ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২৮ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

অভিভাবকহীন কন্যাশিশুর পরিবার

সোহেলি সুহী

প্রকাশিত: ০১:৫৭, ১৯ এপ্রিল ২০২৪

অভিভাবকহীন কন্যাশিশুর পরিবার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার তিতাসপাড়ায় অবস্থিত সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা)

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার তিতাসপাড়ায় অবস্থিত সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা)। মোট আসন সংখ্যা ১০০টি। ১০০টি আসনেই মেয়েরা আছে যাদের প্রত্যেকের মা-বাবা অথবা বাবা কিংবা আইনগত বৈধ অভিভাবক নেই।  গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এতিম এবং আইনগত বৈধ অভিভাবকহীন শিশুদের পারিবারিক আবহে লালন-পালন করার নিমিত্তে দেশের ৬৪টি জেলাতেই স্থাপন করেছে সরকারি শিশু পরিবার যা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত।

ছেলে এবং মেয়েদের জন্য আলাদা আলাদা শিশু পরিবার। এখানে ছেলে মেয়েরা ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত থাকতে পারে। তবে ক্ষেত্র বিশেষে পড়াশোনা বা অন্য কোনো অনিবার্য কারণে কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমোদন সাপেক্ষে ১৮ বছরের বেশি বয়সী ছেলে মেয়েরাও প্রতিষ্ঠানগুলোতে থাকার সুযোগ পায়। এখানে পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের সামাজিকতা, ধর্মীয় ও নৈতিকতাও শেখানো হয়। বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টাও পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া শিশু পরিবার যেন প্রতিষ্ঠানটি ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অদম্য’।  

উদ্যোগ এবং নাম দুটোর নেপথ্য কারিগর প্রতিষ্ঠানটির উপতত্ত্বাবধায়ক রওশন আরা। ২০১২ সালে বিসিএস নন-ক্যাডার থেকে তিনি সমাজসেবা অফিসার হিসেবে যোগ দেন সমাজসেবা অধিদপ্তরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিভৃতচারী এই নারী অফিসার নিজেকে কখনোই সেভাবে মেলে ধরতে পছন্দ করেন না। আড়ালে থেকে গাছের শেকড় যেমন সারা বৃক্ষ পল্লবে রস-জল পৌঁছে দেয় তিনি ঠিক তেমন নিজেকে আড়ালে রেখে অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে যাচ্ছেন।

মাত্র কয়েক মাসের নিরলস প্রচেষ্টায় শক্তভাবে দাঁড় করিয়েছেন সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিবাসীদের দ্বারা পরিচালিত পোশাক ব্র্যান্ড ‘অদম্য’-কে। প্রতিষ্ঠানের সামনে বিশাল মাঠে শাড়ি, পাঞ্জাবি নিয়ে কাজে ব্যস্ত দেখা যায় শিশু পরিবারের মেয়েদের। কেউ কেউ নিজ কক্ষে সেলাই মেশিনে ব্যস্ত,  কেউ কেউ সুই সুতা নিয়ে ব্যস্ত।  রঙিন কাপড়ে সুই-সুতার সুনিপুণ কারুকার্য শোভিত করে দিচ্ছে শাড়ির আঁচল।  এখানে সব মেয়েদের বয়স ৬ থেকে ১৮ বছর।

১৫ থেকে ১৮ বছরের ২০-২৫ জন মেয়েকে নিয়েই মূলত অদম্যের যাত্রা।  শুরুটা কিভাবে, জানতে চাইলে উপতত্ত্বাবধায়ক রওশন আরা জানান,  ২০২৩ সালের আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের দিকে সমাজকর্মী জয়া বার্লিন প্রতিষ্ঠানটিতে আসেন। তিনি মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে বলেন, তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত মেয়েদের সাহায্য করবেন না যতক্ষণ না মেয়েরা নিজেদের নিজেরা সহায়তা করছে। তার কথাতেই স্পষ্ট যে, তিনি চাচ্ছেন সাময়িক সহায়তা না করে মেয়েদের স্বাবলম্বী করতে।

বিষয়টি রওশন আরার চিন্তা-চেতনায় বিশাল প্রভাব ফেলে। জয়া বার্লিন একজন বিদেশী নাগরিক হয়ে এ দেশের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য ভাবতে পারলে তিনি কেন পারবেন না। সামগ্রিক ভাবনা আর নিজের দায়বদ্ধতা থেকে তাড়িত হয়ে উদ্যোগ নেন মেয়েদের স্বাবলম্বী করার।  ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি শিশু পরিবারে প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে উপতত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সোশিয়লজি বিষয়ে পড়াশোনা করা রওশন আরা। এর আগে গাইবান্ধা সরকারি শিশু পরিবারে উপতত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালন করছেন।

 হাসিমুখে জানালেন এক যুগের চাকরির প্রায় সাড়ে ৭ বছরই কাজ করে যাচ্ছেন সরকারি শিশু পরিবার প্রতিষ্ঠানগুলোতে। ফলে অভিজ্ঞতার ঝুলিও বেশ সমৃদ্ধ। আগে থেকেই সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানগুলো চালু আছে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ ট্রেডের।  রওশন আরা সেই প্রশিক্ষণ ট্রেডগুলোতে যোগ করেন ভিন্ন মাত্রা। ইউটিউব ভিডিও দেখে দেখে, কখনো বা স্বল্প সময়ের জন্য প্রশিক্ষক দ্বারা প্রতিষ্ঠানের মেয়েদের শেখাতে থাকেন সেলাই কাজ, ফাস্ট ফুড, কম্পিউটার ইত্যাদি।  

