এশিয়ায় ক্ষুদ্র বাংলাদেশ এখনো বাল্য বিয়ের শীর্ষস্থানে
আন্তর্জাতিক শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয় বৃহত্তর এশিয়ায় ক্ষুদ্র বাংলাদেশ এখনো বাল্য বিয়ের শীর্ষস্থানে। তবে নারীরা পিছিয়ে আছে তেমনটাও নয়। নারী শিক্ষার হার গত শতাব্দীর শেষ দশক থেকে একবিংশ শতাব্দির তৃতীয় দশকের মধ্যগগনে নারীরা শিক্ষিত হচ্ছে, বৈচিত্র্যময় পেশায় নিজেদের তৈরি করে এগিয়ে চলার দৃশ্য স্বস্তিদায়ক সন্দেহ নেই। কিন্তু সংখ্যায় স্বল্পতার কারণে কিছু ইতিবাচক অর্জন আড়ালে থেকে যাওয়াও যন্ত্রনাদায়ক পরিবেশ। উন্নয়ন অভিগামিতায় সমসংখ্যকের যথার্থ অংশগ্রহণ যৌক্তিক না হলে প্রবৃদ্ধি অধরাই থেকে যায়।
তাই অনেক অর্জন বিসর্জনের ঘেরাটোপে দৃশ্যমান পিছু হটা আর এক বেদনাঘন প্রতিবেশ। বাংলাদেশের সিংহভাগ প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়অয় সেখানে কন্যা শিশুর বিদ্যালয় গমন সেভাবে অবারিত নয়। আর এক অবরুদ্ধতার শিকল। যা এখনো ভাঙ্গা গেল না। যদিও ক্রমান্বয়ে কন্যা শিশুরা এখন বিদ্যালয়গামী হচ্ছে। তবে মাঝপথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়ার দৃশ্যও হতাশাব্যঞ্জক। আবার দরিদ্র পরিবারের পল্লী অঞ্চলের ছাত্রীদের জন্য সেটা আরও বিপন্নতার কঠিন বেষ্টনী। তবে গ্রামাঞ্চলে শিশু শিক্ষার হার বেড়েছে নিঃসন্দেহে। ঝরে পড়ার বিসদৃশ্যও দৃষ্টিকটু। শুধু যে কন্যা শিশু শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে তা নয় শিশু পুত্ররাও মাঝপথে ঝরে পড়ার অশনিসংকেত নানাভাবে শিশু শিক্ষার্থীদের জীবনকে থামিয়ে দিচ্ছে তাও এক বিষাদঘন দুরাবস্থা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দৃশ্যমান হচ্ছে উন্নয়ন অবকাঠামো তৈরিতে অমানবিক শিশু শ্রমের যে নিদারুণ যন্ত্রণা তা কাজে লাগছে দালানকোঠা তৈরিতে। যাদের বই হাতে বিদ্যালয়ে গমন করা কথা তারা কেউ কনের সাজে বিয়ের পিঁড়িতে বসছে। কেউবা অবকাঠামো নির্মাণের ইট, বালি, সিমেন্টের বস্তা মাথায় নিয়ে খ-কালীন শ্রমে নিযুক্ত হচ্ছে। তাই শুধু কি বাল্য বিয়ে? দরিদ্র শিশুরা অভাব অনটনে কঠিন শ্রমে জড়িয়ে পড়া ও উন্নয়ন বাংলাদেশের খ-িত নয় বরং বিষদৃশ্য এক অমানবিক বলয়। উন্নয়ন কাঠামোয়, নগর-শহর কেন্দ্রিক সুদৃশ্য দালান কোঠা, কল কারখানার আধুনিক দৃশ্য প্রতীয়মান হচ্ছে। পাশাপাশি নগর শহরের চারপাশে বস্তি এলাকাও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অসহনীয় এক দুর্বিপাক।
যা বিজ্ঞানী নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্রের মতো। প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে যা শুধুই বিজ্ঞান কিংবা গবেষণাগারের সত্য তথ্য কিংবা তত্ত্ব নয়। বাস্তব জীবনেরও এক কঠিন কঠোর কষাঘাত। সমস্যা এবং বিষয়টা নতুন কিছু নয়। যুগ যুগান্তরের এক অবিনাশী দুর্ভোগ। স্বৈরাচার পতনের যে গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলন তা কতটা দৃশ্যমান কিংবা আড়ালে আবডালে সেটাও যেন বিষাদঘন কালো আধার। স্বৈরাচার পিছু হটলেও কাঠামোর গভীর নিগড়ে আটকে পড়া বহু অপসংস্কার, অপঘাত আজো নিভৃতে জিইয়ে আছে।
উল্লেখ করছি সমাজবিজ্ঞানী অগবানের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সারবত্তা। যন্ত্র যত তাড়াতাড়ি মানুষের আয়ত্তে আসে চিন্তা, চেতনা, মানসিকতা, সেভাবে এগিয়ে যায় না। ফলে বিজ্ঞান আর চেতনার মাঝখানে ফারাক তৈরি হয়। যাকে বলা হচ্ছে সংস্কৃতির প্রতীকমূলক উপাদানের পশ্চাদবর্তিতা। যা সমাজের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে প্রযোজ্য। বিজ্ঞানের মতো সমাজ-মানুষ তথ্য, চিরসত্য তেমন কিছুই নয়। সমাজ আপেক্ষিক। আর ব্যক্তি মানুষের চেতনাও কোনো কিছুতেই মেপে সমানে সমান করা যায় না।
পরিবর্তনশীল সমাজ ও সময়ের গতিতে আধুনিকতার নির্মাল্যে বদলায়, পবির্তন হয়। তাকে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি ও আর এক দূরবর্তী বিষয়। তাই বাল্য বিয়ে, শিশু শ্রম আর বিদ্যালয় থেকে মাঝপথে ঝরে পড়া শিশু শিক্ষার্থীর বিষয়ও সেভাবে মূল্যায়ন করা আসলে কঠিন। আর আমাদের মতো রক্ষণশীল সমাজের জন্য ততোধিক দুর্ভেদ্য। যেখানে সিংহভাগ বিপরীত ¯্রােতের কোপানলে পড়ে সমসংখ্যক নারী আর কোমলমতি শিশুরা। যারা মায়ের স্বাস্থ্য যাপিত জীবনের সঙ্গে এক সূত্রে বাধা থাকে। বিচ্ছিন্ন করার কোনো উপায়ই নেই। তথ্য-উপাত্ত যা নির্দেশ করে তা শিহরিত হওয়ার মতো। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন জানাচ্ছে এক কন্যা শিশুর গর্ভে আর এক শিশুর ভ্রƒণ তৈরি হচ্ছে। শিহরিত হওয়ার মতোই।
এমন সব চিরায়ত সামাজিক দুর্বিপাককে হটাতে গেলে শিশু শিক্ষা অত্যাবশ্যক। কন্যা-পুত্র সকলের জন্য। আর সেটা করতে হবে আদি ও অকৃত্রিম প্রতিষ্ঠান পরিবার থেকেই। নতুন বাংলাদেশ গঠন প্রক্রিয়ায় তা আমলে নেওয়াও সময়ের অপরিহার্যতা। বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলনের পর থেকে চিরায়ত ফারাক-বিভেদ সামনে এসে যাচ্ছে।
অপরাজিতা প্রতিবেদক
প্যানেল হু








