ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ১৬ মার্চ ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২

উপকৃত হবে ১১০০-এর বেশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান

নন-বন্ডেড পোশাক কারখানার কাঁচামাল সংগ্রহে উদ্যোগ নিচ্ছে এনবিআর

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২২:২৫, ১৫ মার্চ ২০২৬

নন-বন্ডেড পোশাক কারখানার কাঁচামাল সংগ্রহে উদ্যোগ নিচ্ছে এনবিআর

দেশে বন্ড লাইসেন্সের আওতার বাইরে থাকা রপ্তানিকারকদের জন্য ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সংগ্রহের বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই পদক্ষেপ কার্যকর হলে শত শত পোশাক কারখানার জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ সহজ হবে এবং রপ্তানি কার্যক্রমও গতি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, এ বাধা অপসারণে রাজস্ব বোর্ড সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে বন্ড লাইসেন্সের আওতার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঁচামাল সংগ্রহে বিদ্যমান বাধা অপসারণে আমরা কাজ করছি। যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।’
এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় আইনি সংশোধন সম্পন্ন হলে শীঘ্রই এ বিষয়ে একটি আদেশ জারি করা হতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, ইতোমধ্যে আইনি সংশোধনের লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য একটি সামারি (সারসংক্ষেপ) তৈরি করা হয়েছে। এটি পাশ হলে ভ্যাট পলিসি বিভাগ থেকে একটি আদেশ জারি করা হবে। এর ভিত্তিতে কিছু শর্তসহ কাস্টমস বন্ড উইং আরেকটি আলাদা আদেশ জারি করবে, যাদের অধীনে এ সুবিধা দেওয়া হবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে বন্ডেড লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালিত ১,১০০-এর বেশি তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এসব কারখানা স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে রপ্তানি কার্যক্রম চালায়। এসব কারখানার বার্ষিক রপ্তানির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার এবং শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ বলে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন- বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) জানিয়েছে। এই সুবিধা দিলে যে অনিয়মের সুযোগ থাকবে, তা কীভাবে রোধ করা যাবে- এমন প্রশ্নে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, স্বয়ংক্রিয়তা (অটোমেশন) ও ডেটা সিস্টেমের সমন্বয়ের মাধ্যমে অপব্যবহার কমানো সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা অটোমেশনের দিকে চলে যাচ্ছি। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ইন্টিগ্রেশনের ফলে তথ্য সংগ্রহ করা এবং কার্যক্রমের মনিটরিং করা সম্ভব হবে। ফলে অনিয়মের সুযোগ কমে আসবে।’ পোশাক শিল্পের নেতারা বহু বছর ধরে এই সমস্যা সমাধানে এনবিআরের কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন। এতদিনেও কেন জটিলতা দূর হয়নি এ প্রশ্নের জবাবে এনবিআরের কাস্টমস উইংয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে কাঁচামাল ক্রয় করে রপ্তানি না করলে বা অন্য কোন অনিয়ম করলে তা বের করা অপেক্ষাকৃত সহজ। কিন্তু, নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানকে কাঁচামাল সরবরাহ করলে তা বের করা করা বিদ্যমান ব্যবস্থায় কঠিন। মূলত এসব অনিয়ম বের করার ক্ষেত্রে কাস্টমসের সক্ষমতার ঘাটতির কারণে এ ব্যবস্থা এতদিন চলমান ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে, গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর বিষয়টি আবারও উত্থাপন করে বিজিএমইএ। ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর এনবিআরকে পাঠানো এক চিঠিতে সংগঠনটি জানায়, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুলতে না পারা বা বন্ডেড কোম্পানি থেকে কাঁচামাল ও আনুষঙ্গিক (এক্সেসরিজ) পণ্য সংগ্রহ করতে না পারার কারণে ইতোমধ্যে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘বাদবাকি কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতাও কমছে এবং তারাও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।’ রপ্তানিকারকেরা মনে করেন, প্রস্তাবিত সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের ব্যবসা সহজীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী, যিনি গত এক বছর ধরে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এনবিআরের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ রাখছেন, উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০২১ সালে। সমস্যা সমাধানে একাধিক কমিটি গঠন করা হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। ১১ মাস আগে আমাদের চিঠির পর এনবিআর কিছু উদ্যোগ নিলেও পরে প্রক্রিয়াটি থেমে যায়। তবে দুই সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেছে।’ এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পোশাক, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ৬,০০০ কারখানা বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল সংগ্রহের সুবিধা পাচ্ছে। অন্যদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ৮৭ ধরনের উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদিত পণ্যের মোট রপ্তানি ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যার ৮০ শতাংশের বেশি এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। রাজস্ব কর্মকর্তারা জানান, এই সুবিধা দিতে এতদিন সরকারের অনীহার কারণ ছিল মূলত এই আশঙ্কা যে, শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা কাঁচামাল রপ্তানি না করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দিলে একদিকে সরকারের রাজস্ব হারানার শঙ্কা, অন্যদিকে একই পণ্য শুল্ক পরিশোধ করে আনা আমদানিকারকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারেন।

প্যানেল / জোবায়ের

×