ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১০ ডিসেম্বর ২০২৩, ২৬ অগ্রাহায়ণ ১৪৩০

সুন্দরবনে ‘বনবাস’

শোয়েব মাহমুদ

প্রকাশিত: ২০:৪৫, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩

সুন্দরবনে ‘বনবাস’

.

সুন্দরবনে ঘুরতে যাওয়া বলতেই আমরা বুঝি / দিনের জন্য শিপে চড়ে ভেসে বেড়ানো। আমরা এবার প্রথাগত সেই পথে যাইনি। সুন্দরবনের গহীনে একটা ক্যানেলের পাশে গড়ে ওঠা বনবাসে দারুণ দুটো দিন কাটিয়ে এলাম।

ঢাকা থেকে একদম সকালের ফার্স্ট ট্রিপের বাসে মংলা পৌঁছাতে ঘণ্টা চারেক সময় লাগল। এরপর একটা জালিবোটে করে রওনা হলাম বনবাসের উদ্দেশে। পশুর নদী দিয়ে আমাদের বোট এগিয়ে যাচ্ছিল। চারপাশের গ্রামীণ প্রকৃতি দেখতে দেখতে নিমিষেই বাসজার্নির ক্লান্তি গায়েব হয়ে গেল। শরতের আকাশে তখন নানারকম রঙের খেলা। ক্ষণে ক্ষণে সেই রঙ বদলাচ্ছে। কখনো মেঘের ঘনঘটা। আবার পরক্ষণেই ঝকঝকে নীল সাদা আকাশ। বেশ কিছুক্ষণ পর পশুর নদীর মূল চ্যানেল ছেড়ে আমরা সুন্দরবনের ক্যানেলে ঢুকে পড়লাম। আঁকাবাঁকা ক্যানেলের দুপাশে ঘন সবুজ জঙ্গল। প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের বোট রাইড শেষে আমরা পৌঁছে গেলাম বনবাসে। প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ করল বনবাস। যেন জলের উপর বসতি! মংলার দাকোপ এলাকায় ঢাংমারি খালের একপারে এই ইকো রিসোর্টটা গড়ে তোলা হয়েছে। আর ঠিক ওপারেই সুন্দরবন। আগেকার দিনে সাধারণত কাউকে জোর করে বনবাসে পাঠানো হতো। কিন্তু আমরা বনবাসে এসেছি স্বেচ্ছায়, মনের সুখে!

এখানে ২টা ক্যাটাগরির মোট ৫টা কটেজ আছে- ডুপ্লেক্স ভিলা আর এসি ভিলা। সুন্দরি, গোলপাতাসহ আরও নানারকম গাছ-গাছালি বেষ্টিত কাঠের তৈরি ওয়াক ওয়ে পেরিয়ে প্রতিটা কটেজে যেতে হয়। কাঠের তৈরি এই কটেজগুলোর কাঠামো এবং এর অন্দরমহলের সবকিছুতেই নান্দনিকতার ছোঁয়া স্পষ্ট। প্রতিটা কটেজের বারান্দায় দড়ি দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি একটা বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে বসে ক্যানেল আর সুন্দরবনের যে সৌন্দর্য দেখা যায়, সেটা মনোমুগ্ধকর। বনবাসের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা হলো এর ডাইনিং আর এর সামনের জায়গাটুকু। এখানে দোলনাসহ বেশ কয়েকটা সুন্দর বসার জায়গা করা হয়েছে। যেখানে বসে চারপাশের প্রকৃতি দেখতে দেখতে একটা অলস দিন অনায়াসে পার করে দেওয়া যায়। আমাদের দুপুরের খাওয়ার মেন্যুতে ভাত, আলু ভর্তা, সবজি আর ডালের সঙ্গে ছিল চুই ঝাল দিয়ে রাজহাঁস ভুনা। জঙ্গলে সন্ধ্যা নামে ঝুপ করে। আকাশে তখন কোটি কোটি তারার মেলা। বনের মাথার ওপরে একটা বাঁকা চাঁদ উঠেছে। ঝিঁঝিঁ পোকা, তক্ষক আর ব্যাঙেরা অনর্গল ডাকছে। বুনো হাওয়া বইছিল চারপাশে। সন্ধ্যায় বারবিকিউর আয়োজন ছিল। তারপর গল্প আড্ডায় রাত হয়ে গেল।

রাতের খাবারে ছিল ভাত, সবজি, ডাল আর চুই ঝাল দিয়ে বিফ। খেয়ে দেয়ে আরেকদফা আড্ডা দিয়ে বেশ রাত করে ঘুমাতে গেলাম। আগের রাতে ঘুমাতে দেরি হলেও ভোরে ঘুম থেকে উঠতে ভুল হলো না। সকালের স্নিগ্ধ পরিবেশে চারপাশটা বেশ সুন্দর লাগছিল। সকালের নাস্তা সারতে সারতেই বৃষ্টি নেমে এলো। টিপটিপ বৃষ্টি না, মুষলধারে বৃষ্টি। গতকাল থেকে বনবাসের যে সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছি, বৃষ্টি স্না জঙ্গলের সৌন্দর্য যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের মধ্যে রকম দারুণ পরিবেশে দুটো দিন কাটানোর চমৎকার অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরলাম।