ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৯ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২

নারী ভোটার

নাজনীন বেগম

প্রকাশিত: ২৩:৩১, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

নারী ভোটার

নারী ভোটার

বাংলাদেশ সমতাভিত্তিক সমাজ তৈরিতে এগিয়ে চলার দৃশ্য স্বস্তিদায়ক। যে কোনো সমাজের সমান সংখ্যকের যে কোনো সংখ্যা পিছু হটলে প্রবৃদ্ধি ও অংশত: এবং বৈষম্যের ঘেরাটোপে আটকে যাওয়া অসম্ভŸ কিছু নয়। ২০২৪-এর জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছিল বৈষম্যবিরোধী বিপ্লবের সফল এবং অনিবার্য পরিণতি। শারীরিক ও মানসিকভাবে অপেক্ষাকৃত কোমল নারীরা স্নেহে মায়ায় মমতায় মাতৃত্বের আভরণে শৌর্য বীর্যের আধার। আর প্রেমে, পূজায়, নিবেদনে সমপর্ণের যে আকুলতা তাও নারী শক্তির অন্য আলোয় ভিন্নমাত্রার স্ততির চিরস্থায়ী অবগাহনের বিধাতার পরম বরমাল্য।

এত নারী শৌর্যের সৃষ্টির দ্যোতনায় নিত্য যাপনের অভাবনীয় রূপকল্প। এ ছাড়াও আছে কর্মে সামাজিক বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকতায় সংসার-সংস্কারের শাশ্বত উৎসর্গিত দিন যাপন। এর ব্যত্যয় সাধারণত না হওয়া নিয়মের অধীন। নারী তার সহজতা কর্ম প্রক্রিয়ায় যেমন আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা একইভাবে সামাজিক দায়বদ্ধতায়ও সেভাবে পিছু না হটা পরিবেশ পরিস্থিতির ভারসাম্য। 
আর সামাজিক নাগরিক হিসেবে নারীকে পালন করতে হয় প্রাসঙ্গিক আরও কিছু দায়িত্ব। নাগরিকের ৫ মৌলিক অধিকার নারীর ও প্রাপ্য। আইন, সংবিধান যার মান্যতা দিয়েছে। এত প্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা সামনে অপেক্ষা করছে একটি অংশগ্রহণমূলক সর্বদলীয় নিরপেক্ষ নির্বাচন। সঙ্গত কারণে নারীরাও সচেতন দায়বদ্ধতায় অপেক্ষমাণ অংশগ্রহণের নৈতিক অধিকারে। সেখানে নেতৃত্ব আর ক্ষমতায়ন নারী সমাজের সহজাত সক্ষমতা এবং প্রবৃত্তি। 
তবে বিভিন্ন তথ্য উপাত্তে দেখা গেছে নারীদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতার ঘাটতিÑপুরুষের তুলনায়। তবে বিভিন্ন কলেজের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী সংসদ নির্বাচন দৃশ্যমান এক বাস্তবতা। এমনকি বৈষম্যবিরোধী ’২৪ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীদের সম্মুখ সারিতে অংশ নেওয়া এক বিরাট সমতা ভিত্তিক শিক্ষার্থী তৈরি হওয়া এবং আন্দোলন সংগ্রামে অধিকার, বঞ্চনা, শোষণের  নিরিখে ঝাঁপিয়ে পড়া আজ আর আড়ালে আবডালে থাকছেই না। তাই রাজনৈতিক নেচতনায় পিছিয়ে পড়া নারীরা এখন সরব, মুখরিত কণ্ঠে তাদের ন্যায্য দাবি পেশ করতে সামনের দিকে ছুটে আসছেন। ভবিষ্যতে তা আরও বাড়ার উদিত সম্ভাবনা। 
রাজনীতি সচেতন হাতে গেলে সবার আগে জরুরি শিক্ষার সময়োচিত কার্যক্রম। সেই চিরায়ত প্রবাদ বারবার স্মরণে বরণে আনলেও তার আবেদন অক্ষয় ঐশ্বর্য। 
নেপোলিয়ানের ভাষায়-আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও একটি সুন্দর ও যোগ্যতম জাতি উপহার দেওয়া সময়ের ব্যাপার। গত শতাব্দীর শেষ কয়েক দশক থেকে নারী শিক্ষা চালুই শুধু ধীরে ধীরে অবারিত হয়ে জাতির মেরুদ-কে শক্ত অবস্থানে নিয়ে আসাও দেশের এক অভাবনীয় অর্জন। তবে শুধু নারী শিক্ষালয় রাজনীতিতে ও নারীদের অংশগ্রহণ হলেও সমসংখ্যক সংসদীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া নতুন সময়ের নব অবগাহন। তার পরেও বিপদ বিপত্তি পদে পদে কাঁটা বিছিয়েই যাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়তেও সময় লাগছে না। যাদের শিক্ষা কার্যক্রমই পূর্ণতা পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় তাদের আবার দেশ, সমাজ আর মানুষ নিয়ে ভাবার অবকাশই বা কোথায়?

