ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১

আনিসুর রহমান

আমার দেখা রাহমান ভাই

প্রকাশিত: ০৭:২৯, ২৬ অক্টোবর ২০১৮

আমার দেখা রাহমান ভাই

আমার জন্ম মধুপুর গড়াঞ্চলের ঝোপঝাড় ঘেরা এমন এক অজগ্রামে সেখানে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অন্য বইয়ের অস্তিত্ব কল্পনা করাও প্রায় অসম্ভব ছিল। আমি আমার ছেলেবেলার কথা বলছিলাম। আমাদের গ্রামের পাঠশালার পাট চুকিয়ে মধুপুর উপজেলা সদরেÑ আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় চার মাইল পায়ে হাঁটার পথ। খানাখন্দ ভরা লাল মাটির সেই পথ মাড়িয়ে মধুপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হবার পর প্রথম শামসুর রাহমান নামটির সঙ্গে পরিচয়। আমাদের বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বিশেষ করে বিধুভূষণ মজুমদার, বাহাজ উদ্দিন ফকির, শেখ মো. আবদুল জলিল, আবদুর রশিদ, আবদুল মান্নান, সাইদুল ইসলাম প্রমুখের উৎসাহ উদ্দীপনায় সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে বেশ অগ্রসর ছিল। তার ধারাবাহিকতায় মৌসুমী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় যতদূর মনে পড়ে শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’, সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কবিতার আবৃত্তি করে আমরা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়োিছলাম। ঐ সময় ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার চেয়ে ‘ছাড়পত্র’ আমাকে বেশি আকর্ষণ করেছিল। তারপর আমাদের বিদ্যালয়ের পাঠাগার থেকে সুকান্তের বইগুলো ধার করে পড়ে ফেলেছিলাম। এক্ষেত্রে আবদুল মান্নান স্যার আমাকে সাহায্য করেছিলেন। অই মৌসুমী প্রতিযোগিতার সাধারণ জ্ঞান বিভাগে একটা প্রশ্ন এসেছিলÑ ‘এলাটিং বেলাটিং’ বইটি কার লেখা। সৌভাগ্যক্রমে এ প্রতিযোগিতার দিন কয়েক ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার বিষয়ে বলতে গিয়ে বাহাজ স্যার শামসুর রাহমানের কয়েকটি বইয়ের নামও উল্লেখ করেছিলেন, তার মধ্যে ‘এলাটিং বেলাটিং’ বইটিও ছিল। এভাবেই আমাদের কবি শামসুর রাহমান নামটির সঙ্গে আমার পরিচয়। আমি ধরেই নিয়েছিলাম পাঠ্য বইয়ের অন্যান্য কবি যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম, কামিনী রায়, কুসুম কুমারী দেবীর মতো শামসুর রাহমানও পরলোকে। ঐ বয়সে এমন একটা ধারণা কবিতা গল্প যাদের লেখা তারা আর কেউ জীবিত নাই- তারা অনেক দূরের জগতের বাসিন্দা। বিধুভূষণ মজুমদার স্যারের কাছে জেনে গেলাম শামসুর রাহমান বেঁচে আছেন এবং ঢাকার জাতীয় কবিতা উৎসবের প্রবর্তক। তখন কল্পনার পাখা আরও বেড়ে গেলো- কবি আর কবিতার তাহলে উৎসবও হয়। কথা প্রসঙ্গে স্যার আরও জানালেনÑ ঐ কবিতা উৎসবের মঞ্চে একটা অধিবেশনের সভাপতিত্বকালে পটুয়া কামরুল হাসান ‘দেশ এখন বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে আছে’ কথা সমেত একটা স্কেচ আঁকার পরই মঞ্চে অসুস্থ হয়ে পড়েন এরং তারপর ইন্তেকাল করেন। এরপর ঢাকায় আসার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার আবাসন জহুরুল হক হলের আবাসিক অধ্যাপক কবি মুহাম্মদ সামাদ আমাদের সামাদ স্যারের মাধ্যমে প্রথম শামসুর রাহমানের সঙ্গে পরিচয়। এরপর নানা জায়গায় নানা উপলক্ষে এমনকি রাহমান ভাইয়ের বাসায় কয়েকবার দেখা, গল্প ও দীর্ঘ সময়ের আলাপের সুযোগ হয়েছিল। একদিন আলাপকালে বললেনÑ সাংবাদিকতা লেখালেখির জাতশত্রু। যদি লেখালেখি করতে চাও সাংবাদিকতা ভিন্ন অন্য পেশাই ভাল। আর নিতান্তই যদি পত্রিকায় কাজ করতে চাও তাহলে প্রতিদিন প্রতিবেদন বা সম্পাদকীয় লিখতে হয় এরকম কাজ নিও না। লেখা সম্পাদনা করা বা অন্য কোন কাজ করÑ তাহলে নিজস্ব লেখালেখির ক্ষতি হবে না। যে সময়টাতে রাহমান ভাইয়ের সঙ্গে আমার আলাপ পরিচয় সেটা ১৯৯৮-১৯৯৯ সেটা আমাদের রাহমান ভাইয়ের শেষ বেলা। তাকে কেন যেন সারাক্ষণ উৎকণ্ঠিত, উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত মনে হতো। তাঁকে মৃত্যু চিন্তাও পেয়ে বসেছিল। তিনি সারাক্ষণ চিন্তায় থাকতেন তিনি চলে গেলে তাঁর ছেলে, নাতি-নাতনি আর তাঁর স্ত্রী জোহরা রাহমানের কি হবে? তারা কি খাবে? কি করবে? ঐ বয়সেও রাহমান ভাই অনেকটা লেখালেখি করে সংসারের খরচ চালানোর চেষ্টা করতেন। একবার কথা প্রসঙ্গে বললেন জনকণ্ঠে তার নিয়মিত লেখা প্রকাশের কারণে প্রতিমাসে নির্দিষ্ট একটা টাকা পেয়ে থাকেনÑ এই টাকাটা তাঁর খুব কাজে আসে। ঐ সময় দৈনিক জনকণ্ঠে ‘কালের ধুলোয় লেখা’ নামে নিয়মিত একটা আত্মজীবনীমূলক লেখা লিখতেন। ঢাকায় রাহমান ভাইকে তাঁর শ্যামলীর বাসায় দেখার পূর্বে ১৯৯১ সালে মধুপুরের একটা ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে দেখেছিলাম। অই অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হয়ে গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানটা হয়েছিল রানী ভবানী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় নামে অন্য আরেকটি স্কুলে। আমি সেখানেই গিয়েছিলাম। আমি সেদিন দূর থেকে লাল টুকটুকে উজ্জ্বল মোহনীয় দর্শনধারী এক স্বপ্নের মানুষ, এক স্বপ্নের কবিকে দেখেছিলাম। কি অন্যরকম এক মুগ্ধতা। মানুষ দেখতে এত সুন্দর হয়। মানুষ এত সুন্দর করে কথা বলে? আমি একটু হোঁচটও খেলাম। কবি হতে হলে দেখতে এত সুন্দর হতে হয় বুঝি। কবি হতে হলে এত সুন্দর করে কথা বলতে হয় বুঝি। আমার তো এর কোনটাই নেই। তাহলে আমি কবি হবো কেমনে? এখানে উল্লেখ যে এর মধ্যে কবিতার পোকায় আমাকে পেয়ে বসেছে। বিদ্যালয় সাময়িকীতে কবিতা ছাপাই। ঐ একই বছর আমাদের বিদ্যালয়ের সামায়িকী ‘জাগরণ’ এর সম্পাদক মনোনীত হয়েছি। তাই আমাদের বিখ্যাত কবিকে দেখার জন্যে আরেক স্কুলে ছুটে যাওয়া। হোঁচট খেলেও রণে ভঙ্গ দিলাম না। মনে মনে ভাবি ঢাকার এই কবির সঙ্গে যদি কথা বলার সুযোগ হতো! শেষে স্বপ্ন হলো সত্যি। তিনি মানুষ হিসেবে ছিলেন খুব সরল, কঠিন এবং সহজ। মিথ্যা সহ্য করতেন না। একদিন আলাপকালে বললেনÑ আল মাহমুদের কবিতা ভাল। কিন্তু ‘ও’ মানুষটা খুব মিথ্যুক। আরেকদিন তার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেম নিয়ে বলতে গিয়ে বললেন, তিনি ছাত্রজীবনে প্রেমের সুযোগ পাননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের ছাত্র ছিলেন তিনি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক ছাত্রীর সঙ্গে প্রেম হয়েছিল। তাঁর প্রেমিকার শর্ত ছিল তাকে বিয়ে করতে হলে, সিএসপি (সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান) কর্মকর্তা হতে হবে। এটা কি আর হয়? রাহমান ভাইয়ের প্রথম প্রেমের ভাগ্য ছিল এরকমই। শেষতক প্রেমে রণে ভঙ্গ। তিনি কাল বিলম্ব না করে প্রেমের শোক সামলাতে জোহরা ভাবীকে বিয়ে করলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম ভাবীকে কেমনে আবিষ্কার করলেনÑ উনি বললেনÑ ওকে একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে দেখেছিলাম। ভাল লেগেছিল। রাহমান ভাই সাদামাটাভাবে সত্য বলে দিতেন। একবার নির্বাসন প্রসঙ্গে আলাপকালে আমি বললাম, দাউদ হায়দারও তো জার্মানিতে নির্বাসনে। রাহমান ভাই বললেনÑ ওকে দেশে আসতে বাধা দিয়েছে কে? ও দেশে এলেই পারে। ১৯৯০ দশকের শেষের দিকেÑ রাহমান ভাই লালন আখড়া রক্ষার আন্দোলনের পক্ষে ভূমিকা রেখেছিলেন। ওবায়দুল কাদের তখন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী। রাহমান ভাই বাংলা একাডেমির সভাপতি। এর কিছুদিন পর রাহমান ভাইয়ের স্থলে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে সভাপতি করা হলো। আমি আশা করেছিলাম অধ্যাপক আনিসুজ্জামান রাহমান ভাইয়ের পরিবর্তে সভাপতির আসন নিতে রাজি হবেন না। মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান রাহমান ভাইয়ের পদটা নিয়ে নিলেন। আমি মনে মনে একটা ধাক্কা খেলাম। কিন্তু রাহমান ভাই বাকি যে কয় বছর বেঁচে ছিলেন, এটা নিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করেননি। কষ্ট ও অভিমান আমি বুঝতে পেরেছিলাম। একবার ধানম-ির ২৭ নম্বরে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে প্রকাশিত ইংরেজী ভাষায় লেখালেখি করে এমন ১৭ জন কবির ইংরেজী কবিতা নিয়ে প্রকাশিত (১৭ বিসি) (১৭ ইঈ) গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে রাহমান ভাই প্রধান অতিথি। আমি দর্শকের সারিতে। রাহমান ভাই বক্তৃতা করতে গিয়ে অনেকটা বেলুন ফুটো করে দিলেন। বললেনÑ আপনারা যারা ঢাকায় বসে, ঢাকায় বাস করে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজীতে কবিতা লিখে গদগদ। আখেরে আপনারা কেউ কবি হবেন না। এখানে উল্লেখ্য যে এই প্রকাশনার সঙ্গে ভারতের সুদীপ সেন এবং