোলেননি। ভাল লেগেছে প্রতিটি চিত্রকর্মের নামকরণ। আমাদের চোখের সামনে থাকা ছোট ছোট বিষয়গুলোকে আমরা হয়ত প্রতিনিয়ত এড়িয়ে চলি। মনে হয় যেন এগুলো আছেই তো। আলাদা করে দেখার কী আছে? কিন্তু না পৃথিবীর সবকিছুতেই শিল্প আছে; আছে নান্দনিকতা। তাঁর এই চিত্রকর্মগুলোর বিষয়বস্তুর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় জীবনের আকুতি, আনন্দ-বেদনার সুর। তিনি তাঁর চিত্রকর্মে সেটিই মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। শিল্পী ইফ্ফাত আরা দেওয়ান দুই সত্তায় সুপ্রতিষ্ঠিত একজন মানুষ। একদিকে তিনি গুণী সঙ্গীত শিল্পী এবং অন্যদিকে তিনি চিত্রশীল্পেও তাঁর গুণের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, সঙ্গীত এবং চিত্রশিল্পের এক অনন্য শিল্পী ইফ্ফাত আরা দেওয়ান। আমরা শিল্পানুরাগী মানুষ প্রত্যাশা করব তিনি সঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গে চিত্রশিল্পকেও এগিয়ে নিয়ে যাবেন সমান তালে এবং আমাদের শিল্প ভুবন সমৃদ্ধ করে চলবেন প্রতিনিয়ত। শুভ কামনা তাঁর জন্য।
×