ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৪ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

জুয়েলারি শিল্প-২

চাঙ্গা হচ্ছে অর্থনীতি

রহিম শেখ

প্রকাশিত: ২২:৩৮, ২৪ জুন ২০২৪

চাঙ্গা হচ্ছে অর্থনীতি

জুয়েলারি শিল্প

একসময় দেশের চরম নিরাপত্তাহীন জুয়েলারি শিল্প এখন সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে। উদ্ভাবন আর প্রযুক্তির সমন্বয়ে এটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় খাত হবে বলে আশা দ্বিতীয় প্রজন্মের জুয়েলারি উদ্যোক্তাদের। এরই মধ্যে দেশে স্বর্ণ খাতে বিনিয়োগ করার মতো শত শত উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। এ খাতে বিনিয়োগ আগ্রহ দেখাচ্ছেন বিদেশী উদ্যোক্তারাও। জুয়েলারি শিল্পের কারিগরি প্রশিক্ষণে অর্থায়নে এগিয়ে এসেছে বিশ্বব্যাংক। দেশে তৈরি হয়েছে প্রথম সোনা পরিশোধনাগার কারখানা।

জুয়েলারি শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার গার্মেন্ট শিল্পের পাশাপাশি জুয়েলারি খাতে পৃষ্ঠপোষকতা দিলে তা বৈদেশিক আয়ে রেকর্ড তৈরি করতে পারে। এ জন্য দরকার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া, পাশাপাশি ব্যবসা সংক্রান্ত নীতি ও বিধিগুলোর বিষয়ে ইতিবাচক চিন্তা করা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জুয়েলারি শিল্প হিসেবে গড়ে উঠলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি বা জিডিপিতে এটা ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে। এ ছাড়া ভ্যাট আহরণে আগামী দিনে সরকারের একটি বড় খাত যাচ্ছে জুয়েলারি শিল্প। আর  জুয়েলারি খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, সরকারের সহযোগিতা পেলে দুবাইয়ের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সোনার ব্যবসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিদেশী বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিউওয়াই রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে অলংকার উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে বেলজিয়ামসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং ভারত, চীন অন্যতম। ২০১৯ সালে বিশ্বে মেশিন ও হাতে তৈরি সোনার অলংকারের বাজার ছিল ২২ হাজার ৯৩০ কোটি মার্কিন ডলারের। ২০২৫ সালে আকার বেড়ে ২৯ হাজার ১৭০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে। সুনির্দিষ্ট হিসাব না থাকলেও দেশে বছরে প্রায় ২০-৪০  টন সোনার চাহিদা রয়েছে। তার মাত্র ১০ শতাংশ চাহিদা পুরনো অলংকার দিয়ে মেটানো হয়। বাকিটা ব্যাগজ রুলের আওতায় বিদেশ থেকে আসে।

অবৈধভাবেও বিপুল সোনা আসে। তাই সোনার বাজার ও জুয়েলারি ব্যবসায় স্বচ্ছতা ফেরাতে ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে সোনা আমদানির লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সোনা রিফাইনারি কারখানা, গোল্ড নীতিমালা, স্বর্ণ শিল্পের বাস্তবায়ন এবং গোল্ড ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ সম্পন্ন হলে একটা সময় গার্মেন্টস শিল্পকে ছাড়িয়ে যাবে জুয়েলারি খাত। এখন যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসে এরচেয়েও বেশি পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যমতে, হাতে তৈরি অলংকারের প্রায় ৮০ শতাংশ বাংলাদেশ ও ভারতে উৎপাদিত হয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে অলংকার রপ্তানিতে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারছে না বাংলাদেশ। চাহিদার প্রায় পুরোটাই রপ্তানি করছে ভারত। ২০২১-২২ অর্থবছরে অলংকার রপ্তানিতে ভারতে আয় ছিল ৩৯ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু স্বর্ণ থেকে রপ্তানি আয় হয় ৯ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালে স্বর্ণ রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছিল ২২ লাখ ২০ হাজার ডলার মাত্র।

পুরোটাই রপ্তানি হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ওই বছর স্বর্ণ রপ্তানির তালিকায় বাংলাদেশ ছিল ১৪৬তম দেশ। দেশের রপ্তানি পণ্য থেকে আয় করার মধ্যে স্বর্ণের আয় ছিল ১৮৫তম অবস্থানে। স্বর্ণ আমদানির দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশ ৩৩তম। ২০২০ সালে বাংলাদেশ ৩৯ কোটি ৭০ লাখ ডলারের স্বর্ণ আমদানি করেছে। আগামী ২০২৬ সালের মধ্যে সরকার যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি টার্গেট নিয়েছে, জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা মনে করেন সরকারের এই লক্ষ্য পূরণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে জুয়েলারি শিল্প।

এক্ষেত্রে সরকারের নীতি সহায়তা দরকার। তারা মনে করেন, দেশের রপ্তানি খাতে জুয়েলারি শিল্পের অবদান বাড়াতে বৈধভাবে সোনার বার, সোনার অলংকার, সোনার কয়েন রপ্তানি উৎসাহিত করতে কমপক্ষে ২০ শতাংশ ভ্যালু অ্যাড করার শর্তে, রপ্তানিকারকদের মোট ভ্যালু অ্যাডের ৫০ শতাংশ হারে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়াও জরুরি। এছাড়া এইচএসভিত্তিক অস্বাভাবিক শুল্ক হারগুলো  হ্রাস করে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে শুল্ক হার সমন্বয়সহ এসআরও সুবিধা প্রদান করা জরুরি।

