ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

ইবি অধ্যাপককে মারধর, মহাসড়ক অবরোধ

ইবি সংবাদদাতা 

প্রকাশিত: ১৫:৩১, ৮ জুন ২০২৩

ইবি অধ্যাপককে মারধর, মহাসড়ক অবরোধ

শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক অবরোধ।

ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজারের কাছে ‘নালিশ’ করার অভিযোগ তুলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) এক অধ্যাপককে মারধর করেছেন এক ব্যাংক কর্মকর্তা। গতকাল বুধবার ভোর ৬টার দিকে কুষ্টিয়ার আবাসিক এলাকা সংলগ্ন কৃষি কলেজের সামনে এ ঘটনা ঘটে। ভূক্তভোগী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আল-হাদিস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। 

ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে বৃহস্পতিবার (৮ জুন) সকাল ৯টায় কুষ্টিয়া খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। পরে সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বরত প্রক্টর ড. শফিকুল ইসলাম বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিলে তারা অবরোধ তুলে নেন। অভিযুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তা সোহেল মাহমুদ অগ্রণী ব্যাংক, কুষ্টিয়ার চৌড়হাস শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার। 

অবরোধ তুলে নিয়ে শিক্ষার্থীরা ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। এ সময়ের মধ্যে হামলাকারীকে গ্রেপ্তার না করলে তারা আরও কঠোর কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারি দেন। এদিকে, ঘণ্টাব্যাপী এই অবরোধে কয়েক কিলোমিটারের জানজটের সৃষ্টি হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, হামলাকারীকে অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার, অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে ব্যাংক থেকে অব্যাহতি, হামলাকারীকে বিচারের আওতায় না আনা পর্যন্ত অগ্রণী ব্যাংক ইবি শাখা বন্ধ রাখা।

দায়িত্বরত প্রক্টর শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের দাবির সাথে একমত। এ রকম ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের জন্য অপমানজনক। আমরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেছি। তাদের দাবিগুলো আমরা লিখিত আকারে চেয়েছি। আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিষয়টির সমাধানের আশ্বাস দিলে তারা আন্দোলন স্থগিত করে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বুধবার ভোর ৬টার দিকে হাটতে বের হলে ইবি শিক্ষক ড. মোস্তাফিজের উপর অতর্কিত হামলা চালান তারই প্রতিবেশী এক ব্যাংক কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তা অগ্রণী ব্যাংক কুষ্টিয়া জেলার চৌড়হাস ব্রাঞ্চের কর্মরত রয়েছেন। তারা উভয়েই হাউজিং ডি ব্লক এলাকায় বসবাস করেন। এ ঘটনায় ‘পরিবার নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন’ উল্লেখ করে পৃথকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, প্রক্টর ও রেজিস্ট্রার বরবার লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ড. মোস্তাফিজ।

এ বিষয়ে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. তপন কুমার জোদ্দার বলেন, ‘লিখিত অভিযোগটি পেয়েছি। আমরা ইতিমধ্যে অনেকের সাথে কথা বলেছি। সমিতির পক্ষ থেকে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’

অভিযোগপত্র সূত্রে, প্রতিদিনের মতো ভোরে বাসার পাশে রাস্তায় হাটছিলেন ড. মোস্তাফিজ। বুধবার কুষ্টিয়া কৃষি কলেজের সামনে তার প্রতিবেশী সোহেল মাহমুদ তাকে দেখা মাত্রই অতর্কিত হামলা চালায় এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। সেখান থেকে তিনি কোনোরকম নিজেকে রক্ষা করে অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান ও অধ্যাপক ড. আব্দুল বারীকে ফোন করে জানান। তারা বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে জানালে সহকারী প্রক্টর ড. শাহেদের সহযোগীতায় কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থাপত্র দিয়ে তাকে বাসায় পাঠিয়ে দেন। বর্তমানে তিনি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে বাসায় চিকিৎসাধীন আছেন। এ ছাড়াও, ব্যাংক কর্মকর্তা সোহেলের উপর্যুপরি কিল-ঘুষি ও লাথিতে বাম হাতের আঙুলে মারত্মক আঘাত পান তিনি। এ ছাড়াও, তাকে পরিবার সহ শহর ছাড়তে এবং অন্যথায় প্রাণ নাশের হুমকি দেন সেই কর্মকর্তা বলে অভিযোগ ভূক্তভোগীর।

