ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

ড. চিত্তরঞ্জন দাশ

বালটিক সাগর থেকে রকি মাউন্টেন

প্রকাশিত: ০৬:৩৩, ২ ডিসেম্বর ২০১৬

বালটিক সাগর থেকে রকি মাউন্টেন

লন্ডনে হাতেগোনা যে কয়টি পরিবারের সঙ্গে আমাদের ওঠাবসা তার মধ্যে অনুপ কুমার পাল আর সুতপা বৌদির নাম বিশেষভাবে মনে আসে। অনুপ বাবুর সঙ্গে পরিচয়টাও আকস্মিকভাবে। এখন থেকে বারো বছরেরও আগের ঘটনা। সবে বিলেতে এসেছি তানজানিয়ায় জাতিসংঘের চাকরির ইতি টেনে, এদেশে স্থায়ী নিবাস গড়ার অভিপ্রায়ে। এ পর্যন্ত যতটুকু বিদ্যা বুদ্ধি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি তাতে করে এদেশে করে খাওয়ার মতো একটা বিদ্যাই কাজে লাগে আর তা হলো অভিবাসন আইন ব্যবসা। সেই সুবাদে মি. পালের সঙ্গে পরিচয়। তার এদেশে আসা, পারিবারিক বন্ধুত। শেষ পর্যন্ত বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়তে এসে ঠেকেছে। এক চায়ের আড্ডায় তিনি জানালেন তারা দুই পরিবার, অর্থাৎ তার অগ্রজ ডাঃ উৎপল কুমার পাল যিনি স্টকহোমে সপরিবারে বসবাস করেন, তারা মিলে ক্রুজ শিপে স্টকহোম থেকে ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকি যাবেন। সংবাদটা খুবই লোভনীয় তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আমরা কেন বাদ পড়লাম, একটু অধিকারের সুরেই কথাটা বলে ফেললাম। সফরটা ছিল তাদের দুই ভাই ও দুই পরিবারের একান্তই পারিবারিক এবং অনেকদিন আগে থেকেই এই সফরের সব ব্যবস্থা ঠিক করা ছিল। কিন্তু ভেবে দেখলাম অধিকারের জায়গা থেকে একটু অনধিকার চর্চা না করলে এমন একটা সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। উপরন্ত এদিকের পরিবারের অনাগ্রহটা আমাকে আরও আগ্রহী করে তুলল। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম যে করেই হোক ক্রুজ জাহাজে বিলাসভ্রমণ করতেই হবে, তবে জাহাজে চড়ে যতটা পারা যায় দুরুত্ব বজায় রেখে চলার চেষ্টা করব। অনুপ বাবুর সূত্রেই ডাক্তার দাদার সঙ্গে আমার পরিচয়। ইতোমধ্যে দু-দুবার স্কটহোম বেড়িয়ে আসতে ভুল করিনি। একবার তার বড় মেয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রিত অতিথি হয়ে আর একবার হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের সম্মেলনে যোগ দিতে। এবার নিয়ে তৃতীয়। এদিকটাতে কোন রকম যোগাযোগ না করেই সরাসরি ডাক্তার দাদার শরণাপন্ন হলাম। বললাম এ যাত্রায় আমরা আপনাদের সঙ্গ দিতে চাই বা আপনাদের সঙ্গ আমরা নিতে চাই যদি তেমন কোন অসুবিধা না হয়। তবে শর্ত হচ্ছে অনুপ দাদা বা সুতপা বৌদিকে কোন ক্রমে আমরা যে যাচ্ছি সে কথাটি জানানো চলবে না। তাদের একটা সারপ্রাইজ দিতে চাই। আমার