জানতে চাইলে বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন ট্যারিফ অ্যান্ড ট্যাক্সেশনের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘দেশে অলংকার শিল্পের অপার সম্ভাবনা আছে। ভ্যাট আহরণে আগামী দিনে সরকারের একটি বড় খাত হতে পারে জুয়েলারি শিল্প। কিন্তু অতিরিক্ত ভ্যাট-ট্যাক্সের কারণে সোনার ব্যবসায় মন্দা চলছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ক্রেতাদের কাছে সহনীয় আকারে ভ্যাট নির্ধারণ করা জরুরি। সোনা, সোনার অলংকার, রূপা বা রূপার অলংকার বিক্রির ক্ষেত্রে আরোপিত ভ্যাট হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা উচিত। তাহলে সোনা খাত থেকে সরকার প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করতে পারবে।’
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সভাপতি ও বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর  বলেন, ‘দেশে বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ কারিগর রয়েছেন। বর্তমানে ২৫ হাজার স্বর্ণের দোকান এবং এ খাতে যুক্ত রয়েছেন ৪৪ লাখ মানুষ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঠিক দিকনির্দেশনা এবং ব্যাংকিং খাতের সহযোগিতা পেলে আগামী পাঁচ বছরে কমপক্ষে দুই কোটি মানুষের এ খাতে কর্মসংস্থান হবে।’

তিনি উল্লেখ করেন, জুয়েলারি খাতের পণ্যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য সংযোজন করা সম্ভব। সেটি জেনে ইতোমধ্যে ৩০০ থেকে ৪০০ উদ্যোক্তা এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এখন নীতি সহায়তা হিসেবে দরকার এই শিল্পের জন্য একটি নিরাপদ জায়গা। এর পাশাপাশি ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা পাওয়া গেলে জুয়েলারি খাত হবে দেশে আগামীর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিল্প। তিনি দাবি করেন, ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ তৈরিতে এই শিল্প বড় ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে রপ্তানি খাতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জুয়েলারি শিল্প ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, ‘ভারত প্রতিবছর প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জুয়েলারি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে যা সে দেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখে। বাংলাদেশেও সেটি সম্ভব।’ স্বর্ণ খাত বাংলাদেশে বিনিয়োগের নিরাপদ ক্ষেত্র উল্লেখ করে দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ীদের এই খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘অর্থনীতিতে জুয়েলারি খাত থেকে সরকার রাজস্ব আরও বেশি পেতে পারে।’ ভারতের গহনা শিল্পের সাফল্য থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। জুয়েলারি খাতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নকশা ও অন্যান্য সুবিধার জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। এদিকে বাজুসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী বছর থেকেই টার্গেট করে স্বর্ণের গহনা রপ্তানি করবে বাংলাদেশ।

ধাপে ধাপে বছরে ১০ টন স্বর্ণের গহনা রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা আশা করছি ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকেই রপ্তানি শুরু করতে পারব। এটি আমাদের একটি লক্ষ্যমাত্রা।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাজারে আমাদের দেশে তৈরি গহনার অনেক চাহিদা রয়েছে, কিন্তু আমরা বাজার ধরতে পারিনি। কারণ আমাদের দেশে তৈরি গহনার দাম বেশি। এখন আমরা ভালো মানের গহনা তৈরি করব।

এভাবে আমরা একদিন বিশ্ববাজারেও প্রবেশ করব স্বর্ণ শিল্প নিয়ে।’ তিনি উল্লেখ করেন, এই বিশ্ববাজার ধরার জন্য বাজুস সভাপতি সায়েম সোবহান আনভীর ব্যাপক উদ্যোগ নিচ্ছেন। বসুন্ধরা গ্রুপ বসুন্ধরা গোল্ড রিফাইনারি কারখানা স্থাপন করেছে। এখানে গোল্ড বার তৈরি এবং রপ্তানি করা হবে। শুধু তাই নয়, এই বার থেকে গহনা তৈরি করেও রপ্তানি করা হবে। এর মাধ্যমে দেশের স্বর্ণ শিল্পে বিপ্লব ঘটবে। আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগামীতে স্বর্ণ শিল্প হবে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান খাত।

এ শিল্পে নতুন নতুন কারখানা হবে, ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে, বিকাশ ঘটবে স্বর্ণ শিল্পের।’ জুয়েলারি শিল্পের কারিগরি প্রশিক্ষণে অর্থায়ন করবে বিশ্বব্যাংক ॥ জুয়েলারি শিল্পের কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বিশ্বব্যাংক অর্থ দেবে। বিশ্বব্যাংকের ‘এল অ্যাকসেলারেটিং অ্যান্ড স্ট্রেংদেনিং স্কিলস ফর ইকোনমিক ট্রান্সফরমেশন’ (এসেট) প্রজেক্টের আওতায় কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ প্রদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে দেশের পণ্যভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী সর্ববৃহৎ বাণিজ্য সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। এ উপলক্ষে বাজুস ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ইতোমধ্যে একটি চুক্তিও করেছে বাজুস।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে এই এসেট প্রজেক্ট। এর অধীনে বাজুস ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে প্রাথমিক অবস্থায় জুয়েলারি শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩০০ ব্যক্তিকে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রজেক্টের আওতায় তিন মাসমেয়াদি প্রশিক্ষণে থাকছে জুয়েলারি ম্যানুফ্যাকচারিং, জুয়েলারি ডিজাইন, জুয়েলারি ডিজাইন ক্যাড অপারেশন ও জুয়েলারি সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ও দক্ষতা উন্নয়ন।

×