ইসরাইলের পুলিশ সদর দপ্তরে ইরানের ড্রোন হামলার পর ধোঁয়া উড়ছে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন বলে মন্তব্য করেছেন ঊর্ধ্বতন সিনেটর ক্রিস মারফি। ইরানে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যকে এক দ্রুত অবনতিশীল সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এই ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর। এদিকে যুদ্ধের ১৬তম দিনে রবিবার ব্যাপক হামলা ঠেকানোর কথা জানিয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন। এছাড়া ইরানের হামলায় কুয়েতের রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টরের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে ইসরাইলের। যার ফলে রবিবার ইসরাইলের পুলিশ সদর দপ্তরে ড্রোন হামলা চালায় ইরান। অন্যদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান নিয়ে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) বলেছে, যদি শিশুদের হত্যা করা অপরাধী নেতানিয়াহু বেঁচে থাকে তবে পূর্ণ শক্তি দিয়ে তাকে খুঁজে বের করে হত্যা করা হবে। এদিকে লেবানন-ইসরাইল সীমান্তে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইসরাইলি সেনাদের লক্ষ্য করে নতুন করে একর পর এক রকেট হামলা চালিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান পরিস্থিতির মধ্যে রবিবার নিজেদের যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর খবর নাকচ করে দিয়েছে ফ্রান্স ও জাপান। খবর বিবিসি, আলজাজিরা ও ইরনার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কয়েকটি পোস্টে ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর মারফি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই যুদ্ধ এরই মধ্যে এই অঞ্চলকে সহিংসতার চক্রে ঠেলে দিয়েছে। এটি এখন স্পষ্ট যে ট্রাম্প এ যুদ্ধের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। ইরানের পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা সম্পর্কে তিনি অনেক ভুল ধারণা করেছিলেন। গোটা অঞ্চলে এখন আগুন জ্বলছে। মারফি বলেন, প্রথম সংকটটি চলছে হরমুজ প্রণালি ঘিরে। এটি অত্যন্ত সরু নৌপথ, যেখান দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের ২০ শতাংশেরও বেশি পরিবহন হয়। ইরানের এ সমুদ্রপথটি বিঘ্নিত করার সক্ষমতাকে খাটো করে দেখেছিল ওয়াশিংটন। তিনি বলেন, ট্রাম্প মনে করেছিলেন ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করবে না। তিনি ভুল ধারণা করেছিলেন। আর এখন তেলের দাম বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, যে ইরানের ড্রোন, স্পিডবোট এবং সমুদ্র মাইন হরমুজের জলপথকে অনিরাপদ করে তুলেছে এবং এগুলো নির্মূল করা অসম্ভব। হরমুজের পর দ্বিতীয় সংকট হিসেবে মারফি আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। ইরানের হামলার আশঙ্কায় রবিবার বাহরাইনে সাইরেন বেজেছে, অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর জানিয়ে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাজধানী রিয়াদ ও দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের আকাশে ১০টি ড্রোন প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ রবিবার জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৬টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্তত ৩৪টি ড্রোন প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে।
ইরান পুনরায় উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর তাদের হামলা শুরু করার পর এ ঘটনা ঘটে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সের পৃথক পোস্টে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, প্রিন্স সুলতান এয়ার বেস অবস্থিত আল-খারজ এলাকায় সব ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। অধিকাংশ ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে, যেখানে বড় বড় তেল শোধনাগার অবস্থিত। এছাড়া কিছু ড্রোন রিয়াদ অঞ্চলেও ভূপাতিত করা হয়েছে। ইরানের অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বর্ষণ অভিযানের অংশ ছিল এ হামলাগুলো। দিনের বেলা কয়েক ঘণ্টা শান্ত থাকার পর প্রতি সন্ধ্যায় পুনরায় হামলা চালানোর একটি নির্দিষ্ট ধরন লক্ষ করা গেছে। এই সহিংসতার প্রভাব সৌদির সীমানা ছাড়িয়ে অন্য দেশেও বিস্তৃত হয়েছে। রবিবার ভোরে বাহরাইনের রাজধানী মানামার আকাশে বিস্ফোরণের আলো দেখা গেছে। বাহরাইন কর্তৃপক্ষ জানায়, ইরানের এ অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে তারা ১২৫টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২০৩টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। এ হামলায় বাহরাইনে ২ জন এবং প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে আরও ২৪ জন নিহত হয়েছেন। কুয়েতে ন্যাশনাল গার্ডের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাদান ফাদেল রবিবার ভোরে জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী ৫টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। কুয়েতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানায়, ড্রোন হামলায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রাডার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই সেখানে সব ধরনের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রবিবার জানায়, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকির মোকাবিলা করছে। শনিবার তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ৯টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৩টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। দুবাই মিডিয়া অফিস এক্সে পোস্ট করে জানায়, মেরিনা ও আল-সুফুহ এলাকায় শোনা শব্দগুলো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সফল প্রতিরোধের ফলাফল ছিল।
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইসরাইলের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টরের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরাইল জানিয়েছে, তাদের কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এ বিষয়ে অবগত মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদ ওয়েবসাইট সেমাফোর। গণহত্যাকারী ইসরাইল ও তাদের সহযোগী যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের সমুচিত জবাব দিয়ে যাচ্ছে ইরান। কোনো বিশ্রামের সুযোগ দিচ্ছে না ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সেনারা। এরই মধ্যে রবিবার যুদ্ধ গড়িয়েছে ১৬তম দিনে। এদিন উগ্র ইহুদিবাদী ভূখণ্ডটি লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইরান।
এবার তারা ইসরাইলের পুলিশ সদর দপ্তর ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্রকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রবিবার সকালে তাদের বাহিনী ইসরাইলের বিশেষ পুলিশ ইউনিট লাহাভ ৪৩৩-এর সদর দপ্তর এবং গিলাত প্রতিরক্ষা স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র লক্ষ্য করে শক্তিশালী ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে বিবৃতিতে লক্ষ্যবস্তুগুলোর সঠিক অবস্থান বা হামলার ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য জরুরি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যত দ্রুত সম্ভব বাণিজ্যিক ফ্লাইটের মাধ্যমে দেশত্যাগের জন্য এই বিশেষ সতর্কবার্তায় অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হত্যার অঙ্গীকার করেছে ইরান। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। যদিও তার কার্যালয় বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে বলেছে নেতানিয়াহু ভালো আছেন। এরই মধ্যে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্যবস্তু করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। রবিবার এক বিবৃতিতে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) বলেছে, যদি শিশুদের হত্যা করা অপরাধী বেঁচে থাকে তবে আমরা তাকে পূর্ণ শক্তি দিয়ে খুঁজে বের করে হত্যা করব। এদিকে লেবানন-ইসরাইল সীমান্তে চলমান উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়ে ইসরাইলি সেনাদের লক্ষ্য করে নতুন করে রকেট ও কামান থেকে গোলাবর্ষণ করেছে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। রবিবার ভোররাত থেকেই সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে এ হামলা চালানো হয় বলে গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা ইসরাইলের কফার ইউভাল বসতির উত্তরে অবস্থিত কাফ হিল সাইটে মোতায়েন করা ইসরাইলি সেনাদের লক্ষ্য করে একঝাঁক রকেট নিক্ষেপ করেছে। এই হামলার কিছুক্ষণ পরই লেবাননের সীমান্তসংলগ্ন শহর মেইস আল-জাবালের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত জিবিয়া পয়েন্টে অবস্থানরত ইসরাইলি সেনাদের ওপর কামান থেকে ব্যাপক গোলাবর্ষণ করা হয়। দক্ষিণ লেবাননের একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ইসরাইলি বিমান হামলায় ১২ জন চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন। ১৫ দিন আগে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে শুরু হওয়া আঞ্চলিক যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেবাননেও ইসরাইলি আগ্রাসন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
প্যানেল / জোবায়ের