প্রস্তাব শুনে ডাক্তার দাদা ভীষণ খুশি হলেন বললেন- অতি উত্তম প্রস্তাব কিন্তু অফারের টিকেট এখন আর পাওয়া যাবে না। বেশি মূল্য দিয়ে টিকেট কাটতে হবে। অভয় দিলাম সেটাতে কোন অসুবিধা নেই আপনি টিকেটের ব্যবস্থা করে ফেলুন। এখানে শ্রদ্ধেয় ডাক্তার উৎপল কুমার পালের একটি বিশেষ পরিচয় না দিলেই নয়। তিনি মানব দেহের নানা জটিল রোগ তত্ত্বের গবেষণা ও নিরাময়ের পাশাপাশি মানব হৃদয়ের সহজ সরল, প্রেম ভালবাসা, জটিল, কুটিল ব্যবচ্ছেদেও সমান পারদর্শী এবং তাঁর লেখার হাতটি চমৎকার। তিনি বললেন- ভালই হবে আপনার লেখার নতুন আর একটি বিষয় যে যোগ হবে। বিলাসী নৌবিহারের সকল আয়োজন সম্পন্ন হয়ে গেল অতি দ্রুততার সঙ্গে। সাধারণ সিøপিং স্যুটের সকল আসনের টিকেট অনেক আগেই বুক হয়ে গেছে তাই আমাদের ব্যবস্থা হয়েছে জাহাজের বিলাসী ডিলাক্স স্যুটে। অর্থাৎ এই বয়সে আর একবার হানিমুন হবে বালটিক সাগরের অকূল দরিয়ায়। এদিকে আমরা প্রস্তুতি নিয়ে রাখলাম অনুপ দাদারা যেদিন স্কটহোমে যাবেন তার একদিন আগেই ওখানে গিয়ে তাদের অভ্যর্থনা জানানোর। যথরীতি আমাদের যাত্রা শুরু হলো। সময় স্বল্পতার কারণে সবখানেই একটু বাড়তি ঝামেলা যে পোহাতে হবে সেটা মেনে নিয়েই আমাদের অভিযানের শুভযাত্রা। লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর থেকে মাত্র দুই ঘণ্টায় স্টকহোম পৌঁছান যায়। একটু অধিক রাত্রে আমাদের স্টকহোমের আরল্যান্ডা বিমানবন্দরে অবতরণের নির্ধারিত সময়। সারা দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে ক্লান্ত শরীরে ডাক্তার দাদা নিজেই ড্রাইভ করে বিমানবন্দরে হাজির হয়েছেন স্টকহোমে আমাদের স্বাগত জানাতে। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সেরে বাইরে এসে মশিউল আলম ভাইকে দেখে একটু অবাকই হলাম। বুঝতে আর বাকি রইল না এত রাত্রে দাদা একা না এসে আলম ভাইকে সঙ্গে এনেছেন। আলম ভাইকে আমার বউএর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েই বললাম ছিপ-বর্শি সঙ্গে নিয়ে এসছেন? চলেন এখান থেকে সরাসরি মাছ মারতে যাই। এই সেই আলম ভাই যিনি স্টকহোমে আমার মাছ ধরার গুরু। আলম ভাই বললেন-আপনারা যে সফরের উদ্দেশ্যে এসেছেন সেটা আগে শেষ করেন তারপর মাছ ধরা যাবে। আলম ভাইয়ে সঙ্গে মাছ ধরার অভিজ্ঞতাটা একটু ভিন্ন। সেবার স্টকহোমে এসেছি ডাক্তার দাদার বড়মেয়ে তোয়ার বিয়েতে। তোয়া ওরফে দিশাখী পাল। তোয়া নিজেও ডাক্তার। তোয়ার বিয়ে হয়েছে তারই পছন্দ করা স্প্যানিস ইঞ্জিনিয়ার ছেলে অস্কারের সঙ্গে। সে প্রসঙ্গ পরবর্তী কোন পরিসরে আলোকপাত করব। জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের সকল আনুষ্ঠানিকতা উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের মূর্ছনায় কন্যাপক্ষের পক্ষ থেকে গত রাতেই শেষ হয়ে গেছে। বিদেশ বিভুঁইয়ে সেই স্টকহোমে সম্পূর্ণ বাঙালী রীতিনীতি মেনে সকল রকম উপকরণাদি জোগাড় করে এমন বিয়ের আয়োজন যে করা যায় সেটা অনেকের ভাবনারও অতীত। কোন কিছুতে কোন রকম ত্রুটি রাখেননি ডাক্তার দাদা ও চিত্রা বৌদি। স্প্যানিস ছেলেকে বাঙালী বানিয়ে ধূতি টোপর পরিয়ে বিয়ের মন্ত্র ইংরাজীতে অনুবাদ করিয়ে, তাকে রীতিমতো সংস্কৃত উচ্চারণের ট্রেনিং দিয়ে তবেই না বিয়ে হয়েছে। তবে ভুলে গেলে চলবে না অতিথি আপ্যায়নে ভোজনবিলাসীদের রসনাতৃপ্তির জন্য কোন কিছুতেই কৃপণতা করা হয়নি। মাঝে মাঝে এমন রসনাতৃপ্তির ব্যবস্থা হলে মন্দ হয় না। আজ পাত্রপক্ষের পক্ষ থেকে স্বল্পপরিসরে শুধু কন্যার পরিবার ও তাদের বিদেশী আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে স্থানীয় একটা হোটেলে নৈশ ভোজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু আমার মন পড়ে আছে মৎস্য শিকারে যাওয়ার জন্য আলম ভাইয়ের ডাক কখন আসবে সেই প্রতীক্ষায়। আমার ইচ্ছা রথ দেখে কলা বেঁচে তবে ঘরে ফেরা। অবশ্য সব সময় মন ভরে রথ দেখতে গেলে কলা যে বেঁচা হয় না, সেই দুর্ঘটনা ঘটে গেল সেদিন। রথ ঠিকমতো দেখা হলো কিন্তু কলা আর বেঁচা গেল না। আলম ভাই ঠিক সময়ই আমাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন মৎস্য শিকারে। মৎস্য শিকারের স্পটটা একটু দুরুত্বে হওয়ার কারণে কিছুটা সময় পথিমধ্যেই রয়ে গেল। তবে যখন মৎস্য শিকার শুরু করলাম তখন আর কোন কিছুতেই মন বাঁধা রইল না। শুধু মাছ আর মাছ। এক একবার সর্বাধিক আটটা করে মাছ উঠতে লাগল। অর্থাৎ যতগুলো বর্শি ততগুলো মাছ। সেদিন অল্পসময়ের মধ্যে দশ কেজি মাছ ধরেছিলাম। সেই মাছ ধরতে গিয়ে ধরতে পারলাম না ভোজন বিলাসের লগ্ন। তাই মশিউল আলম ভাইকে যখনই এয়ার পোর্টে দেখলাম সঙ্গে সঙ্গেই মৎস্য শিকারের সেই দৃশ্য মানষপটে জ্বলজ্বল করে উঠল। স্টকহোমে ডাক্তার দাদার সহধর্মিণী চিত্রা বৌদি, তিনি আমাদের নেত্রীও বটে, বৌদি আবার আদর আপ্যায়ন ও খানা পিনাতে কোন রকম ত্রুটি তিনি মানতে পারেন না, তাই অতি সযতনে অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত সময় পার করছেন আর আমি প্রহর গুনছি তারই বাগানে পরম যত্নে লালিত পালিত গোলাপ ফুলের মু-ু পাত করে তারই দেবর জাকে অভ্যর্থনা জানাতে। অবশ্য তারা সারপ্রাইজড হলেন কিনা বোঝা গেল না। তার কারণ হতে পারে, হয় তারা আগে থেকেই জেনে ফেলেছেন যে আমরাও নৌবিহারে তাদের সঙ্গী হচ্ছি, না হয় অন্যকিছু। তবে এখন আর ও সব ভাবনার সময় নেই। নৌবিহারটা উপভোগ করতে চাই সকলে মিলে প্রাণভরে।