যে দেশে আজও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডি আর বিএর এক অনুসন্ধান গবেষণায় দুঃখজনকভাবে দৃশ্যমান হয় প্রতি চারজন শিশু-কিশোরীর মধ্যে ৩ জনই শুধু বাল্যবিয়ে নয় অপরিণত মাতৃত্বের ও অকাল বোধনে পড়ে যাচ্ছে। যাদের প্রজনন স্বাস্থ্য কোনোভাবেই অনুকূলে থাকেই না বিয়ে কিংবা সন্তান ধারণের জন্য। আরও কত অপঘাত অবোধ বালিকাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাও মান্ধাতা আমলের স্বেচ্ছাচার তো বটেই। বলা হচ্ছে এক কন্যার গর্ভে আর এক শিশুর ভ্রƒণ বেড়ে উঠছে। শিউরে ওঠার মতো দুর্ভোগ, দুঃসহ কোপানল। বৃহত্তর এশিয়ায় ক্ষুদ্র বাংলাদেশ নাকি বাল্যবিয়ের শীর্ষে। ভাবাই যায় না। দারুণ এক অসহনীয় পারিবারিক, সামাজিক অভিশাপের কালো ছায়া। প্রতিকারের ওপর বিভিন্নভাবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে অভিমত পরামর্শ আসলেও বাস্তবে কোনো ফলপ্রসূ কার্যক্রম আজ অবধি ধরাছোঁয়ার বাইরে।

যে সর্বংসহা জননী অসচ্ছলতার কারণে তার কন্যা শিশুটিকে বধূ বেশে সাজাচ্ছেনÑ তিনি নিজেও এক সময় বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছেন। বাধা বিপত্তি নিজে যেমন প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন তার কন্যা শিশুটির বাল্যবিয়েতে প্রমাণ করলেনÑ তিনি নিজেও অক্ষম, অযোগ্য, শক্তিহীন তার গর্ভের কবি শিশু কন্যাটি কি করে বিয়ের সাজে সজ্জিত হয়। মা-ই যদি ঠেকাতে ব্যর্থতার পরিচয় দেন তাহলে গতানুগতিক সমাজ সংস্কার অবোধ শিশুকন্যাটিকে সুরক্ষিত রাখতে কি উপায় অবলম্বন করতে পারে? বহুবার উত্থাপন করা চিরায়ত দুর্ভাগা প্রশ্ন? পরামর্শও সেই চিরস্থায়ী উপদেশ-নির্দেশ। পরিবারই শুধু নয় গর্ভধারিণী মাই হবে তার সুরক্ষার কবচ। যা সভ্যতার মধ্য গগনে ও মধ্যযুগীয় পাশবিকতা, অমানবিকতা মনুষ্যত্বের অপমান-অপঘাতের মতো আজও ক্ষতচিহ্ন হয়ে দগদগে ঘায়ে আবর্তিত।

অবসান কবে হবে? তাও সুদূরপরাহত? সভ্যতা যখন মধ্যগগনে আলোকিত ঝর্ণাধারাকে দৃশ্যমান করছেÑ তখন অমানিশার ঘোর তমসাচ্ছন্ন রজনী কেন কালো অপছায়াকে অপসৃত করতে পিছু হটছেÑ তেমন প্রশ্ন আজ আর অজানা বিস্ময় নয়। সূর্যালোকের মতো স্পষ্ট, প্রতিভাত। পরিবারই ত্রাণ কর্তা। পরবর্তীতে সমাজ সংস্কার চলমান অপসংস্কৃতি।

প্যানেল হু

×