বাংলাদেশের কায়সার হকও সংশ্লিষ্ট ছিলেন। আরেকবার আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ সবে যাত্রা শুরু করেছে। আসাদুজ্জামান নূর সভাপতি, হাসান আরিফ সম্পাদক, আবৃত্তিকারদের এক অনুষ্ঠানে রাহমান ভাই প্রধান অতিথি। তিনি রাখঢাক না রেখে বলে দিলেনÑ আবৃত্তি হচ্ছে পরের ধনে পোদ্দারি। এটা হাল আমলে আরও বেশি উপলব্ধি করলামÑ যখন আমাদের কবি নির্মলেন্দু গুণ খোদ মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেনÑ তিনি যেন গুণদার কবিতা আবৃত্তি না করেন। রাহমান ভাই একবার বললেন, যে কবিতা ভালবাসে, কবিতা লেখে সে খুনি হতে পারে না। কবিতার উছিলায় একবার তো খুনি চক্রই তাঁকে বাসায় গিয়ে হামলা করে বসেছিল। ভাগ্যিস জোহরা ভাবী টের পেয়েছিলেন এবং রাহমান ভাইকে প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন। রাহমান ভাইয়ের কথা ও সময়ের নড়চড় করতেন না। যা বলতেন, তা করতেন। আমার জানা মতে ঢাকা শহরের দুজন মানুষ দেওয়ানার মতো তাদের টেলিফোন দুটো পরের উপকারে ব্যস্ত রাখতেন একজন রাহমান ভাই, আরেকজন কবি বেলাল চৌধুরী আমাদের বেলাল ভাই। একবার আমার শিক্ষক কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের পঞ্চাশতম জন্মদিনের আয়োজন জাতীয় জাদুঘরে, আশরাফ স্যার চিন্তিত রাহমান ভাই সময় মতো আসতে পারবেন তো? কারণ একইদিনে গ্রীন রোডে একটা কলেজে রাহমান ভাইয়ের আরেকটা অনুষ্ঠান ছিল। আমি আশরাফ স্যারকে অভয় দিয়ে বললাম আপনি নিশ্চিত থাকুন রাহমান ভাই যখন বলেছেনÑ তখন তিনি সময় মতো এসে যাবেন। এই কথা স্যারকে বলে আমি গ্রীন রোডে চলে গেলাম রাহমান ভাইকে নিয়ে আসতে। আমি রাহমান ভাইর সামনে গিয়ে হাজির। বললাম আমি এসেছি আপনাকে আশরাফ স্যারের অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতে। আমাকে দেখে রাহমান ভাই এমন একটা হাসি দিলেন আমি সদা উৎকণ্ঠিত রাহমান ভাইয়ের চোখেমুখে এরকম উৎফুল্ল স্বতঃস্ফূর্ত হসিটি খুব একটা দেখিনি। এটাই ছিল রাহমান ভাইয়ের সঙ্গে আমার শেষ আলাপ। এরপর দুই একবার বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখেছি। সালাম কুশল বিনিময় হয়েছে। আলাপ আর হয়নি। ভাবতে অবাগ লাগে এরকম একজন দিকপাল আপাদমস্তক সরল সহজ নির্লোভ কবিতার স¤্রাট কবিতা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা; তিনি একবার বিদেশে; সেই সুযোগে আমাদের কবিরা গুটলি পাকিয়ে রাহমান ভাইকে বাদ দিয়ে কবিতা পরিষদের কমিটি করেছিল। কবিরাও পারে বটে? পদের এতই লোভ এবং লাভ? কবিরাও যদি ক্যু করে তাহলে সামরিক স্বৈরাচারীদের দোষ দিয়ে লাভ কি? রাহমান ভাই লজ্জায় অভিমানে চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। কবিতা পরিষদ মুখো হননি। শেষতক কবিদের বোধোদয় হয়েছিলÑ রাহমান ভাইর মান ভাঙ্গাতে সক্ষম হয়েছিলেন তাঁরা এবং রাহমান ভাইকে কবিতা উৎসবে ফিরিয়ে এনেছিলেন আমাদের কবিরা।
×