তাঁর কাজের ধরনও নিজস্ব উদ্ভাবিত। প্রথমে ইউটিউব দেখে বা প্রশিক্ষকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠানের বড় মেয়েরা সেলাই কাজ শেখে। পরবর্তী সময়ে তারাই প্রশিক্ষক হয়ে অন্যান্য মেয়েদের শেখাচ্ছে। শুধু ইউটিউব দেখেই মেয়েরা প্রায় ৪০ ধরনের সেলাই কাজ শিখেছে বলে জানালেন তিনি। ডিজিটাল মাধ্যমের কার্যকর ব্যবহার বৈকি! ‘অদম্য’ নামের উদ্যোগ নেওয়ার আগে রওশন আরাকে যে বেশ পরিশ্রম করতে হয়েছে সেটা অকপটেই বললেন। বিভিন্ন অনলাইন পেজগুলোতে চোখ রাখা, শাড়ি পাঞ্জাবির ডিজাইন দেখা, কিভাবে মার্কেটিং করতে হবে সে বিষয়ে পড়াশোনাসহ ব্যস্ততম সময় কেটেছে এসব নিয়ে।

এক কন্যা সন্তানের জননী তিনি যদিও তার কাছে শিশু পরিবারের ১০০টি সন্তানই তাঁর। তাই সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে এতটুকু কষ্ট মেনে নিয়েছেন হাসিমুখে। এম্বোডারির ডিজাইনগুলো আপাতত তিনিই দেখে দিচ্ছেন। অনেক সময় মেয়েরাও সুন্দর সুন্দর ডিজাইন তৈরি করে তাঁকে  দেখায়। মেয়েদের আগ্রহ তাঁর অনুপ্রেরণা আরও বাড়িয়ে দেয়। অদম্য-র যাত্রা শুরুর আগে রওশন আরা বেশ কিছু প্রস্তুতি নিয়েছিলেন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে।

যেহেতু আগে থেকেই মেয়েরা ইউটিউব দেখে বিভিন্ন ধরনের সেলাই কাজ পারতো তাই ব্লক,  বাটিক আর এম্বোডারি কাজ শেখানোর জন্য একজন প্রশিক্ষক নিযুক্ত করা হয়। প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময়ে মেয়েদের চোখে মুখে নতুন কিছু করার প্রত্যয় আর আগ্রহ তাঁর সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দেয়। নিজে ঢাকায় গিয়ে কিনে নিয়ে আসেন শাড়ি পাঞ্জাবিসহ যাবতীয় উপকরণ। যাত্রা শুরু হয় অদম্য।  স্মার্ট ব্যবসায়ের কৌশল হিসেবে অদম্য নামে খোলেন ফেসবুক পেজ। পুরো বিষয় তিনি একাই নিয়ন্ত্রণ করেন।

অদম্যের লক্ষ্য ও  উদ্দেশ্য নিয়ে জানতে চাইলে রওশন আরা ইস্পাত সমান  দৃঢ়তা নিয়ে বলেন যে, শিশু পরিবার প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুবিধাবঞ্চিত ছেলে মেয়েরা ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত থাকতে পারে? এরপর তাদের ফিরে যেতে হয়। কিন্তু ফিরে গিয়ে তারা কি করবে, কোথা থেকে শুরু করবে এসব বিষয়ে অনেক সময় বুঝে উঠতে পারে না এবং দিকনির্দেশনাও পায় না। ফলে, সদাশয় সরকার যে উদ্দেশ্যে তাদের লালন-পালন করতে এত অর্থ ও শ্রম দিচ্ছে তার সর্বোচ্চ কার্যকারিতা দৃশ্যমান হয় না।

অদম্যে যেসব মেয়েরা কাজ করছে তারা সবাই ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে। প্রায় ৩ থেকে ৪ বছর তারা সরাসরি এ ব্যবসায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকছে, নিজে ডিজাইন  তৈরি করে তা দিয়ে শাড়ি পাঞ্জাবি তৈরি করছে, সেলাই কাজ করছে। তাদের অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী শক্তি সমৃদ্ধ হচ্ছে।  তারা প্রতিষ্ঠান থেকে চলে যাওয়ার পর খুব সহজেই নিজস্ব ব্লক বাটিকের ব্যবসায় দাঁড় করাতে পারবে কিংবা নিজেরা প্রশিক্ষক হয়ে অন্যদের ব্লক বাটিকের কাজ শেখাতে পারবে।

 ফলস্বরূপ তারা নিজেরা স্বাবলম্বী তো হবেই উপরন্তু দেশ ও সমাজের জন্য সম্পদ হয়ে উঠবে। এ উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আন্তরিক সহযোগিতা আর উৎসাহের কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করলেন। বললেন,  অদম্য থেকে পণ্য নেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগণ। অদম্যকে এগিয়ে নিতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক থেকে স্থানীয় জেলা প্রশাসন,  জেলা সমাজসেবা কার্যালয়, শুরু করে সকলের অবদান ও অনুপ্রেরণা তাঁকে সামনে চলার ছন্দ এনে দেয়। সেই সঙ্গে সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন বুননে অদম্য হতে পারে দিশারী।

×