ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১

বাংলা (প্রথম পত্র) গল্প : ‘আম আঁটির ভেঁপু’

নবম শ্রেণির লেখাপড়া

নাসরিন হক

প্রকাশিত: ০১:১৭, ২৯ মার্চ ২০২৩

নবম শ্রেণির লেখাপড়া

-

সিনিয়র শিক্ষক
কলেজিয়েট হাই স্কুল, চট্টগ্রাম

নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :
দুই বিঘা জমির মালিক উপেন তার সব সম্পত্তি ঋণ শোধ করতে হারিয়েছে। দুই বিঘে জমির ভিটে খানি তার সম্বল। জমিদার বাগান করবে বলে তার কাছ থেকে এই দুই বিঘে কিনবে বলে প্রস্তাব দিলে উপেন রাজি হয়নি। সাত পুরুষ ধরে বসবাস করছে যে ভিটায় তা সে কোন কিছুর বিনিময়ে হারাতে চায় না।
ক. দুর্গা অপুর পিঠে কিল মেরেছিল কেন?
খ. ‘একটুখানি কুটো গাছটা দুখানা করা নেই’Ñসর্বজয়ার উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
গ. উদ্দীপকের উপেন এর সাথে ‘আম আঁটি ভেঁপু’- গল্পের হরিহর এর  চরিত্রের বৈসাদৃশ্যগত দিকটি ব্যাখ্যা কর।
ঘ. উদ্দীপকে ‘আম আঁটি ভেঁপু’- গল্পের সামগ্রিক দিক প্রকাশ পায়নিÑ মন্তব্যটির যথার্থতা প্রমাণ কর।
উত্তর :
ক. দুর্গার কুড়িয়ে আনা আমের জারানো খেয়ে অপুর দাঁত টকে গিয়েছে এ সত্য প্রকাশ করায় দুর্গা অপুর পিঠে কিল মেরেছিল। 
খ. দুর্গা তার মায়ের কোনো কাজে সাহায্য না করায় মা সর্বজয়া দুর্গাকে উদ্দেশ্য করে উক্তিটি করেছিলেন।
দুরন্ত শিশু দুর্গা সারাদিন প্রকৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে রাখতে পছন্দ করে। গ্রামের ঝোপঝাড়ে ফল গাছের তলায় অন্য শিশুদের সাথে খেলে মেতে হাসিখুশিতে থাকে সারাদিন। সংসারের চরম দারিদ্রতা তার দুরন্তপনাকে থামাতে পারেনি। সর্বজয়া একাই ঘরের সবকাজ সামলায়। দুর্গা একটু সাহায্য করলে সর্বজয়া খুশি হয়। কিন্তু মাকে সাহায্য করার ফুসরত দুর্গার নেই। শুধু খাবার সময় একটু ঘরে আসে বাকী সময় সে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ায়। তাই সর্বজয়া আক্ষেপ করে উক্তিটি করেছিল।
গ. উদ্দীপকের উপেন এবং ‘আম আঁটির ভেঁপু’ গল্পের হরিহর এর মাঝে ভিটের প্রতি টান এর দিক থেকে বৈসাদৃশ্য রয়েছে।
‘আম আঁটির ভেঁপু’ গল্পে হরিহর চরম দারিদ্রতার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। প্রতিদিনের আহার জুটানো কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়েছে। সংসারের সকলের কাপড় নেই। ছেড়া কাপড় পরে ছেলেমেয়েগুলো আনন্দে ঘুরে বেড়ায়। ঘরটাও নড়বড়ে হয়ে পড়ে আছে মেরামতের কোন উপায় নেই। হরিহর রায় বাড়িতে গোমস্তার কাজ করে কিন্তু প্রতিমাসে বেতন পায় না, দু’তিন মাস পর বেতন দেয়। চারদিকে ধার দেনা করে বসে আছে। ছেলেমেয়ে দুটো প্রকৃতির মাঝে ঘুরে বেড়ায়, ফল-ফলাদি সংগ্রহ করে খায়। চরম অর্থনৈতিক সঙ্কট এর মধ্য দিয়ে হরিহর একদিন দশ ঘরায় যায় তাগাদা দেয়ার কাজে।

সেখানে অবস্থাপন্ন পরিবারের প্রধান তাকে দশঘরায় থাকার প্রস্তাব দেয়, কেননা দশঘরায়  চাষাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলেও সেখানে কোন ব্রাহ্মণ নেই। হরিহর জাতে ব্রাহ্মণ ছিলেন। এই প্রস্তাবে হরিহর খুব খুশি হয়ে সর্বজয়াকে জানালে সর্বজয়া আনন্দে লাফিয়ে ওঠে। সর্বজয়ার মতে এত অর্থকষ্টে থাকার চেয়ে দশঘরায় চলে যাওয়াই মঙ্গল। এখানে ভিটে ছাড়া আর কিছুই নেই সুতরাং ভিটে কামড়ে পড়ে থাকার কোনো মানে নেই। হরিহরও একই মত পোষণ করে।
উদ্দীপকে উপেন ঋণের কারণে সব জমি হারিয়ে দুই বিঘে ভিটে হয়ে ওঠে তার শেষ সম্বল।

