ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

অনুবাদ : আতাতুর্ক কামাল পাশা

নোবেল বক্তৃতা ॥ ইউজিন ও’নীল

প্রকাশিত: ০৭:২৯, ২৫ জানুয়ারি ২০১৯

নোবেল বক্তৃতা ॥ ইউজিন ও’নীল

সামান্য পূর্বাল্লেখ : ইজিজিন গ্লাডস্টোন ও’নীল একজন বিখ্যাত নাটক রচয়িতা হিসেবে বিশে^ পরিচিত। তার লেখক নাম তিনি ধারণ করেন ইউজিন ও’নীল। আজও তার বিখ্যাত নাটকগুলো ইউরোপ, ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে মঞ্চস্থ হচ্ছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটিতে ১৬ অক্টোবর, ১৮৮৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি ইউরোপীয় নাট্য ধারার প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠেন। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় থেকে তিনি ইউরোপীয় আধুনিক নাট্যকার আগস্ট স্ট্রিন্ডবার্গের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেন এবং মহাযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তিনি তার আদর্শ ও অনুপ্রেরণায় মার্কিন নাট্যজগতকে উন্নত পর্যায়ে এবং উচ্চতর পর্যায়ে টেনে নিতে থাকেন। নিজের অক্লান্ত পরিশ্রমে ও মেধায় খুব তাড়াতাড়ি তার নাটকগুলো আধুনিক বিশে^ ও ইউরোপে সমাদৃত হতে থাকে। বিভিন্ন মঞ্চে এসব নাটক পরিবেশনার ফলে তিনি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এরই ফলে তিনি ১৯৩৬ সালে সুইডিশ একাডেমির কর্র্তৃক নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। কিন্তু এ পুরস্কার স্বহস্তে নেয়ার সুযোগ তার হয়নি। এ সময় তিনি খুবই অসুস্থ ছিলেন এবং চিকিৎসক তাকে ছয় মাসের পরিপূর্ণ বিশ্রামে থাকতে আদেশ দেন। তার হয়ে নোবেল ভোজসভায় নোবেল বক্তৃতাটি পড়ে শোনান সুইডেনে নিয়োজিত মার্কিন চার্জ দ্য এ্যাফেয়ার্স, জেমস্ ই ব্রাউন, জুনিয়র। তিনি তার একটি ছোট্ট কথন তুলে ধরেন। জেমস্ ই ব্রাউন, জুনিয়র বলেন, নোবেল বিজয়ী উপস্থিত থাকার অপারগতার জন্য আজকের ১০ ডিসেম্বর, ১৯৩৬ দিনের স্টকহোমে সিটি হলের এই সম্মানী ভোজসভায় তার বক্তৃতা পড়ে শোনানোর দায়িত্ব পেয়ে আমি মার্কিন চার্জ দ্য এ্যাফেয়ার্স, জেমস্ ই ব্রাউন, জুনিয়র বেশ সম্মানিতবোধ করছি। ... এর পর তিনি ইউজিন ও’নীলের নোবেল বক্তৃতা পড়ে শোনান যার বাংলাকরণটি নিচে তুলে ধরা হলো। প্রথমত, আমি আপনাদের প্রতি আর একবার গভীরভাবে সমবেদনাবোধ করছি যে পরিস্থিতি আমাকে আজকের এই মহান উৎসবে সুইডেনের ভোজসভায় উপস্থিত হয়ে আপনাদের সামনে ব্যক্তিগতভাবে কিছু কথা তুলে ধরে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ থেকে আমায় বঞ্চিত করল। আমার কাজটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ বলে বিবেচিত হওয়ার সম্মানে ঠিক কথাগুলো যথার্থভাবে প্রয়োগ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার কাছে বেশ সুকঠিন বলে বিবেচিত হচ্ছে। এ সম্মাননায় আমি আরও বেশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এ কারণে যে এটি শুধু আমার কাজকেই সম্মানিত করছে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রে আমার সকল সহকর্মীকেই সম্মানিত করছে? যে নোবেল প্রাইজটি ইউরোপ কর্তৃক আগামী