ড. আব্দুল বারি বলেন, ‘আমি যখন ঘটনাস্থলে যাই তখন ব্যাংক কর্মকর্তা সোহেল লাঠি নিয়ে আমাকেও মারতে উদ্যত হয়। তবে পাশে লোকজন থাকায় পরে আমাকে কিছু বলেনি। পরে আহত ড. মোস্তাফিজকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে যাই।’

একটি সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংক কর্মকর্তা সোহেলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ড. মোস্তাফিজের বিরোধ চলছিল। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষকসহ আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করা হয়। তবে এর পরেও বিভিন্ন সময়ে ড. মোস্তাফিজকে হুমকি দিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে সোহেলের বিরুদ্ধে। 
ড. মোস্তাফিজ বলেন, ‘আমি সমিতির সেক্রেটারি থাকাকালীন চৌড়হাস ব্রাঞ্চের ডিজিএম (ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার) এর সাথে বিভিন্ন লেনদেনের বিষয়ে কথা হয়েছিল। ওখানে যে ডিজিএম তিনি একসময় আমাদের ইবি ব্রাঞ্চে ছিল। গল্পের ছলে একদিন বলছিলাম এই লোককে (সোহেল) চেনেন নাকি।’

আমি বলছিলাম যে, ‘আমরা বিল্ডিং করতেছি তো, মাঝে মধ্যে একটু জ্বালাতন করে। এখন কিছু বলার দরকার নাই। পরে সমস্যা হলে আমি জানাবো।’ এর মধ্যে হয়তো ডিজিএম সাহেব তাকে কিছু বলেছে। এই ব্যাপারটা তিনি থ্রেট হিসেবে নিয়েছেন। এরপর থেকেই তিনি আমাকেসহ কয়েকজনকে নানানভাবে কুষ্টিয়া ছাড়া করবে বলে বিভিন্ন হুমকি দিয়ে আসছিল। এরই জের ধরে এই (হামলা) ঘটনা ঘটিয়েছে। বুধবার ভোরে হাটতে বের হলে ‘তুই এখনো কুষ্টিয়া ছাড়িসনি!’ বলেই আমার উপর হামলা করে। এর আগে ফোনে বলেছিল, ‘তোর ক্ষমা নাই। তুই বউ বাচ্চা নিয়ে কীভাবে থাকিস আমি দেখে নিব।’

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘তার সাথে আমার বিরোধ ছিল। তিনি আমার অফিসের ডিজিএম’র কাছে আমার নামে নানা অভিযোগ করেছে। কিন্তু আমি মারধরের ঘটনার সাথে জড়িত নই। তার সাথে আমার গত ১০ দিন ধরে দেখাই হয়নি। তিনি আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন।’

উল্লেখ্য, এর আগে ভূক্তভোগীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষক কুষ্টিয়ার হাউজিংয়ের ডি ব্লকে বাড়ির নির্মাণ কাজ শুরু করলে বাধা দেন ঐ ব্যাংক কর্মকর্তা সোহেল মাহমুদ। পরে তিনি কুষ্টিয়া পৌরসভায় অভিযোগ করলে সার্ভেয়ার এসে বিষয়টির মীমাংসা করে দেন। কিন্তু এর পরে কাজ শুরু করলে আবারো ঐ শিক্ষকদের হুমকি দিতে থাকেন তিনি। গত বছরের জুলাই মাসে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল বারিকে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করার অভিযোগ রয়েছে সোহেলের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বিশ^বিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চার অধ্যাপক।
 

এম হাসান

×