জমিদার বাগান করবেন বলে তার দুই বিঘে ভিটা কিনতে চাইলে উপেন রাজি হয়নি। সাত পুরুষের স্মৃতি বিজড়িত এই ভিটে সে কিছুতেই হাতছাড়া করতে চায় না। নিজের ভিটেতে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে  চায় উপেন। কিন্তু ‘আম আঁটির ভেঁপু’Ñগল্পের হরিহর ভাল থাকার আশায় সাতপুরুষের ভিটে ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার জন্য দ্বিধাবোধ করে না। এই দিক থেকে এদের বৈসাদৃশ্য দেখা যায়। 
ঘ. উদ্দীপকে ‘আম আঁটির ভেঁপু’Ñগল্পের একটি মাত্র দিক অর্থাৎ দারিদ্রতার বিষয়টি ফুটে উঠেছে গল্পের সামগ্রিক দিক প্রকাশ পায়নি মন্তব্যটি যথার্থ।
আম আঁটির ভেঁপু গল্পে গ্রামীণ জীবনে প্রকৃতি ঘনিষ্ট দুই ভাই-বোনের আনন্দিত জীবনের আখ্যান নিয়ে গল্পটি রচিত হয়েছে। অপু ও দুর্গা হতদরিদ্র পরিবারের শিশু। তাদের বাবা হরিহর রায় বাড়িতে গোমস্তার কাজ করে। মাসে আট টাকা বেতন পায়। তাও প্রত্যেক মাসে পায় না, দু’তিন মাস পর পায়। কিন্তু শিশু অপু ও দুর্গার কাছে সেই দারিদ্রের কষ্ট প্রধান হয়ে ওঠেনি। দুর্গা সারাদিন ঘুরে বেড়ায়, ফলÑফলাদি সংগ্রহ করে ভাই অপুর জন্যও নিয়ে আসে।

তাদের মা সর্বজয়া সারাদিন সংসারের কাজে পরিশ্রম করে। টানাটানির সংসারে সে পাড়া পড়শির কাছে হাত পাতে। ছেলেমেয়েদের গায়ের কাপড় ছেড়া এই নিয়ে চিন্তিত থাকে। কড়া শাসনে রাখতে চায় ছেলেমেয়েদের। শাশ্বত বাঙালি মায়ের চিত্র ফুটে উঠেছে সর্বজয়ার চরিত্রে।
দশ-এগারো বছর বয়সী দূরন্ত মেয়ে দুর্গা পাটলিদের আমগাছ থেকে আমের কুশি কুড়িয়ে আনে। অপু রোয়াকে বসে তার খেলনার বাক্স বের করে খেলছিল। দিদি এসে তাকে আমের কুশিগুলো দেখালে সে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে। আমের কুশি  জারানোর জন্য লবণ আর তেল আনতে বললে অপু মায়ের ভয়ে তেল নুন আনতে  চায় না। কিন্তু দুর্গা সাহস দেয়ায় সে নিয়ে আসে।

আর তারা দুজনই খুব মজা করে খাচ্ছিল এমন সময়ে মা সর্বজয়া ঘরে ঢুকে। মায়ের পদ শব্দ পেয়ে দুর্গা গোগ্রাসে গিলে হাতের মালা জোরে ছুড়ে দেয় পাশের বাড়ির ভিটার জঙ্গলের দিকে। দুর্গা নিরীহ মুখে মায়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। সর্বজয়া দুর্গাকে বুঝিয়ে বলে ঘরের কাজে মন দিতে। 
ছেলে মেয়েদের শসা কেটে খেতে দেয়। অপু শসা খেতে গিয়ে বলে ফেলে দাঁত টকে গেছে। মা জিজ্ঞেস করল আম কোথায় পেলি। অপু সত্য বলায় দুর্গা বিপদে পড়ে যায়। এমন সময় দুধ দুইতে আসল স্বর্ণ গোয়ালিনী। দুর্গা অপুর পিঠে কিল বসিয়ে দিল আর শাসালো বিকেলে আম জারাবে কিন্তু অপুকে দিবে না। এক্ষেত্রে ভাই বোনের খুনসুটি সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু উদ্দীপকে গল্পের এই দিকটি আসেনি। হরিহর দরিদ্র ব্রাহ্মণ।

দশঘরায় সদ্গোপ জাতের অবস্থাপন্ন চাষী তাদের বাড়িতে থাকার প্রস্তাব দিলে সে মনে মনে খুশি হয়। স্ত্রী সর্বজয়ার সাথে সে বিষয়ে আলাপ করলে সেও খুশিতে আটখানা হয়। দারিদ্রের সাথে লড়াই আর সহ্য হচ্ছে না তার।
উদ্দীপকে গল্পের এই দিকটি উঠে এসেছে। উপেনের সাথে হরিহরের বৈসাদৃশ্য থাকলেও উপেনের দারিদ্রতা এবং হরিহারের দারিদ্রতা একই। অতএব আমরা বলতে পারি উদ্দীপকে ‘আম আঁটির ভেঁপু’ গল্পের একটি মাত্র দিক ফুটে উঠেছে, সামগ্রিক দিক প্রকাশ পায়নি।

×