দিনের সব (যুক্তরাষ্ট্রের) থিয়েটার কর্মীদের মূল্যায়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, সময় ও পরিবেশের সৌভাগ্যে আমার কাজগুলো হয়ত মার্কিন নাট্যলেখকদের তুলনায় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল থেকে ব্যাপকভাবে বেশি পরিচিতি লাভ করেছে। এ কাজগুলো আধুনিক মার্কিন নাট্যজগতকে একটি সুন্দরতম চিন্তা-শক্তির দর্শনে নিয়ে যেতে পেরেছে এর জন্য মার্কিনীরা গর্ববোধও করে। তারা এসব নাটককে ইউরোপীয় নাটকের সঙ্গে আত্মীয়তার মেলবন্ধন দাবি করতে পারে, যে উৎসটিই আমাদের অনুপ্রেরণা। এই মৌলিক চিন্তার অনুপ্রেরণা আমায় এভাবে ভাবায় যে, এই বিশাল আনন্দোৎফুল্ল অনুষ্ঠানটি বরাদ্দ হয়েছে এবং তা আমাকে কৃতার্থচিত্তে স্বীকার করতে সুযোগ দিচ্ছে তাতে আমি সুইডেনবাসীদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এবং তার জন্য আমি গর্বিত। আমার কাজের ঋণ আমি স্বীকার করে যাব তার প্রতি, তিনি হচ্ছেন বিশাল প্রতিভাধর আধুনিক নাট্যকারদের চূড়ামণী আপনাদের আগস্ট স্ট্রিন্ডবার্গের প্রতি। ১৯১৩-১৪ সালের শীতে যখন আমি প্রথম নাটক লিখতে বসি তখনই অন্য সব কিছুর আগে তারই নাটকগুলো আধুনিক নাটক কেমন হতে পারে, তার একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রথম আমার সামনে মেলে ধরে এবং মঞ্চনাটক লিখতে আমাকে প্রথম প্ররোচিত করে তোলে। আমার কাজের যদি কোন স্থায়ী মূল্য থাকে তাহলে এটি তারই চিন্তাধারার মৌলিক ধাক্কা যা তখন থেকেই আমার পরবর্তী সারা সময়ের অনুপ্রেরণা হিসেবে থেকে গিয়েছে। তার সেই মেধাবী পদাঙ্ক অনুসরণই সে সময়ের পাওয়া উচ্চাকাক্সক্ষা হিসেবে আমার প্রতিভাকে যতটুকু পেরেছি বিশুদ্ধ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছি। এটি ঠিক, স্ট্রিন্ডবার্গের প্রভাবের প্রতি আমার কৃতকর্ম খুবই ঋণী বিষয়টি সুইডেনবাসীদের কাছে কোন বার্তা বহন করে আনে না। এই প্রভাবটি আমার সামান্য কিছু নাটকের চেয়েও অনেক বেশি কাজে স্পষ্টভাবে প্রসারিত এবং প্রত্যেকে এটি সাদা চোখে দেখতে পারবেন। যারা আমাকে জানেন তাদের কাছে এটি কোন বিষয় না কারণ এটি সব সময় আমি আমার কাঁধে চাপিয়ে নিয়েছি। যারা তাদের নিজেদের অবদানের মূল্যায়নে এসব কথা স্বীকার করতে দ্বিধাবোধ করেন শেষে যেন বা তাদের প্রভাবের মূল শেকড়ের কথা প্রকাশ হয়ে পড়ে, আমি কখনও তাদের মতো নই। আমি শুধু স্ট্রিন্ডবার্গের প্রতি আমার ঋণের বিষয়টি স্বীকার করতেই খুব গর্ববোধ করি না, এটি তার জনগণের সামনে ঘোষণা করতে পেরে আমি খুবই সুখবোধ করছি। আজ পর্যন্ত সবার সামনে আমাদের যে কারও চেয়েও আধুনিক একজন নেতা হিসেবে নিৎসে যেমনভাবে রয়েছেন, যাকে তিনি তার বলয়ে যেমনভাবে অধিকার করে আছেন, আমার কাছেও তিনি (স্ট্রিন্ডবার্গ) ঠিক তেমনি। আর এটি আমার কাছে গর্বের বিষয় যে স্বম্ভবত তার চেতনা, এবারের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদানে অনুধ্যান হিসেবে কাজ করেছে যার সামান্য প্রাপ্তি হিসেবে তাকে খুশি করছে এবং গুরুর প্রতি অনুসারীদের অনেক বেশি না হলেও এটি যে সামান্য হলেও গুরুর প্রতি অনুগামীর সামান্য অর্ঘ, এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে আমি কৃতার্থ।
×