ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২২ জুলাই ২০২৪, ৭ শ্রাবণ ১৪৩১

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস আজ

এসো করো স্নান নবধারা জলে..

মোরসালিন মিজান

প্রকাশিত: ০০:১৬, ১৫ জুন ২০২৪

এসো করো স্নান  নবধারা জলে..

ফুটেছে ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’

এমন দিনে তারে বলা যায়/এমন ঘনঘোর বরিষায়... ঘনঘোর সেই বরিষা এসেছে।এসেছে বরষা, এসেছে নবীনা বরষা।আজ শনিবার আষাঢ় থেকে শুরু হয়ে গেল বর্ষা ঋতু। ঈদ আয়োজনের মধ্যে হলেও আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বর্ণিল আয়োজনে বরণ করে নেওয়া হবে প্রিয় ঋতুকে। রাজধানীতে সকালে আয়োজন করা হবে বর্ষা উৎসবের।   

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে আষাঢ় শ্রাবণ দুই মাস বর্ষাকাল। সময় সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়। গ্রীষ্মের গরমে হাঁসফাঁস করার পর তপ্ত ধরাকে শীতল করে বর্ষা। নদীমাতৃক বাংলাদেশে বর্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। রিমঝিম বৃষ্টির দিন কবে আসবে, বাঙালি অধীর আগ্রহ নিয়ে অপক্ষো করে থাকে। হৃদয়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আবেগ নতুন করে জাগিয়ে তুলতে বর্ষার জুড়ি নেই।

রবীন্দ্রনাথ বর্ষাকে স্বাগত জানিয়ে লিখেছেন: ‘এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে, এসো করো স্না নবধারাজলে।নজরুলের ভাষায় : ‘রিম্ঝিম্ রিম্ঝিম্ ঘন দেয়া বরষে।/কাজরি নাচিয়া চল, পুর-নারী হরষে।ভাটি বাংলার লোকসাধক উকিল মুন্সির গানেও খুঁজে পাওয়া যায় বর্ষাকে, যেখানে তিনি সুরে সুরে বলছেন, ‘যেদিন হইতে নয়া পানি আইলো বাড়ির ঘাটে সখি রে/অভাগিনীর মনে কত শত কথা ওঠে রে।’ 

অবশ্য আজ আনুষ্ঠানিক শুরু হলেও কয়েকদিন ধরেই কম বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টি মূলত বর্ষার আগমনী ঘোষণা করছিল প্রকৃতি। আর প্রকৃত শুরুটি আজ হলো। বর্ষার বৈশিষ্ট্য বৃষ্টি। আবহাওয়াবিদদের মতে, সময় জলীয় বাষ্পবাহী দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। বছরের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির রেকর্ড হয় বর্ষায়। নিয়মিত বর্ষণে বদলে যায় চারপাশের পরিবেশ। সময় ধুলো জমা প্রকৃতি তার শরীর ধুয়ে নেয়। পরিচ্ছন্ন হয়। বেলী, বকুল, জুঁই, দোলনচঁাঁপা, গন্ধরাজ, হাস্নাহেনার ঘ্রাণে ভরে ওঠে চারপাশ। আর মিষ্টি হাসি হয়ে ফোটেবাদল দিনের প্রথম কদম ফুল।

বর্ষা ঘিরে বাঙালির যে চিত্ত চাঞ্চল্য, সেটিও লক্ষ্য করার মতো। কেউ বৃষ্টি হতে দেখলে জানালার কাছে ছুটে যান। কেউবা গিয়ে দাঁড়ান বারান্দায়। হাত বাড়িয়ে শীতল বৃষ্টির ফোঁটা স্পর্শ করেন। আর বৃষ্টিস্না তো সবার পছন্দ। রবীন্দ্রনাথেরও হৃদয় নেচে উঠত বর্ষায়। সে কথা জানিয়ে কবিগুরু লিখেছেন, ‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে ময়ূরের মতো নাচে রে।

বাঙালির হৃদয়ে প্রেম কত, সেটাও বর্ষায় ভালো বোঝা যায়। কবিগুরু তাই লিখছেন, ‘তুমি যদি না দেখা দাও, কর আমায় হেলা,/কেমন করে কাটে আমার এমন বাদল-বেলা।একই অনুভূতি থেকে নজরুল লিখেছেন, ‘চেনা দিনের কথা ভেজা সুবাসে,/অতীত স্মৃতি হয়ে ফিরে ফিরে আসে।/এমনি ছলছল ভরা সে-বাদরে/তোমারে পাওয়া মোর হয়েছিল সারা।বর্তমান সময়ের প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ বর্ষা নিয়ে আরও মজার কথা বলেছেন। তার মতে, বর্ষাই একমাত্র নারী। একমাত্র রমণী। তিনি আমাদের প্রিয় দ্রৌপদী। বাকি পাঁচ ঋতু হচ্ছে মহাভারতের পঞ্চপা-!

