জয়শ্রীর জয় ॥ টিউশনি থেকে হাঁসের খামার
নাম ঠিকানা একেকজনের আলাদা হলেও একেকজন নারীর জীবনে যখন অভাব অনটন আর কষ্টগুলো অক্টোপাসের মতো চেপে ধরে তখন সেই দুঃখগুলো আলাদা করা যায় না। সেই নারীদের কষ্টের গল্পগুলো মিলে যায়। এমনই এক গৃহবধূ জয়শ্রী রায়। স্বামীর ঘরে এসে অভাব অনটনে কোনো কোনো দিন না খেয়ে দিন পার করার কষ্টগুলো আজ জয়শ্রীর কাছে ইতিহাসের স্মৃতিপটে গেঁথে রয়েছে। সেই বেদনাদায়ক দিনগুলো এখন সুখের ঠিকানার পথ দেখিয়ে দিয়েছে। আজ জয়শ্রী লাখোপতি ও স্বাবলম্বী। বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিউশনি করিয়ে হাঁসের খামার গড়ে জয়শ্রী জয় করেছে জীবনের কষ্ট ও দুঃখগুলোকে। স্বামীর বাড়ির ভাঙ্গা চাইটের ঘর এখন পাকা করেছে জয়শ্রী। আর আয়ের টাকায় জমি কিনেছেন তিনি।
উত্তরাঞ্চলের বাহের দেশ বলে পরিচিত রংপুর অঞ্চলের নীলফামারীর কিশোরীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ সিঙ্গেরগাড়ী গ্রামে মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম জয়শ্রী রায়ের। তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট। ২০১৮ সালে এইচএসসি পাস করার পর তাঁর বিয়ে হয়। বলতে গেলে বেকার স্বামীর সংসারে এসে অনাহার-অর্ধাহারে থাকতে হতো। প্রতিজ্ঞা করেন দারিদ্র্র দূর করবেন। সেই প্রতিজ্ঞা থেকে আয়ের উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। সেই ভাবনা থেকে গৃহশিক্ষকতা শুরু করেন। জয়শ্রী জানাল এটি ছয় বছর আগের কথা।
বিয়ের পর স্বামীর ঘরে অভাবটা আমার পছন্দের শাড়ি-চুরির শখ পূরণ করতে পারেনি। কষ্টকর দিন ছিল। স্বামীর ঘরে ভাগ্যকে মেনে নিয়ে দারিদ্র্য দূর করতে স্বামীর গ্রামে গৃহশিক্ষকতা শুরু করেন। ধীরে ধীরে রাত-দিন পরিশ্রম করে গড়ে তোলেন হাঁসের খামার। এখন সেই হাঁস তাঁর সংসারে হাসি ফিরিয়ে এনেছে জয়শ্রীর জীবনের বড় জয়।
জয়শ্রীর স্বামীর বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের পলাশবাড়ী গ্রামে। ওই গ্রামের মিন্টু চন্দ্র রায়ের স্ত্রী তিনি। হাঁসের খামার থেকে এখন জয়শ্রী মাসে ৯০ হাজার টাকা আয় করছেন। মেধা ও শ্রম দিয়ে শুধু একার দিন বদলাননি। তাঁর দেখানো পথ ধরে আশপাশের গ্রামের অনেকের জীবন বদলে গেছে।
জয়শ্রী রায় জানান, এক বছর শিক্ষকতা করে ৩০ হাজার টাকার মতো জমান। সেই টাকা দিয়ে হাঁস-মুরগি ও ছাগল কেনেন। কিন্তু এরপরও অভাব যাচ্ছিল না। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে সেই গ্রামের একজনের কাছে হাঁস পালনের কৌশল শেখেন।
এরপর বাবার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ির পাশে ঘর করেন। পরে ২০ হাজার টাকায় ৫০০ হাঁসের বাচ্চা কিনে খামার শুরু করেন। চার মাসের মধ্যে হাঁস ডিম দেওয়া শুরু করে। এক বছর ডিম বিক্রি করে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা আয় হয়। তাঁর আয় দেখে স্বামীও তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। ডিম বিক্রির টাকায় আরও এক হাজার হাঁসের বাচ্চা কেনেন। এভাবে তিনি সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন।
জয়শ্রী রায় বলেন, এখন তিনটি খামারে তিন হাজার হাঁস আছে। দুজন শ্রমিক নিয়মিত খামারে কাজ করেন। বর্তমান তাঁর মাসিক আয় ৯০ হাজার টাকা। আয়ের টাকায় জমি কিনেছেন। বাড়ি পাকা করেছেন।
এলাকার অনেকে এখন তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে আসেন। নিজের সংসারে সচ্ছলতা আনার পাশাপাশি গ্রামে তাঁর মতো বিপদে পড়া অন্য গৃহবধূর নানা পরামর্শ দেন জয়শ্রী রায়। তাঁর দেখাদেখি কুর্শা ইউনিয়নের অনেক গৃহবধূ হাঁস পালন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। শুধু নারীরা নন, গ্রামের অনেক বেকার তরুণও জয়শ্রীর দেখানো পথে হাঁস পালন করে বেকারত্ব ঘুচিয়েছেন। জয়শ্রী রায়ের পরামর্শে হাঁস পালন করে অনেকের সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। হাঁসের খামার করে তাঁর মতো তারাগঞ্জের আবদুর রহিম, সাইফুল ইসলাম, হাজিরহাট গ্রামের মশিউর রহমান, পলাশবাড়ী গ্রামের অজিত চন্দ্র, মোফাজ্জল হোসেন, মেনহাজুল ইসলামসহ আরও অনেকে দারিদ্র্যকে জয় করেছেন।
গ্রামের গৃহবধূ আসমা খাতুন বলেন, দিনমজুর স্বামীর আয় দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর। এখন জয়শ্রী রায়ের খামারে কাজ করি, বাড়িতে ১০০ হাঁস পালি। এসব দিয়ে তেল-সাবনের খরচ হয়ে যায়। সংসারে কোনো ঝামেলা নাই।
তারাগঞ্জ প্রাণিস¤পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, জয়শ্রী রায়ের খামার ও তাঁর কার্যক্রম আমি দেখেছি। তিনি একজন দক্ষ খামারি। নিজের সন্তানের মতো হাঁসগুলো পরিচর্যা করেন। তাঁকে দেখে গ্রামের অনেক নারী-পুরুষ হাঁস পালনে উৎসাহিত হয়েছেন।
প্যানেল হু








