ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

জুয়েল আশরাফ

একটি কুঁড়ে ঘরের গল্প

প্রকাশিত: ২২:৩৪, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

একটি কুঁড়ে ঘরের গল্প

মাটিপাড়া গ্রামে থাকত আয়ান নামে একটি ছেলে। সে খুব দুষ্টু। তার ব্যাপারে অভিযোগের অন্ত নেই। লোকজন অভিযোগ করে তার বাবা মায়ের কাছে। আয়ানের বাবা আয়ানকে স্কুলে পাঠাল, কিন্তু তার দুষ্টুমি শিক্ষকদেরও খুব সমস্যা করল। শিক্ষকদের কোন কথা তার ওপর কোন প্রভাব পড়ল না। অনেক সময় আয়ান বিষ পিঁপড়া ধরে এনে বেঞ্চের ওপর রেখে দেয়, যাতে কেউ ঠিকমতো পড়তে না পারে। ছাত্ররা শিক্ষকদের কাছে তার ভয়ে তার দুষ্টামি সম্পর্কে অভিযোগ করতে পারত না। একদিন বিরক্ত হয়ে হেডমাস্টার তাকে স্কুল থেকে বের করে দিল। আয়ানদের গ্রামটি ঘন বন দিয়ে ঘেরা। চারদিকে প্রচুর গাছ-গাছালি। সে বনে গিয়ে গাছপালায় বসে থাকে। মাঝে মাঝে ধানক্ষেতে পানি দিয়ে সেচ দেয়। বাড়িতে থাকতে তার ভাল লাগে না। মা তাকে নিয়ে খুবই চিন্তিত। এক বৃদ্ধ লোক আয়ানের গ্রামে ভিক্ষা করতে আসতো। সে তাকে খুব বিরক্ত করত। কখনও তার ব্যাগ ছিনিয়ে নিত, তার মধ্যে রাখা রুটি বের করে পশুপাখিদের খাওয়াত, কখনও কখনও সে বৃদ্ধের গায়ে পানিও ঢেলে দিত। কিন্তু বুড়ো তারপরও গ্রামে আসতো। লোকজন তাকে জিজ্ঞাসা করত যে, কেন সে এই গ্রামে এসে ভিক্ষা করতে আসে এতটা বিরক্ত হয়েও? লোকটি সবাইকে একই উত্তর দিত, আয়ান একজন শিশুবালক। বাচ্চারা দুষ্টামি করবে না, তাহলে কি আমরা বড়রা করব? তার কথা শুনে মানুষ চুপ হয়ে যেত। এভাবে কয়েক মাস কেটে গেল। একদিন আয়ান একটি গ্রাম থেকে আসছিল। বাড়ি পৌঁছানোর তাড়া ছিল তার। একজন কৃষক তার ফসল রক্ষার জন্য ক্ষেতের চারপাশে কাঁটা তারের বেড়া দিয়েছিল। পথে কাঁটা পড়ে ছিল। তার চোখ পড়ল সেই কাঁটার দিকে। সে ভাবল যে, সে একটি বা দুটি কাঁটা নিয়ে রাস্তায় রাখবে, তাহলে খুব মজা হবে। সে দুটি কাঁটা তুলে নিয়ে ঘাসের নিচে লুকিয়ে রাখল। তারপর বাড়ি চলে গেল। দুই-তিন দিন কেটে গেল। আজ আয়ান নিজেও একই পথে যাচ্ছিল। একজন বৃদ্ধ ভিক্ষুকও একই পথ ধরে আসছিল। আয়ান বলল, আমাকে ব্যাগটি দেখাও। ভিক্ষুক তাকে ব্যাগটি দিল। ব্যাগের মধ্যে একটি ছেঁড়া লুঙ্গি ছিল। এছাড়া দুটি রুটি ছিল। সে ব্যাগ নিয়ে দুষ্টুমি করতে লাগল যে, এখন সে ব্যাগ দেবে না। ভিক্ষুক তার কাছে এলে সে দৌড়ে কিছুক্ষণের জন্য পালিয়ে গেল। এই দৌড়ে হঠাৎ আয়ানের খালি পায়ের নিচে কাঁটা পড়ে গেল। কাঁটা তার পায়ের অনেকটা বিঁধল। সে হঠাৎ একপাশে গড়িয়ে গেল। ব্যাগ তার হাত থেকে পড়ে গেল। ভিক্ষুক আয়ানের কাছে এলো। সেখানে সে তার লাঠি দিয়ে ঘাস সরিয়ে দিল, তারপর সে আরেকটি কাঁটা দেখতে পেল। তার হাতের লাঠি দিয়ে সরিয়ে দিল এবং আয়ানের পাশে বসে পা থেকে কাঁটা তুলতে লাগল। ভিক্ষুক আয়ানের পা থেকে অনেক কাঁটা সরিয়ে দিল। তারপরও পায়ে কিছু কাঁটা ছিল। ভিক্ষুক তাকে আশ্বস্ত করছিল এবং তাকে দাঁড় করাল। আয়ান বলল, আমি বাড়ি যাব না। গাছের ছায়ায় বসে