বিরহ জাগানীয়া ঋতুটিও বর্ষা। পুরনো বিয়োগ ব্যথা নতুন করে বুকে বাজে এসময়। বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতির কথাই যদি বলি, তিনি লিখেছেন: ‘ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।/ ভরা ভাদর/ মাহ ভাদর/ শূন্য মন্দির মোর।একই কারণে মহাকবি কালিদাস দেশান্তরিত যক্ষকে বর্ষাকালেই বিরহে ফেলেছিলেন। এমন দিনে সবচেয়ে আপনজনকে কাছে না পাওয়ার বেদনা থেকে লোককবি দুর্বিন শাহ গেয়েছিলেন : ‘প্রাণ সখিরে, আষাঢ় মাসে নতুন জোয়ার, ডুবায় গাঙ্গের দুটি পাড়/খেলব সাঁতার কারে সঙ্গে লইয়া।রবীন্দ্রনাথের বলাটি রকম : ‘বাদল-হাওয়ার দীর্ঘশ্বাসে যূথীবনের বেদন আসে/ফুল-ফোটানোর খেলায় কেন ফুল-ঝরানোর ছল।আর নজরুলের বিখ্যাত সেই গান তো সকল বিরহীর : ‘শাওন আসিল ফিরে সে ফিরে এলো না/বরষা ফুরায়ে গেল আশা তবু গেল না।অন্যত্র কবি লিখেছেন, ‘অথৈ জলে মাগো, মাঠ-ঘাট থৈ থৈ/আমার হিয়ার আগুন নিভিল কই।এভাবে অসংখ্য কবিতারও জন্ম হয় বর্ষায়। বলা হয়ে থাকে, বর্ষা ঋতুতেই জীবনের প্রথম কাব্য রচনা করেন বাংলার কবিরা। পরিণত কবিও বর্ষাকে আশ্রয় করেন।

বর্ষা ঋতুর আলোচনায় আলাদা স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশের হাওড় অঞ্চল। বর্ষায় হাওড়ের চেহারা আমূল বদলে যায়। গ্রীষ্মে হাওড়ের যে অংশ পায়ে হাঁটার পথ, বর্ষায় তা অথৈ জল নদী। শুকনো মৌসুমে যে জায়গায় হালচাষ করে কৃষক, ভরা বর্ষায়  সেখানে জাল ফেলে মাছ ধরে জেলে। বর্ষায় ভাটি অঞ্চলের বাবা-মায়েরা নৌকোয় করে তাদের মেয়েকে নাইওর আনার ব্যবস্থা করেন। সেই দৃশ্য দেখে ভাটির বাউল উকিল মুন্সি গেয়ে ওঠেন- গাঙে দিয়া যায়রে কত নায়-নাইওরির নৌকা সখি রে/মায়ে-ঝিয়ে বইনে-বইনে হইতেছে যে দেখা রে...

হাওর অঞ্চলে বিয়ের মৌসুমও বর্ষা। সময় প্রচুর বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। নৌকো করেই বর যান বিয়ে করতে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা এই সাত জেলার লোককবিরা বর্ষা দ্বারা বিশেষ প্রভাবিত হয়েছিলেন।  এরই ফল অসংখ্য কালজয়ী গান।  

অবশ্য বর্ষার সবই উপভোগ্য এমন নয়। ভারি বর্ষণে, পাহাড়ি ঢলে গ্রামের পর গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে যায় যে ঋতু, সেও কিন্তু বর্ষা! ভাটি অঞ্চলের মানুষজন তাই সময়টা আতঙ্কে কাটান। অনেক সময় সারাবছরের অর্জন ফসল তলিয়ে যায় বন্যার পানিতে। শিলাবৃষ্টিতে নষ্ট হয়। শাহ আবদুল করিম যেমনটি গানে গানে বলেছেন, আসে যখন বর্ষার পানি ঢেউ করে হানাহানি/গরিবের যায় দিন রজনী দুর্ভাবনায়/ঘরে বসে ভাবাগুনা নৌকা বিনা চলা যায় না/বর্ষায় মজুরি পায় না গরিব নিরুপায়... সময় ঝড়ে খেই হারানো জেলের নৌকোটিও অনেক সময় আর ফেরেই না! আর কর্দমাক্ত পথে পা পিছলে পড়ার গল্পতো প্রতিদিনের। বর্ষার কাছে তাই প্রার্থনা : ‘এমন দিনে সকলের সবুজ সুধার ধারায় প্রাণ এনে দাও তপ্ত ধরায়,/বামে রাখ ভয়ংকরী বন্যা মরণ-ঢালা...

রাজধানীতে আজ বর্ষা উৎসব ঈদের প্রস্তুতির মধ্যেই আজ নানা আয়োজনে বর্ষাকে বরণ করে নেওয়া হবে। রাজধানীতে আয়োজন করা হবে বর্ণাঢ্য বর্ষা উৎসবের। সকাল ৭টায় বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে বর্ষা উৎসবের আয়োজন করবে উদীচী। এই মঞ্চ থেকে সংগীত নৃত্য আবৃত্তি কথনে প্রাণ প্রকৃতি রক্ষার আহ্বান জানাবেন আয়োজকরা। চারুকলার বকুলতলায় বর্ষা উৎসবের আয়োজন করবে বর্ষা উৎসব উদ্যাপন পরিষদ। আয়োজক সূত্র জানায়, সকাল ৭টা ২০ মিনিটে হাসান আলীর বাঁশির সুরে উৎসব শুরু হবে। পরে থাকবে সংগীত নৃত্য কবিতাসহ নানা আয়োজন। সবাইকে উৎসবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আয়োজক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার  চৌধুরী সুইট।

×