সোমবার ৪ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জানুয়ারী ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের সূচনা ৬ ডিসেম্বর

  • ভুটান ও ভারতের বাংলাদেশকে স্বীকৃতির ৫০ বছর স্মরণে অনুষ্ঠান

স্টাফ রিপোর্টার ॥ তখনও পাকবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফল নিশ্চিত হয়নি। সবেমাত্র মুক্তির ঘ্রাণ পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। আর এই সময়ই স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দেয় বন্ধুপ্রতিম দুই প্রতিবেশী দেশ ভুটান ও ভারত। আর এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের সূচনা হয়েছিল। সোমবার ছিল সেই স্বীকৃতির ৫০ বছর পূর্তির দিন। দিবসটিকে স্মরণীয় করে রাখতে অবমুক্ত করা হয় ১০ টাকা মূল্যমানের একটি ডাকটিকেট, ১০ টাকা মূল্যমানের উদ্বোধনী খাম, পাঁচ টাকার ডাটাকার্ড ও একটি বিশেষ সিলমোহর।

রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভার মাধ্যমে এ সব অবমুক্ত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী, ভূটানের রাষ্ট্রদূত রিনচেন কুইনসেল, সংসদ সদস্য এ্যারোমা দত্ত। ‘সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ ৭১’ আয়োজিত এই আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম। ফোরামের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক কামালউদ্দিনের সঞ্চালনায় সভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, সারাবিশ্বের কাছে ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক মডেল সম্পর্ক। ভারতের সঙ্গে আমাদের যে রক্তের সম্পর্ক তা গভীর থেকে গভীরতর হবে। আমি তো সেই দিনের আশায় আছি, যে দিন ভারতসহ প্রতিবেশী দেশে আনাগোনা করতে কোন ভিসা লাগবে না। আমাদের মাঝে কোন বাধা থাকবে না। বন্ধুভাবাপন্ন এ সব দেশে চলাচল যখন উন্মুক্ত হবে, যে দিন আর কোন ভিসা থাকবে না, সে দিকেই যেতে হবে আমাদের। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভারত-পাকিস্তানের লড়াই নয় বলে মন্তব্য করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটা ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের লড়াই নয়। এটি মুক্তিবাহিনী, মৈত্রীবাহিনী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ভারত সাহায্য করেছে স্বাধীন বাংলাদেশকে। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের সঙ্গেও ৫০ বছরের ডিপ্লোম্যাটিক বছরপূর্তি উদযাপন করছি। এর জন্য দেশবাসীকেও ধন্যবাদ দেই। যে দল এ দেশে স্বাধীনতা নিয়ে এসেছিল তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে আমাদের এই উদযাপনগুলো করার সুযোগ দিয়েছে।

ড. আব্দুল মোমেন বলেন, শুধু বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা না, তিনি এই অঞ্চলের উন্নয়ন চান। মানুষের উন্নয়ন চান। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সুদৃঢ়, সোনালি অধ্যায়ে পৌঁছে গেছে। আমাদের যে ছোটখাটো সমস্যাগুলো আছে, তা আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধান করা যাবে।

এ সময় ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, স্বাধীনতার আগেই বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে ভুটান ও ভারতের স্বীকৃতি স্বাধীনতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ভুটান-ভারতের পথপ্রদর্শনমূলক ও অগ্রবর্তী স্বীকৃতিকে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি মহত্ত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মন্ত্রী বলেন, ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধুর সুদৃঢ় নেতৃত্বের ফসল হিসেবে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ব জার্মানি, বুলগেরিয়া, পোল্যান্ড, মিয়ানমার, নেপাল, সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাজ্যসহ সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডস এবং জাপান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এপ্রিল মাসে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশকে। তিনি বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিচ্ছিন্নতাবাদী কোন আন্দোলন ছিল না। বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে এটিকে জনযুদ্ধে রূপান্তর করছিলেন বলেই ভারত পাশে দাঁড়িয়েছিল। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

এ সময় ঢাকা নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী বলেন, ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় আদর্শ মেনেও মানুষ একত্রে থাকতে পারে, সেটি বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে পরিবর্তন আসেনি, একই সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে আদর্শের। যে কারণে (ধর্মের ভিত্তিতে) দেশভাগ হয়েছিল সেই আদর্শ কিন্তু টেকেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে যে, মানুষ ভিন্ন ধর্মীয় আদর্শের হয়েও একত্রে থাকতে পারে। দোরাইস্বামী বলেন, বাংলাদেশের হয়ে যারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছে তাদের প্রতি যে সম্মান জানানো হয়েছে- তা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে ছুঁয়ে গেছে। এখানে বেশ কিছু বিষয় স্পষ্ট করে জানাতে চাই। কেন ভারত ’৭১-এ বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেছিল? এটা নিয়ে অনেকে বলে থাকেন ভারত সব সময় পাকিস্তানকে দুই ভাগ করতে চেয়েছে। এটি সত্যি নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, ’৭১-এর মার্চে যে গণহত্যা হয়েছে তা অনেকেরই ধারণারও বাইরে ছিল। লাখ লাখ নিরস্ত্র মানুষ আমাদের সীমান্ত পার হচ্ছিল। বাংলাদেশে মানুষের কি হচ্ছিল- তা এ থেকে বোঝা যায়। ভারত বুঝেছিল যে, এটি নিয়মিত কোন রাজনৈতিক সংঘাতের বিষয় নয়, যা বিশ্বের অনেক স্থানে হয়ে থাকে। এটি নিয়মিত রাজনৈতিক সংঘাতের চেয়ে বহুগুণে ভয়াবহ এবং অনেক বেশি স্থানে ছড়িয়ে ছিল। ভারত কখন সহযোগিতা করেছিল তা খুঁজতে গেলে দেখা যায়, অপারেশন সার্চ লাইটের পর। বিষয়টি শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করাই নয়, সঙ্গে ১ কোটি মানুষকে নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় খুব কঠিন কাজ ছিল। তখনকার পরিস্থিতিতে ভারতের নিজেদের অবস্থাও খুব ভাল ছিল তাও কিন্তু না।

শীর্ষ সংবাদ: