ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৯ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২

ঘরে বাইরে বিরুদ্ধতা

নাজনীন বেগম

প্রকাশিত: ০০:৩১, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ঘরে বাইরে বিরুদ্ধতা

একজন কন্যা পরিবারেই তার ভাইয়ের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্য পীড়িত হয়।

সমতাভিক্তিক সমাজ গঠন প্রক্রিয়া অত সহজ সাধ্য নয়। কারণ নারী-পুরুষের ফারাক, তারতম্য বিশ্ব সৃষ্টির প্রারম্ভিক সময় থেকেই। যে বিভেদ সমাজ সভ্যতাকে অসমতার বাতাবরণে আটকে দেয় তা সর্বযুগের, কালের এক অনধিগম্য কঠিন যাত্রা পথ। একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের মধ্যাহ্নে ও তার তেজোদ্দীপ্ত প্রখর দাবানল আজও সমসংখ্যককে জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়ার দুরবস্থায়। জন্মসূত্রেই যেন অবোধ  কন্যাটি সামাজিক অভিশাপকে আঁকড়ে ধরতে বাধ্য হয়।

সভ্যতা সূর্য কিরণ ছড়াতেও যেন বারবার অন্ধকার বলয়ে ডুবে যাচ্ছে। মানা যায় না। অনধিগম্য পথক্রমা কেন শিশুকন্যা থেকে একসময়ের পূর্ণ নারীর মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে যেন অবনতমস্তকে, ভীরু পায়ে সামাজিক রুদ্ধতার জাল ছিঁড়তেও পারে না। উন্নয়ন অভিগামিতায় অংশ নিয়েও সমান অধিকারে প্রাপ্য সম্মানটুকু পাওয়া যে কত দুরূহ পাথর ছড়ানো পথ। টপকানো ও কঠিন। বিভিন্ন প্রতিবাদ, প্রতিরোধই শুধু নয় অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও উঠে আসছে নারীর সমসম্মানের অধিকার আর ন্যায্যতা নারীরা। কিন্তু আজও ঘরেও বসে নেই। সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে শুধু পুরুষের সঙ্গেই নয় বরং প্রবৃদ্ধির হরেক জোয়ারে নিজস্ব সক্ষমতায়। তারপরও মানুষের মর্যাদায় যেতে কেন এত কাঠগড় পোড়াতে হচ্ছে? চিরায়ত প্রশ্নটির কোনো যথার্থ সমাধান আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে। 
উনবিংশ শতাব্দীর আধনিক পুরুষ বিদ্যাসাগরই প্রথম উদাত্ত কণ্ঠে আওয়াজ তুললেন কন্যাশিশুদের বিয়ের পিঁড়িতে নয়। বরং বই হাতে বিদ্যালয়ে পাঠানো সময়ের অনিবার্যতা। নিজ উদ্যেগে বালিকা বিদ্যালয় উন্মুক্ত করলেনÑনিরাপরাধ বালিকাদের বিদ্যা শিক্ষায় আগ্রহী করে তুলতে। কতখানি ফলপ্রসূ হয়েছেন? একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের মধ্যাহ্নেও আজ সরব কণ্ঠে কলতে হচ্ছে। একই পরিবারে পুত্র যেমন বই হাতে বিদ্যালয়ে যাবে সেখানে কন্যাটিকেও পাঠাতে হবে বিদ্যাশিক্ষা অর্জনে। কোনো ধর্মে কিংবা সামাজিক সংস্কারে নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে আদৌ কিছুই বলা হয়নি। 
গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকেই নারী শিক্ষার দ্বার উন্মোচন হয়। তারও আগে উনবিংশ শতকের মাঝামাঝিতে বিদ্যাসাগর ১৮৪৯ সালে কলকাতার বেথুন বিদ্যালয়ের দ্বার উন্মোচন করেন। আর এটাই ছিল উপমহাদেশের নারী শিক্ষার সর্বপ্রথম বিদ্যাপীঠ। পরবর্তীতে দ্বিতীয় নারী শিক্ষার দ্বার উন্মোচন হয় রাজশাহীর পিএন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। ক্রমান্বয়ে সেখানে জোয়ার আসলেও জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নারী শিক্ষা সেভাবে অবারিত না হওয়াও যুগের নির্মমতা। সেই জন্য আজও বাল্যবিয়ে রোধ আর অবোধ  বালিকাদের বিদ্যালয়ে পাঠানো নিয়ে লিখতে হচ্ছে, সরব উচ্চারণে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ অব্যাহত হয়েছে। সময়ের চাহিদায় নিষ্ঠুর পোষণ বিপন্ন যাত্রা পথ। 
ধর্মে যেখানে কোনো বাধা নেই, রাষ্ট্র পর্যন্ত কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরিই করে নাই তাহলে কেন এমন চিরায়ত দুর্ভোগ আধুনিকতার নির্মাল্যে ও অমাবস্যার অন্ধকারে আটকে দিচ্ছে।  তাহলে ধারণা করা অমূলক নয় পারিবারিক সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সমাজের আদি ও অকৃত্রিম প্রতিষ্ঠান পরিবারই জন্ম থেকেই কন্যা-পুত্রের বিভাজনকে মান্যতা দিচ্ছে না। যদিও বর্তমানে তা কমার দিকে। আইন, সংবিধান, রাষ্ট্র এবং ধর্ম যেখানে নারী-পুরুষের প্রবেদকে আমলেই নেয়নি সেখানে ক্ষুদ্র পরিবারিক আঙিনা কেন বৈষম্যের বাতাবরণে সব ঢেকে যাচ্ছে। 
বাল্য বিয়ে তো রয়েছেই কন্যার আর একটি ন্যায্য অধিকার পিতার সম্পত্তিতে বৈষম্য। ভাইয়ের তুলনায় সেভাবে অর্ধেক। আবার অন্যদিকে হরেক বিপত্তি। নারীরা স্বামীর সম্পত্তির ভাগীদার হলেও স্বামীরা স্ত্রীর সম্পত্তিতে তেমন অধিকার না পাওয়াও অন্যভাবে বৈষম্য তো জিইয়েই থাকে। 
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের এক প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয় একজন কন্যা পরিবারেই তার ভাইয়ের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্য পীড়িত হয়। যেমন সর্বংসহা জননীই নাকি বড় মাছ কিংবা মাংসের টুকরো পুত্রের পাতে দেন। আর অপেক্ষাকৃত ছোট টুকরো কন্যার পাতেই যায়। তবে আশ্বর্যের বিষয় মা নিজেই তার সহোদর ভাইটির সঙ্গে এমন তারতম্যের কবলে পড়েছেন। তেমন কষ্ট ভেতরের বোধে জিইয়ে থাকাও অপরিহার্য ছিল। কারণ কন্যাশিশুটি ক্রমান্বয়ে বয়; প্রাপ্ত হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসে পূর্ণ করেন। তবে সাংসারিক জীবনে মা ভুলেই যান শৈশবেÑভাইয়ের সঙ্গে তার ফারাক কষ্টদায়ক অনুভবও। তাকেও সহিবার পর দেখা যায় পুত্র-কন্যার প্রভেদ করতে। অর্থাৎ বিষয়টি বংশপরস্পরায় চলে আসা এক দীর্ঘ সময়ের শক্ত বাধা-বিপত্তি। 
তাই পরিবারই যে বিভাজন তৈরি করে তা আজও আলোর মুখ না দেখাও পারিবারিক সমস্যাই এখান থেকে মাকে বেরিয়ে আসতেই হবে। নবযুগের আধুনিক বলয়ের চাহিদায় নারীরা শিক্ষিতই শুধু নয় স্বাবলম্বী হয়ে পেশাগত জীবনও অবারিত করছে। শিক্ষিত এবং কর্মজীবী নারীর সংখ্যা আজ আর হাতেগোনার অবস্থাই নেই। সমান তালে এগিয়ে চলছে। কিন্তু ফারাক-তারতম্যের কোনো বিরাম বিরতি নেই। সব সময় বলা হচ্ছে পরিবারই প্রথম জায়গা  যেখানে কন্যাশিশু সমঅধিকারে বড় হবে। মাকেই সচেতন, সাবধানতায়, তীক্ষè বিবেচনায় কন্যার প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে হবে।

প্যানেল হু

×