পায়ের সব কাঁটা তুলব, তারপর বাড়ি ফিরব। ভিক্ষুক বলল, তুমি যদি আমার সঙ্গে আমার ঘরে যাও, তাহলে আমি তোমার পায়ের সমস্ত চোরাকাঁটা বের করে দেব। আমি এমন একটি মলম লাগাব যাতে তোমার পা শীঘ্রই সেরে উঠবে। আয়ান যেতে রাজি হলো। ভিক্ষুক কাঁধে ভর দিয়ে তাকে কুঁড়েঘরে নিয়ে এলো। মেঝেতে একটি পুরনো পাটি এবং ছেঁড়া লেপ পড়ে ছিল। তার ওপর সে আয়ানকে শুইয়ে দিল। সে পানি গরম করে পা ধুয়ে দিল। তারপর কাঁটা বের করে পায়ে ওষুধ লাগাল। লেপের ওপর শুয়ে আয়ান খুব স্বস্তি আর আরাম পাচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ঘুমিয়ে পড়ল। ভিক্ষুক তার ব্যাগ থেকে ভিক্ষার চাল বের করে খিচুড়ি রান্না করল। তারপর সে গ্রামে গিয়ে দুধ নিয়ে এলো। সে আয়ানকে খিচুড়ি খাওয়াল এবং তাকে গরম দুধ দিল। আয়ান এখন সেই ভিক্ষুককে বুড়ো বলতে লজ্জা পেল। সে ভিক্ষুককে ‘দাদা’ বলে ডাকল। ‘দাদা’ শুনে ভিক্ষুকের চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল। আয়ান বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি কাঁদছ কেন? ভিক্ষুক বলল, না খোকা, এটা কোন ব্যাপার না। আমি এখানে ত্রিশ বছর ধরে একা আছি। তুমি আমাকে দাদা বলেছ, তাই আমার হৃদয় ভরে গেল। আয়ান বলল, না দাদা, এখন তোমাকে ভিক্ষা করতে হবে না। আমি তোমাকে খাওয়াব। ভিক্ষুক হেসে চুপ করে গেল। সন্ধ্যা হতে চলল। ভিক্ষুক আয়ানের পা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে দিল। এখন তার পায়ে একটি কাঁটাও নেই। এরপর ভিক্ষুক এসে তাকে গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে দিল। আয়ান দৌড়ে বাড়িতে এসে ভাত আর তরকারি নিয়ে এলো। বলল, দাদা, রাতে এটা খেয়ে নিও। আমি কাল সকালে আসব। ভিক্ষুক বাড়ি ফিরে গেল। যেতে যেতে ভাবছিল আয়ান কী সুন্দর ছেলে! আয়ান পরের দিন উঠে একজন কৃষককে বলল, যদি তোমার কোন কাজের লোকের প্রয়োজন হয়, আমি তোমার কাজ করে দেব। কৃষকের একজন শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সে আয়ানকে দুষ্টু ছেলে হিসেবে জানত। সে আয়ানকে বলল, তুমি যদি দুষ্টুমি না করো তবেই তুমি কাজ পাবে। আয়ান বলল, আজ আমাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নাও চাচা, দেখো, তারপর তুমি জানতে পারবে। কৃষক বলল, ঠিক আছে, চলো কাজে যাই। আয়ান সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করল। বদলে যাওয়া আয়ানকে দেখে কৃষক খুব অবাক হলো। সে আয়ানকে মজুরি হিসেবে তিন সের চাল দিল। চাল নিয়ে ভিক্ষুকের কুঁড়েঘরে পৌঁছে গেল আয়ান। ভিক্ষুক খাবার রান্না করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। চাল দেখে সে বলল, আয়ান! এই চাল নিয়ে গিয়ে তোমার মাকে দাও। আল্লাহ আমাকে খাওয়াচ্ছেন। না দাদা! তুমি এই চাল রাখো। আমি সারা দিন কাজ করে এই উপার্জন করেছি। যদি তুমি না রাখো, তাহলে আমি কাল থেকে কাজ করব না। দুষ্টামি শুরু করব। আয়ান সেদিন থেকে বদলে গেল। এখন সে সবাইকে সাহায্য করার চেষ্টা করে। গ্রামের সবাই তার খুব প্রশংসা করছে।
×